সাধনা

[দেবলোক। খুব ভারী পোশাক, উজ্জল নীল রঙের দাড়ি আর একদম বেমানান  শিরস্ত্রাণ পরে দেবেশ্বর ব্রহ্মা একটা গোলমেলে চোঙ্গা মার্কা যন্ত্রে চোখ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে]

হেই ইউ নারদ – কাম হিয়ার। লুক থ্রু দ্য ফুটোস্কোপ। কি করছে ওই লোকটা?
বাওয়া – সটান খাড়া, উর্ধবাহু আর ডান পা ভাঁজ করে বাঁ জানুর ওপর রাখা। তিন দিনের না কামানো দাঁড়ি গোঁফ! ঠিক বুঝতে পারছি না প্রভু। হাইলি সাসপিশাস।
চিত্রগুপ্ত কোথায়? ওই বলতে পারবে
নেই স্যার। বিগ ডেটা প্রোজেক্ট নিয়ে ব্যাস্ত – ডিস্ট্রিবিউটেড হ্যাডুপ ডেটাবেসে ম্যাপরিডিউস এপ্লাই করে জন্ম মৃত্যু প্রেডিক্ট করার চেষ্টা করছে। আপনি নিজে কিছু বোঝার চেষ্টা করেছেন প্রভু?
করিচি। বামুন বেশে গিয়ে প্রথমে ভিক্ষে আর তাপ্পর বগলে কাতুকুতু দিয়েছি। কিসসু হয়নি। ফিরে এসে ঊর্বশী আর রম্ভাকে পাঠালাম। মুন্নি থেকে জিলিপি থেকে চামেলী – কোনো নাচেই কাজ দিলো না। ইচ্ছামৃত্যু-তিত্যুর জন্যে সাধনা করছে না তো রে?
কেস কেলো – দাঁড়ান নিজে গিয়ে দেখে আসি

[কয়েক মুহূর্ত পরে নারদের পুনঃ প্রবেশ]

পরেছি প্রভু, পেরেছি! সাধনার হেতু নির্ধারণ করতে পেরেছি
পেরেছিস? বাঃ – বাছার জন্যে খুব মায়া হচ্ছে রে। কি চায়? বল – দেরী করিস নি – দিয়ে দি!
পারবেন না প্রভু
হওয়াট! আমি হলাম ব্রহ্মা আর সামান্য এক মর্তের সাধকের ইচ্ছা পূরণ করতে পারব না? ইয়ার্কি হচ্ছে? কি এমন চায় সে? ব্রহ্মাস্ত্র হলে আমার স্টকেই আছে, পাশুপত হলে শিবুদাকে হওয়াটসয়াপ করলেই এসে দিয়ে যাবে।
ওই সব নয় স্যার। ওই সবের অনেক ওপরে। ও জিনিষ আমাদের কাছে নেই – কোনোদিন আসবেও না।
কি সে জিনিষ নারদ?
আইফোন সিক্স প্লাস, প্রভু

Advertisements

শেষ সম্বল

জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান। ন’ টি সংখ্যা আবার আবৃতির মতন করে আউড়াল হীরু। আবার একবার। দুটো আঙ্গুলের মধ্যে ধরা একটা আধ-ময়লা দশ টাকার নোট। সংখ্যাগুলি নোটের গায়ে লেখা ক্রমিক। মানুষের জীবনে অর্থ ফুরিয়ে আসে শুনেছিল হীরু – কিন্তু অর্থ ফুরোলে অনুভূতিটা যে কিরকম হবে বুঝতে পারত না। আজকে পারছে। আজকে সব অর্থেই হীরুর অর্থ শেষ – জীবনের এবং জীবন ধারণের উপায়ের। হীরুর দু আঙ্গুলের মধ্যে ধরা তার শেষ অবলম্বন – কুলুঙ্গিতে রাখা ধূলো পড়া ,রঙ জ্বলে যাওয়া গনেশ ঠাকুর চাপা দেয়া দুই ভাঁজ করা এই দশ টাকার নোটটা। সযত্নে বুক পকেটে নোটটাকে রেখে দিয়ে নিজের জামাটা ঠিক করে নিল হীরু। গনেশের পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলো। জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান – আর একবার অস্ফুটে অউড়ে নিল হীরু নিজের শেষ সম্বলের পরিচয়।

