দুগ্গা পুজোর দশ

পূজোর আর মাত্র কয়েক দিন ঘন্টা বাকি। মোহনবাঁশি রুদ্র পাল পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করে নিতে নিতে নিজেকে প্রশ্ন করছেন – হ্যাভ আই মেড ইট লার্জ? মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির দুঁদে ভাইস প্রেসিডেন্ট সান ফ্রান্সিসকোর কন কল ক্যানসেল করে দিচ্ছেন আলোকসজ্জা ফাইন টিউন করবেন বলে। কোন্দোমিনিউম এর কমুনিটি হল থেকে ভেসে আসছে “শুভ্র শঙ্খ রবে” এর কোরাস। কতক লজ্জা কতক কোমরের ঘের পেছনে ঠেলে রেবা, অর্পিতা, দেবযানী, দীপালি বৌদিরা পা মেলাচ্ছেন তালে তালে। মোদ্দা কথা হলো দা ফেস্টিভাল ইজ ইন দা এয়ার। কিন্তু আপনি? আপনি তৈরী তো? টু টেক দা বুল – মানে থুড়ি মহিষাসুর – বাই দা হর্ন? চট করে দেখে নিন আপনার দশভূজার দশটি মোক্ষম অস্ত্র। এইগুলি না নিয়ে মাঠে নেমেছেন কি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর মতো কচু কাটা হয়েছেন (দরকার পড়লে একটা প্রিন্ট নিয়ে সঙ্গে রাখুন)

পুদিন হারা: অথবা রানট্যাক। বাগবাজারে জমিয়ে সিঙ্গারাটা খেলেন যে, গাড়ি যতক্ষণে পাঁচ মাথার মোড় আসবে তখন গোল বাড়ির কষা মাংসের গন্ধ কি ভ্যারেন্ডা ভাজবে নাকি? আর যদি মানিকতলা এড়িয়ে সেন্ট্রাল এভিনিউ ধরেন তাহলে গিন্নী কি চাট দেখে হতভম্ব কুইজারের মত “পাস” বলবেন? সঙ্গে রাখুন ছোট্ট সবুজ বড়ি – টুক করে চালিয়ে দিন। দেখবেন যতক্ষণে সব ঘাটের জল খেয়ে বেদুইনে পৌছেছেন ততক্ষণে পেটে গণেশের ইঁদুর ডিস্কো করছে। ঝাঁপিয়ে পড়ুন মশাই – ডরনেকা নেহি, পুদিন হারা খানেকা

ব্যান্ড এইড: হেঁটে যদি ঠাকুর না দেখলেন তো করলেন কি? ঔক্কে, মে মাসে কেনা আই টেন টা নিয়ে বেরোবেন? যেখানে পার্কিং করবেন সেখান থেকে বালিগঞ্জ কালচারাল প্রচুর দূর। আর পায়ে নির্ঘাত নতুন টাটকা শ্রী লেদার্স? ওই যে নরম সরম জেলি মার্কা জিনিষটা গোড়ালির কাছে উঁকি দিছে ঐটে খেয়াল করেছেন? একডালিয়া র দত্ত মেডিকেল বন্ধ। করবেন কি? নেংচে মরে পালিয়ে যাবার রাস্তা ধরবেন? তৌবা তৌবা। ঘাবড়াও মত পদাতিক – পকেট থেকে ব্যান্ড এইড বের করুন, লাগান আর হাজার বছর ধরে পথ হাঁটুন পৃথিবীর বুকে

খুচরো টাকা: বিশেষ করে যদি গাড়ি নিয়ে বেরোন। পার্কিংএর ছোকরা কে একশো ধরিয়েছেন কি কোথায় ধা হয়ে যাবে নেতাজীর মতো – আর টিকিও দেখতে পাবেন না। নেমে যে চেইজ করবেন প্রখর রুদ্রর মতো সেও সম্ভব নয় – পেছনে গাড়ি হর্ন এবং গলা বের করে হুড়ো – দুই ই দিতে শুরু করেছে। বুক পকেটে খুচরো টাকা রাখুন – ভুলবেন না। আজকে থেকে অটো অন্ধকারে যে কাটা দশগুলো গছিয়ে দিয়েছিল সেইগুলি জমিয়ে রাখুন।

