বছর দশেক পর

স্টেশনটা ছোট্ট। কয়েকটা ট্রেনের ডিব্বা তো প্ল্যাটফর্ম উপচে যায়। লোকেরা হেঁচড়ে নামে – বাচ্চাদের কোলে করে নামায়। টিটি বাবু থাকেন না বললেই চলে। স্টেশন থেকে বেড়িয়েই রিকশা পাবেন। সাইকেল রিকশা। মোটরের ভটভটানি একদম নেই – তবে লোকের গলার আওয়াজ শুনতে পাবেন। রিকশাতে উঠে বসে কোথায় যাবেন বলতে না বলতেই শুনতে পাবেন আপনার ট্রেন ভোঁ মেরে ফের চলা শুরু করলো। আরও শান্ত হয়ে পড়ল চারপাশ।

নাকে রুমালটা লাগিয়ে রাখবেন। লাল মাটির দেশ তো – তার ওপর ভরা বসন্ত। খুব ধুলো উড়বে। তা বলে যেন মাঝে মাঝে ফুসফুস বোঝাই করে প্রান্তরের বাতাস নিতে ভুলবেন না! আপনি যেখান থেকে এয়েচেন সেখানে এই জিনিষ নেইকো! হাওয়াটা একটু ভেজা ভেজা মনে হচ্ছে না? হবেই তো – ওইতো আর একটু দূরে গেলেই নদী। রাস্তা একটু ঢালু হয়েছে কিনা? দেখছেন না, রিকশাওয়ালা এখন আর অতটা বেগ পাচ্ছে না গাড়িটা চালাতে। গুন গুন করে গান ভাঝছে ব্যাটা!

ব্যাস ব্যাস – এসে গিয়েছেন। পথের ধারে ওই যে দোকানটা – ওইটেই তো গন্তব্যস্থল! সবুজের  দিকচক্রভালের মধ্যে লাল হলুদের ছোপ আর মেটে ধুলোর মাঝে ধপধপে সাদা দোকানঘরটা। নামটাও বেশ – “পান্থজনের”। এখানে তো কারুর তেমন তাড়া থাকে না – তাই সবাই চায় দু দণ্ড জিরিয়ে নিতে। শরীর জিরনোর জন্যে চা, শরবত আর মন জুড়োনোর জন্যে বাউল গান – অঢেল ব্যবস্থা। সত্যিকারের বাউল গান! বাউলদেরই তো দোকান। অতিথি আপ্যায়ন থেকে পরিবেশন – সে পানীয়ই হোক বা খাবার বা গান – সব তারাই করেন। আমি তো নিমিত্ত মাত্র। বসুন না খানিক – বেঞ্চিটা গাছের নিচে নিয়ে বসুন। ওই দেখুন – মদন বাউলের আবার এখন গান পেয়েছে! সব ছেড়ে ছুড়ে বাবু বসে একতারা বাজিয়ে গান করছে – মুরশেদি বাউল গান! ভাল লাগছে না? ট্রেন যাত্রার আর রিকশা চড়ার ক্লান্তি কমে আসছে না? এই কিছুদিন হল স্যার শহুরে ইঁদুর দৌড় থেকে নিজেকে অব্যাহতি দিয়ে এইখানে আস্তানা গেড়েছি। গানে, গপ্পে, নদীর হাওায়, পলাশের রঙ্গে দিব্ব্যি কাটছে দিন গুলো…

“হওয়াই আর ইয়উ টেলিং মি অল দিস?”

মনটা পিছিয়ে গেল স্যার। দশটা বছর। সেদিনও ওই একি প্রশ্নের উত্তরে আমি এই কথাগুলো  কয়েছিলাম। দশটা বছর যে কোথা দিয়ে চলে গেল বুঝতেও পারলুম না

“সো লেট মি আস্ক এগেইন – হয়ের ডু ইয়উ সি ইয়উরসেলফ ইন দ্য নেক্সট টেন ইয়ার্স?”

“স্রেফ বেঁচে থাকতে চাই স্যার। ব্যাস, বেঁচে থাকতে চাই”।

———————————————

লেখকের কথা: সব লেখার মন থেকে কলম বেয়ে পাতায় নামার পেছনে কোনো একটা প্রভাব থাকে। এই লেখার জন্যে সেই প্রভাব বন্ধুবর তন্ময় মুখার্জির একটা ছোট্ট টুইট। কাজে ভরা দুপুরবেলায় নচিকেতার একটা গানের লাইন অকস্মাত মনে করিয়ে দিলো সে কালকে – “আমি কোনো বাউল হব এইটাই আমার এম্বিশন”

ধন্যবাদ তন্ময়!

Advertisements