——————————————–

রসায়নে অনার্স ছিল হীরালাল মণ্ডল’এর। শহরের নয় – মফস্বলের কলেজ। পড়াশোনার চেয়ে ইউনিওনবাজী, গুন্ডাগিরি হত বেশি। পার্ট ওয়ান কোন রকমে পাস করলেও পার্ট টু আর উৎরোতে পারেনি হীরু। বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না, নিজের মনের না। তাই দ্বিতীয়বার আর পার্ট টু দেয়ার চাড় করেনি। কলকাতাতে এসে সোনারপুরে একটা কেমিক্যাল কম্পানিতে সামান্য মাইনের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট এর চাকরি পেয়ে গেল। বছর ঘুরেছে কি ঘোরেনি – গোলমাল শুরু হোল কারখানায়। প্রথমে মালিক বনাম ইউনিওন, পরে ইউনিওন বনাম ইউনিওন। কয়েক মাস পরেই কারখানার গেটে তালা। হীরু আর তার সহকর্মীরা অনেকদিন কারখানার গেটে অনশন করেছিলো – কিসসু হয়নি। পরে কুরিয়ার কম্পানি, দোকানের সেলসম্যান এমনকি হাউসিং সোসাইটির দ্বারওান – সব কিছু চেষ্টা করে শেষ মেশ হীরু বাসের কনডাকটার হয় – তিরিশের সি রুটে। সেই বাস এখন আর বেড়য় না। তেলের দাম বাড়া আর তার তাল না মিলিয়ে ভাড়া না বাড়া – মালিকের বাস চালানো পোষায় না। বাসটা পড়ে আছে গড়িয়ার কাছে একটা গ্যারেজের পেছনের মাঠে। কনডাকটারই করার সময়েই জুয়া খেলা আর নেশা করা শুরু করে হীরালাল। এই দুইয়ের প্রভাবে শরীর আর অর্থ দুটোই পাল্লা দিয়ে ক্ষইতে থাকে। তারই শেষ পরিণতি আজকের এই কুলুঙ্গির গনেশের নীচে রাখা জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান। জীবনের অর্থ কমতে কমতে দশ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

—————————————–

বাইপাসটা যেখানে এসে কামালগাজীতে মিশেছে, সেইখানে একটা দাপনার ঘুপচি বাড়িতে থাকে হীরু। খোলা নর্দমা পেড়িয়ে রাস্তায় পরে হাঁটতে লাগল হীরালাল। দুপুর বেলার অটোগুলো পাশ দিয়ে জিজ্ঞাসু ভাবে চলে যাচ্ছে – প্রশ্নই ওঠে না ধরার। হাঁটতে হাঁটতে হীরু ঢালাই ব্রিজের মেট্রো স্টেশনে পৌঁছাল। দম দম গামী ট্রেন আসতে কুড়ি মিনিট সময় আছে এখনো।

“কোথায় যাবেন?” রুক্ষ ভাবে জিগ্যেস করলো কাউন্টারের ওইদিকের লোকটা

“যে কোন”

“যে কোন মানে? কোন স্টেশন যাবে?” মুহূর্তে সম্বোধন আপনি থেকে তুমি সম্বধনে নেমে এল

“ওই তো – দিন না – গড়িয়া”

“দশ বের করছেন কি? দেখছেন না এইটা এগজ্যাক্কট চেঞ্জ কাউন্টার? পাশের লাইনে যান”

আঙ্গুলের ফাঁকে ধরা জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান – মুচকি হাসল হীরালাল। জীবনের শেষ সম্বলের সঙ্গে আরও মিনিট দুয়েক কাটানো যাবে – তা মন্দ কি?

“একটা টাকা হবে?” পাশের কাউন্টারের লোকটি প্রশ্ন ছুড়ে দিল হীরুর দিকে না তাকিয়েই

“না দাদা, এই আছে – আর নেই”

কাউন্টারের লোকটি থাবা মেরে তুলে নিল হীরুর রাখা দশ টাকার নোট টা। এই ছিল এই নেই – হীরালাল মণ্ডলের শেষ সম্বল চলে গেল একটা টিনের কৌটোর ভেতর। মাত্র কয়েক হাত দূরে কিন্তু চলে গেল চিরতরে। কালো চাকতি টিকিট আর দুটো দু টাকার চাকতি সড়াৎ করে ছুড়ে দিল কাউন্টারের দাদা। টাকার চাকতির নম্বর থাকে না – আলাদা করে তাদের সঙ্গে আত্মতিয়তা হয় না। সিঁড়ি ধরতে গিয়ে হীরু দেখল কল্যাপ্সিবিল গেটের ওইদিকে কোলে একটি শিশুকে ধরে এক মহিলা ভিক্ষে করছে। হাত বাড়িয়ে টাকা দুটো তাকে দিয়ে দিল হীরু। ব্যাস – একদম বাঁধন মুক্ত সে