পাতি নোকিয়া ফোন: মনে পরে সেই খুদে বিতিকিচ্ছিরি দেখতে ফোনটিকে? মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, এই পুজোয় ঐটিকে বের করুন, আর একটা প্রি পেইড সিম ভরুন। আরে বাবা জানি, আপনার কাছে কাম্পানি প্রভাইডএড আই ফোন ফাইভ আছে, নিয়ে বেরোবেন। কিন্তু যতবার মায়ের সামনে হাথ ওঠাবেন ভক্তিতে সেই ফাঁকে টুক করে একটা ছবি কি তুলবেন না? আর ছবি ই যদি তুললেন সেইটে কি টুইটার বা ফেসবুকে দেবেন না? আর দিলেনই যদি, কটা রি টুইট বা লাইক পেলেন ঘন ঘন দেখবেন না? মশাই, এই করতে করতে কলেজ স্কোয়ার থেকে মহম্মদ আলী পার্ক পৌছাতে পারবেন না ব্যাটারির চৌদ্দটা না বাজিয়ে। তখন সরলা মাসীকে কালকে বেলা করে আসতে বলার ফোনটা করবেন কথথেকে শুনি? বের করুন নোকিয়া, লাগান নাম্বার। ইউ আর অল সেট

এইচ এম টি ঘড়ি: ছাড়ুন মশাই ওই সব ট্যাগ হোগার, বউম মের্সিয়ার আর ওমেগা। সন্তোষ মিত্র স্কোঅরের লাইনের ভিড় ভুলে গেছেন? মানুষের স্রোতে আপনি স্রেফ একটি খরকুটো। ভেসে চলেছেন। কার হাথ ধরছেন টাল সামলাতে, কে আপনাকে খিমছে ধরছে কিছুই বুঝতে পারবেন না। বৌবাজারের মোড়ে এসে যখন “কটা বাজে রে?” বলে কব্জি ঘুরিয়েছেন ততক্ষণে মাল ফাঁকা। গেলো তো, গত বছরের বোনাস? ওই রাস্তাও মাড়াবেন নি (ধুর মশাই, নেবুতলা পার্ক যাবেন, বারণ করছি না) – কিন্তু হাতে রাখুন এইচ এম টি অশোক। যেমন নাম তেমন কাম – চলে গেলেও পস্তাবেন না। পরের মাসে পাঁঠার মাংস থেকে বিরত থাকুন – দেখবেন ঘড়ির দাম উঠে এসেছে। কলেস্টলও কম।

হাথ পাখা: আরে না বাবা – রথের মেলায় যে শক্ত ডাঁটি ওয়ালাগুলো পাওয়া যায় সেগুলি নয়। বেশ হাল ফ্যাশনের ফোল্ডিং পাখা। দেখতে মাউথ অর্গানের মতো কিন্তু খুলে ধরলে যেন সাওয়ান কা মাহিনা তে বানওয়া নাচে মাউর। সুক্ষ কারুকাজ করাও পাওয়া যায় – দাম একটু বেশি পড়বে। বগলে ডিও স্প্রে করা হয়ে গেলে এক পোঁচ খুশবু এইটেতেও মেরে দিন। ঝলকে ঝলেক গন্ধ ছড়াবে, পলকে পলকে পুলক। কি বললেন, কেন নিয়ে বেরোবেন? ও হরি – তা নেবেন না তো গাড়ির পেছনের সীটে বসে কি সেদ্ধ হবেন নাকি? এ সি চালাবেন? মশাই আশি টাকা পেট্রল – বাপের জমিদারী না শ্বশুরের মিনিস্টারি – কোনটা আছে? এ ছাড়া যখন কাকুড়গাছির হানি দা ধাবাতে ডিনার খাবার লাইনে বসে থাকবেন তখন মৃদু মন্দ হওয়া খেতে পারবেন – খিদেটা চনমনে পাবে, মেজাজ কন্ট্রোলে থাকবে।

ছাতা: নাক সিটকোবেন না – একদম না। এই রাজ্যে ওনারা সংখ্যায় কমতে থাকলেও বিধির কিন্তু বাম হতে এক সেকন্ডও লাগে না। মুদিয়ালির মোড়ে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি এলে করবেনটা কি? গাড়িবারান্দার নিচে কতক্ষণ দাড়াবেন? সঙ্গে ছাতা থাকলে নির্ভয়ে রাসবিহারীর দিকে হাঁটা দিতে পারবেন পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে পথ চেনা গুনগুন করতে করতে। আবার নাক সিটকোচ্চেন? আরে মশাই স্টাইলের সাথে কে কম্প্রমাইজ করতে বলেছে? বার্গান্ডি রঙের কুর্তার সঙ্গে রং মিলিয়ে কিনুন না হালকা অ্যাশ কালারের ছাতা। দেখবেন ম্যাডক্সএর ভিজে সুন্দরীরা কেমন ঈর্ষার চোখে তাকাবে।

ডি এস এল আর: ছাড়ুন তো মশাই আপনার স্যামসাং এস থ্রির আট মেগাপিক্সেল। চাঁদে আর পোঁ … যাগ্গে। কম আলোয় তুলবেন শিব মন্দিরের প্রতিমার ছবি, কলেজ স্কোঅরের আলোর প্রতিবিম্ব জলের মধ্যে, শ্রীভূমির দুর্গার হাথে ঘুর্ণীয়মান চক্র, এক্সটেন্ডেড এক্সপোজারএ একডালিয়ার বয়ে যাওয়া ঝাপসা জনস্রোত। তখন ডি এস এল আর ছাড়া কিছুই পোষাবে না। মনে রাখবেন আপনি টেস্ট ম্যাচের খেলোয়াড় – আনতাবরি বিশ-বিশ এর জুয়াড়ি নন। ফেসবুকেই জীবন শেষ নয় – বিজয়ার অতিথি আপ্যায়ন আছে। কুচো নিমকি, নারকেল নাড়ু আর সিঙ্গেল মল্ট এগিয়ে দিয়ে টেবিলে ছড়িয়ে রাখবেন তোলা ছবিগুলো। দেখবেন মিসেস ঘোষ আপনাকে টোটালি অন্য চোখে দেখতে শুরু করবেন।

রুমাল: দুটো। মিনিমাম। পারলে একটা একটু টার্কিশ তোয়ালে গোছের। মনে রাখবেন এইটে দুর্গোত্সব – ক্রিসমাস নয়। গরম থাকবে – ভ্যাপসা ধরনের। কপালের দুই দিক দিয়ে পদ্মা গঙ্গা বয়ে যাবে। নাকের ডগায় ঝুলে থাকবে টলটলে ঘামের ফোঁটা। ঘাড়ের থেকে ডাউনস্ট্রিম নেমে ভিজিয়ে দেবে আপনার আনন্দ থেকে কেনা ডিজাইনার তসর পাঞ্জাবি। এই সবের কিছুই হবে না যদি মনে করে সঙ্গে রুমাল রাখেন। অঙ্কুরেই বিনাশ করুন ঘামকে। মুখ, ঘাড় আর মন – তিনটিই ফুরফুরে থাকবে।

১০ পুজো স্পিরিট: এইটে কিন্তু না নিয়ে বাড়ি থেকে একদম বেরোবেন না। ঠিক আছে – আপনি এমনিতে হায়াত ছাড়া বাইরে খান না – কিন্তু অষ্টমীর রাতে লেকটাউনের ফুঠপাথে যদি ডাবল এগ মটন রোল খেয়ে চোয়া ঢেকুর না তোলেন তো কল্লেন কি স্যার? এমনিতে ভিড় পছন্দ করেন না – অপরিচিতের গা ঘেষাঘেষি একদম নো নো। আরে বাবা, রোজ করতে তো বলছি না – পুজোর সময় কমন ম্যানের কাঁধে কাঁধ মেলান না – দিব্ব্যি লাগবে। মনে গুনগুন করে সলিল চৌধুরী ভাজুন – আরো বেটার ফীল করবেন। সসিয়ালিসম’এর প্রতি বিশ্বাসটা দেখবেন ফের অঙ্কুরিত হয়ে উঠছে।

কিছু মিস করে গেলুম নাকি? মারুন মারুন কমেন্ট মারুন জলদি।

বোলো দুগ্গা মাইকি – জয়!

Advertisements

The Goddess Cometh