————————————————-

ওই দূরের বাঁকে ট্রেন আসছে দেখা যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে লোক প্রায় নেই বললেই চলে। গতকাল বিজয়া দশমী গেছে – ছুটির মেজাজ কাটেনি এখনো। হীরু স্লথ পায়ে প্ল্যাটফর্মের একদম ধারটায় গিয়ে দাঁড়ালো। ঢাকের আওয়াজ আসছে। কাছের কোন পাড়ার ঠাকুর বিসর্জন যাচ্ছে। “আসছে বছর – আবার হবে”। ট্রেনটা একদম প্ল্যাটফর্মের কাছে এসে পড়েছে।

ছবি দেখিয়া কিনিবেন

“আমাদিগের কৃতী ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা তাহাদের ব্যবসা সামগ্রীতে নিজদিগের নাম জুড়িয়া দেয়। ইহাতে অপরিসীম সাহস লাগে। কিন্তু ইহা করিলে ব্যবসার মান উন্নত হয় – সামগ্রীর প্রতি ক্রেতাগনের বিশ্বাস বৃধি পায়। আমরা ইহাকে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং কহিয়া থাকি। উদাহরণ – কার্থবার্টসন য়্যান্ড রবার্টস।”
“কিন্তু স্যার, আপনাদের দেশে কি কেবল একজনই কার্থবার্টসন আর একজনই রবার্টস আছেন?”
“তোমার প্রশ্ন বোধগম্য হইলো না – তুমি কি বলিতে চাহ, বাবু?”
“স্যার, লোকে যদি চিনতেই না পারলো কোন কার্থবার্টসন আর কোন রবার্টস তাহলে আর নাম দিয়ে কাম কি? ঘোষ য়্যান্ড কোং দিলেই হয়। ”
“তোমার নিকট ইহার অধিক বেশি উত্কৃষ্ট কোনো সমাধান আছে?”
“আছে স্যার। এক্সট্রিম পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং শুনেচেন? না? শুনুন স্যার। আমি আর আমার এই বন্ধু ঠিক করিচি আমাদের ব্যবসা সামগ্রীতে শুধু নিজেদের নামই নয় – নিজেদের ছবিও লাগাবো। ক্রেতাগনের কোনো ভ্রান্তির জায়গাই থাকবে না। সারা জগৎ খুঁজে দেকুন তো স্যার এই রকম আর কোতাও দেকেচেন কিনা?”
“তোমাদের সাহসের আমি কুর্ণিশ করি বাবু – ভেরি ব্রেভ তোমরা। আমি প্রফেসর ফিলিপ কটলারসন সারা পৃথিবীতে শিক্ষা প্রদান করিয়াছি কিন্তু ইহা হেন সাহসের পরিচয় ইতিপূর্বে কোথাও দেখি নাই। আমি ভবিষ্যতবাণী করিতেছি – এক শতাব্দী অতিক্রম করিয়াও কোনো ব্যবসায়ী ইহাহেন সৎ সাহস দেখায়িতে পারিবে না। উঠিয়া আইস বাবু তোমরা দুই জন – কি নাম তোমাদিগের?”
“এই স্যার আমার নাম শ্রী দুলাল চন্দ্র ভড় আর এই আমার বন্ধু শ্রী বেণীমাধব শীল। “

বছর দশেক পর

স্টেশনটা ছোট্ট। কয়েকটা ট্রেনের ডিব্বা তো প্ল্যাটফর্ম উপচে যায়। লোকেরা হেঁচড়ে নামে – বাচ্চাদের কোলে করে নামায়। টিটি বাবু থাকেন না বললেই চলে। স্টেশন থেকে বেড়িয়েই রিকশা পাবেন। সাইকেল রিকশা। মোটরের ভটভটানি একদম নেই – তবে লোকের গলার আওয়াজ শুনতে পাবেন। রিকশাতে উঠে বসে কোথায় যাবেন বলতে না বলতেই শুনতে পাবেন আপনার ট্রেন ভোঁ মেরে ফের চলা শুরু করলো। আরও শান্ত হয়ে পড়ল চারপাশ।

নাকে রুমালটা লাগিয়ে রাখবেন। লাল মাটির দেশ তো – তার ওপর ভরা বসন্ত। খুব ধুলো উড়বে। তা বলে যেন মাঝে মাঝে ফুসফুস বোঝাই করে প্রান্তরের বাতাস নিতে ভুলবেন না! আপনি যেখান থেকে এয়েচেন সেখানে এই জিনিষ নেইকো! হাওয়াটা একটু ভেজা ভেজা মনে হচ্ছে না? হবেই তো – ওইতো আর একটু দূরে গেলেই নদী। রাস্তা একটু ঢালু হয়েছে কিনা? দেখছেন না, রিকশাওয়ালা এখন আর অতটা বেগ পাচ্ছে না গাড়িটা চালাতে। গুন গুন করে গান ভাঝছে ব্যাটা!

ব্যাস ব্যাস – এসে গিয়েছেন। পথের ধারে ওই যে দোকানটা – ওইটেই তো গন্তব্যস্থল! সবুজের  দিকচক্রভালের মধ্যে লাল হলুদের ছোপ আর মেটে ধুলোর মাঝে ধপধপে সাদা দোকানঘরটা। নামটাও বেশ – “পান্থজনের”। এখানে তো কারুর তেমন তাড়া থাকে না – তাই সবাই চায় দু দণ্ড জিরিয়ে নিতে। শরীর জিরনোর জন্যে চা, শরবত আর মন জুড়োনোর জন্যে বাউল গান – অঢেল ব্যবস্থা। সত্যিকারের বাউল গান! বাউলদেরই তো দোকান। অতিথি আপ্যায়ন থেকে পরিবেশন – সে পানীয়ই হোক বা খাবার বা গান – সব তারাই করেন। আমি তো নিমিত্ত মাত্র। বসুন না খানিক – বেঞ্চিটা গাছের নিচে নিয়ে বসুন। ওই দেখুন – মদন বাউলের আবার এখন গান পেয়েছে! সব ছেড়ে ছুড়ে বাবু বসে একতারা বাজিয়ে গান করছে – মুরশেদি বাউল গান! ভাল লাগছে না? ট্রেন যাত্রার আর রিকশা চড়ার ক্লান্তি কমে আসছে না? এই কিছুদিন হল স্যার শহুরে ইঁদুর দৌড় থেকে নিজেকে অব্যাহতি দিয়ে এইখানে আস্তানা গেড়েছি। গানে, গপ্পে, নদীর হাওায়, পলাশের রঙ্গে দিব্ব্যি কাটছে দিন গুলো…

“হওয়াই আর ইয়উ টেলিং মি অল দিস?”

মনটা পিছিয়ে গেল স্যার। দশটা বছর। সেদিনও ওই একি প্রশ্নের উত্তরে আমি এই কথাগুলো  কয়েছিলাম। দশটা বছর যে কোথা দিয়ে চলে গেল বুঝতেও পারলুম না

“সো লেট মি আস্ক এগেইন – হয়ের ডু ইয়উ সি ইয়উরসেলফ ইন দ্য নেক্সট টেন ইয়ার্স?”

“স্রেফ বেঁচে থাকতে চাই স্যার। ব্যাস, বেঁচে থাকতে চাই”।

———————————————

লেখকের কথা: সব লেখার মন থেকে কলম বেয়ে পাতায় নামার পেছনে কোনো একটা প্রভাব থাকে। এই লেখার জন্যে সেই প্রভাব বন্ধুবর তন্ময় মুখার্জির একটা ছোট্ট টুইট। কাজে ভরা দুপুরবেলায় নচিকেতার একটা গানের লাইন অকস্মাত মনে করিয়ে দিলো সে কালকে – “আমি কোনো বাউল হব এইটাই আমার এম্বিশন”

ধন্যবাদ তন্ময়!

বধ্য উম্মাদ

রিকশাটাকে সামনের রাস্তাটা দিয়ে যেতে দেখেছিল চন্দ্রশেখর। দেখেই কেমন জানি সন্দেহ হয়েছিলো সওয়ারিটির ব্যাপারে। সাইকেল রিকশাতে একলা বসে অমন হাথ ছুড়ে কথা কয় নাকি আবার কেউ? আর সাইকেল রিকশাওয়ালাটা আপন মনে পেডাল করেই চলেছে – যেন পেছনে যেটা হচ্ছে সেইটা শুনতেই পাচ্ছে না। সেই রিকশাটাই গেট পেড়িয়ে চলে যাবার পর আবার উল্টো দিক থেকে ফেরত এল। এসে দাঁড়ালো গেটের সামনে। দোতলার ঘরের জানলা দিয়ে সব দেখছে চন্দ্রশেখর। লোকটা কথা বলেই যাচ্ছে অনর্গল! হাথ তো নানা ভঙ্গিতে নাড়ছেই, মাঝে মাঝে ঘাড় বেঁকিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে হাসছে, কথা কইছে! চন্দ্রশেখর এই রকম ব্যবহার দেখে অভ্যস্ত কিন্তু খানিক কৌতূহলবশে দেখতে লাগল ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়।

সওয়ারি লোকটা জামা প্যান্ট কিন্তু ভালই পরে আছে। মাথার চুল যদিও খানিক উস্ক খুস্ক। মোটামুটি এই দুরত্ব থেকে চন্দ্রশেখর সওারির চোখে চশমা আছে দেখতে পাচ্ছে। লাফিয়ে রিকশা থেকে নামতে গিয়ে একটু হড়কে গেলেন সওারিবাবু। রিকশাওয়ালাটা হাথ বাড়িয়ে সামলে দিলেন ওনাকে। সওারিবাবু একটা হাথ রিকশাওালার দিকে বাড়িয়ে ধরেছিল – কথা বলার দমকে খানিকক্ষণ ওই ভাবেই রেখে দিল! মুখ নড়ে চলেছে অবিরাম। এখন আবার ঘুরে ঘুরে কথা বলছে – যেন রিকশাটা কোন জাগ্রত বিগ্রহ আর তাকে ঘিরে ভক্তের প্রদখখিন। একবার বোধহয় রিকশাওয়ালাটা ভাড়া ছেয়েছিল – তার দিকে বরাভয় দেবার মত করে হাথ ওঠালেন সওারিবাবু। আর কয়েক মিনিট ওই মুনি ঋষির মত ঠুটো হয়েই দাঁড়িয়ে রইলেন।

চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে চন্দ্রশেখর প্রথমে মিটি মিটি হাসছিলেন। একটু একটু করে হাসিতে শব্দ যোগ হল। শেষে চন্দ্রশেখর মাথা নাড়তে নাড়তে জানলার সামনে থেকে সড়ে গেলেন। হাসতে হাসতে বললেন “শালা বধ্য উন্মাদ…পাগল কি গাছে ফলে?”

ওদিকে সাইকেল রিকশার সওয়ারিবাবু লাল বাড়িটার গেটের দিকে এগিয়ে এসেছে। কান থেকে মোবাইল ফোনের তার খুলতে খুলতে দ্বারওয়ানকে জিগ্যেস করলো – “ভাই এই কে এইচ এফ এম ডি টা কোনদিকে বলতে পারেন ভাই?” দ্বারওয়ান বলল, “সে তো এই বাড়িটাই দাদা। করুণাময়ী হাউস অফ দ্য মেন্টালি ডিরেঞ্জেড। বাগান পেড়িয়ে চলে যান। বারান্দার পরেই রিসেপশন। বারান্দায় জুতো খুলে যাবেন কিন্তু”।

ঠাকুমা

“দারুণ হয়েছিল ছবিটা – সব্বাই কেমন সটান তাকিয়ে ক্যামেরার দিকে। হাসছে সব্বাই। কিন্তু এই দারুণ ছবিটাকে ঝোলানর জন্যেই কি অপেক্ষা করছিলে ঠাকুমা? নইলে অমন মোক্ষম সময়ই বেরতে হল ঘর থেকে?”

সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে অল্প একটু ফুলের কেয়ারি। কেয়ারির গা ঘেঁষে একটু দুরেই রান্নাঘর। রান্নাঘরের দুই পাশে স্নান ঘর আর কয়লা, কাঠ রাখার ঘর। কেয়ারির উল্টো দিকে, মানে সদর দিয়ে ঢুকে ডান দিকে চার ধাপ সিঁড়ি ভাঙলেই একটা লম্বা দাওয়া। আজকের দিন হলে লোকে দিব্বি এইটিকে প্যাঁটিও বলে চালিয়ে দিত। চলটা ওঠা সিমেন্টের মেঝে – ইতস্তত কয়েকটা চেয়ার ছড়ান। তাদের একটার সাথে অন্যটার কোন মিল নেই। আর রয়েছে একটা জুতোর তাক – শু র‍্যাক। দাওয়ার লাগা তিনটে দরজা – মানে তিনটে ঘর। একদম বাঁ পাশেরটা শোবার ঘর আর মাঝখানেরটা বৈঠক খানা। শুনতেই অমন জলসাঘর মার্কা লাগে, আদতে কিন্তু স্রেফ তিনটে কাঠের সোফা পাতার মত জায়েগা – আর একটা শো কেস। দাওয়ার একদম ডান দিকের ঘরটা ঠাকুমার। উঁকি দিলে প্রথমেই দেখা যায় ঠাকুরের আসন। তাতে অনেক দেবতা দেবীরা একে পরস্পরের গা ঘেঁষে বিদ্যমান। সরস্ঘবতী ছবিটা সব থেকে বড়।ঘররের এক কোণে একটা উঁচু খাট। ঠাকুমা ওতে ঘুমন।

ক্যামেরাটা মামার। রাশিয়ান। সদ্য কেনা, এবং এক রীল সাদা কালো ফিল্ম ভরা হয়েছে। আর একটা ছবি তুললেই ছত্তিরিশ – মানে রীল শেষ আর স্টেশন রোডে এস বি স্টুডিওতে ডেভেলপ করতে দিয়ে যাওয়া যাবে। আলাদা করে দুই ভাই, তাদের দুই মার, দুই বাবার – বিভিন্ন কম্বিনেশনে ছবি তোলা হয়ে গিয়েছে। বাকি একটা গ্রুপ ফোটো। মামা নেমে গিয়েছেন দাওয়ার নীচে, আর চেয়ার মেঝে মিলিয়ে তৈরি বাকি পরিবার। সটান ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সবাই। ডানদিককে একটু ভেতরে এনে, সবাইকে তাদের সেরা হাসি বের করার কড়া হুকুম দিয়ে খছাত করে শাটার পড়ার সাথে সাথে সেই ঘটনাটা ঘটল যেইটার সবার ভয় ছিল। নিজের ঘর থেকে ঠাকুমা বেড়িয়ে এলেন। আশির কাছে বয়েস। সেমিজ আর সাদা থান পড়নে – চৌকাঠ ডিঙ্গনোর জন্যে কাপড়টা হাঁটুর কাছে তোলা। বেড়িয়েই ছবি তোলার দৃশ্য দেখে একটু অবাক ভাবে ক্যামেরার দিকে তাকানো। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। একটা হাথ হাঁটুর ওপর। বেঁকে যাওয়া শিরদাঁড়া খানিক সোজা কৌতূহল ভরে। একটা সম্মিলিত আওয়াজে ঠাকুমা বুঝলেন যে তিনি বেশ গর্হিত কোন কাজ করে ফেলেছেন।

একগাদা চার ইঞ্চি বাই ছয় ইঞ্চি প্রিন্ট করা ফটোগ্রাফের মধ্যে এই ছবিটা হাথে নিয়ে অমিত বলে উঠল “দারুণ হয়েছিল ছবিটা – সব্বাই কেমন সটান তাকিয়ে ক্যামেরার দিকে। হাসছে সব্বাই। কিন্তু এই দারুণ ছবিটাকে ঝোলানর জন্যেই কি অপেক্ষা করছিলে ঠাকুমা? নইলে অমন মোক্ষম সময়ই বেরতে হল ঘর থেকে?”

“বুঝি নাই ভাই। বুঝলে যাইতাম না”, ছোট্ট জবাব দিয়েছিলেন ঠাকুমা

—————————————————————————————————-

“আর কোন ছবি নেই? এই ছবিটা থেকে এনলারজ করে মুখ বের করতে গেলে দাদা প্রচুর পিক্সেল এসে যাবে। অন্য কোন ছবি আছে কিনা দেখুন না?” স্টুডিয়োর মালিক ফটোটা মন দিয়ে দেখে বললেন অমিত সেনকে। “বলছেন বিখ্যাত মানুষ অথচ এই একটাই ছবি?”

“বিখ্যাত তো বটেই। টাউনে বিদ্যুৎ আসেনি তখনও। হ্যারিকেন নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের পড়াতেন। সেই পয়সায় সংসার চালাতেন আর কিছু জমাতেন মেয়েদের জন্যে স্কুল খুলবেন বলে। আমার ঠাকুমা। ওনার জীবনের ওপর একটা প্রবন্ধ লিখছি। কিন্তু এই গ্রুপ ছবিটা ছাড়া তো আর কোন ছবি নেই”।

 

আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে

সৌম্য ব্যানার্জি এখন কি করছে জানি না তবে সেইদিন দুপুরে আমার সঙ্গে ব্যাটিং করছিল।

ইন্ট্রা কলেজ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সেমি ফাইনাল। আমাদের থার্ড য়িয়ার বনাম কচি কাঁচাদের ফার্স্ট য়িয়ার। পঁচিশ ওভারের খেলা হতো। উত্তেজনা থাকত বেশি, আয়োজন তার চেয়ে ঢের কম। শীতের নরম দুপুরের রোদে ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় জমত খেলার মাঠে। আম্পায়ার নিরপেক্ষ – যে দল খেলছে না তাদের থেকে দুজন। স্কোর রাখা নিয়েই হত মুশকিল। যুধ্ধুমান দুই দলই নিজেদের স্কোরার বসাতো – যাতে কারচুপি না হতে পারে। সেই প্রথম আমি স্কোরে জল মেশানো ব্যাপারটা জেনেছিলুম (পরে সেই পদ্ধতিতে বার্ষিক সেলস কোটায় জল মেশাতে চেষ্টা করেছি – উইথআউট এনি সাকসেস)

যাক, ম্যাচের কোথায় ফেরা যাক। পুটকেগুলো প্রথমে ব্যাট করে বেশ বেধরক ঠেঙিয়ে গুচ্ছের রান বাগিয়ে বসলো। সব থেকে বেশি প্যাদানি খেয়েছিল আমাদের লীড পেসার – সৌম্য ব্যানার্জি। ওর বোলিং তো মার খেয়েছিলই – তার থেকে বেশি মার খেয়েছিলো ওর প্রেস্টিজ। সবে কেমিস্ট্রির রেশমীর সাথে প্রেমটা অঙ্কুরিত হচ্ছে – বাস স্টপ থেকে বাড়ির দুয়ার অবধি এগোনোর সাহস সঞ্চয় হয়েছে। সেই রেশমী বাউন্ডারির বাইরে বসা আর তার সামনেই ফার্স্ট য়িয়ারের ছোড়া কিনা পর পর তিন বলে তিন চার চাবকে দিল? আর করবি তো কর বল করতে নেমে পটা পট আমাদের চার ব্যাটসম্যান নামিয়ে দিল সামান্য রানের বিনিময়? প্রেস্টিজ তখন রালি সিং এর ফালুদার মত কুচি কুচি।

আমি বরাবরই সর্ব ঘটে কাঠালির মত – স্লিপে ফিল্ডিং, হালকা স্পিন বল আর মিডিল অর্ডার নুন আনতে পান্তা টাইপ ব্যাট। আমার ওপর কিনা এসে বর্তালো এই রানের মহাসাগর পার। তবে কিনা আমিও তখন খানিক দেস্পো। থার্ড য়িয়ার হয়ে গিয়েছে, মেয়েরা স্রেফ এসে আঁক কষিয়ে ফুটে যায় – বেশ বুঝতে পারছিলাম ওই এক্সট্রা কারিকুলারএর ছিপেই খেলিয়ে তুলতে হবে কিছু একটা। এন্ড হওয়াই ওয়েস্ট সাচ এন অপ্পরচুনিটি? ক্রিকেটে দলের পিঠে দেয়াল – সামনে ফাইনালের হাতছানি আর রানের পাহাড়। এদিকে হাথে উইকেট বেশি নেই। পরে অবিশ্যি ওই একই থিমে আমির খান গ্রেসী সিংহ আর এক মেমসাহেবকে এক ছিপে গেঁথে তুলেছিল। তবে সেইদিন কলকাতার বুকে চলছিল মহারণ। আমি যত পাগলা মনটাকে বেঁধে মন দিয়ে খেলার চেষ্টা করি, সৌম্য ততই “ফাইট” “ফাইট” বলে প্রায় প্রতি বলের পরেই বক্সারের মতো হাথ ছোড়ে। বাঁকা চোখ রেশমীর দিকে। যাই হোক, কিছু কোদাল চালিয়ে, কিছু তানপুরা বাজিয়ে আমরা রান সংগ্রহে মন দিলাম।

এইবারে স্কোর রাখার ব্যাপারটা বলি। আমাদের হয়ে স্কোর রাখছিল শুভাশীষ। উঠতি গায়ক। কলেজ ফেস্টে মাইক খোলা পেয়ে গিটারিয়া দেবুকে বার খাইয়ে হয়েত তোমারি জন্য গেয়ে দারুন নাম করেছে। আর ওদের – মানে ফার্স্ট য়িয়ারের হয়ে স্কোর রাখছিলো অর্পিতা। শুভো আর অর্পিতা দুজনেই বাগবাজার অঞ্চলে থাকে – সুভোর পুরোদস্তুর নজর আছে অর্পিতার ওপর। স্কোর রাখা হত খাতায় আর একটা ওভার শেষ হতেই – বা দরকার পড়লে তার মধ্যেও – চিত্কার করে স্কোর বলা হত খেলোয়ারদের জন্যে। “আর বাকি দশ ওভার, দরকার সত্তর রান” – এই ধরনের। সুভাশিষের গানের গলা (গণসঙ্গীত নয়) – তাই অর্পিতার গলাটাই পাচ্ছিলাম বেশি। ব্যাট করতে করতে তো আর রান গোনা যায় না, কিন্তু যতই ঠেঙিয়ে রান তুলি না কেন, আস্কিং রেট্ যেন আর নামতে চায় না। আর সৌম্যও ফাইট এর ডেসীবেল বাড়িয়ে তুললো। কিন্তু সেই যাই হোক, শেষ রক্ষা হলো না। ঠিক মনে নেই, কিন্তু এই খানিক দশ বারো রানে আমাদের হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেল ফার্স্ট য়িয়ার।

কিছুদিন পরে ফাইনালের দিন জানতে পারলাম এই স্ক্যাম অফ দ্য সেঞ্চুরি র ব্যাপারে (নব্বই’এর দশক, তাই সেঞ্চুরি সম্বন্ধে একটা ভালো ধারণা হয়ে গিয়েছে। এই স্ক্যাম বোফর্স কেও হার মানায়) প্রথম সন্দেহ হলো অর্পিতাকে স্কোর রাখতে না দেখে। আমার বাড়ির গলিতেই থাকে ফার্স্ট য়িয়ারের সুগত – লাড্ডু নামেই বেশি পরিচিত। চেপে ধরলুম আর লাড্ডু হড় হড় করে উগরে দিল সেই কারচুপির গপ্প। সেইদিন দুপুরে আমাদের ব্যাটিং শুরু হতেই নাকি অর্পিতা সুভাশীষদার প্রতি প্রেম রসে চুপচুপে কিছু মান্না দের গান শুনতে চেয়ে আবদার করে। কেন শোনাবে না শুভো? ঘাড় একটু সোজা করে চোখ বন্ধ করে শুভো গান ধরলো “ঘর ও সংসার সবাই তো চায়” ও পরে “লতিতা ওকে আজ চলে যেতে বলনা” র মত কালজয়ী গান। প্রেমরসে ভারী হয়ে উঠলো পরিবেশ। এর মধ্যেই সৌম্য মারলো এক অনবদ্য কভার ড্রাইভ – হাক পাক করে দৌড়ালাম তিন রান। শুভ গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো “কত হলো?” “এক রান শুভদা, তুমি গানটা শেষ কর দেখি!”, বলল অর্পিতা। এই ভাবেই চলল স্কোর রাখা। সৌম্য’র ফাইট কে তলিয়ে চলছে “তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছ, দিত পারনি” – ঠিক যেন বানর আর তৈলাক্ত বাঁশ। শেষে যখন “যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে ধুয়ো লাশ আমার লাল পানি দিয়ে” তখন আমাদের অবস্থা সেই বটগাছতলায় দেবদাসের মত। খেল খতম।

গত কাল ইহলোক ত্যাগ করেছেন মান্না বাবু – ওনার গান আমাদের ডুবিয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগেই!

ব্রাউন সাহেবের বাড়ি

দুহাজার সালে বোম্বাই শহরের পাট গুটিয়ে রওনা হলাম ব্যাঙ্গালোর পানে। মন খুব খুশি। বোম্বাই শহরটা ঠিক ধাতে পোষায় নি – খানিক রবীন্দ্রনাথের খাঁচার পাখির মতো নিজেকে বোঝানোর প্রবোধ দিয়ে টিঁকে ছিলুম। ব্যাঙ্গালোর সম্বন্ধে শোনা ছিল সামান্য কিছু: সামান্য হলেও কিন্তু সেইগুলি আমাদের কাছে ছিল বেশ জরুরি। সুন্দর আবহওয়া, মাঝারি মাপের শহর, চোখ চাইলে সবুজ প্রলেপ আর জীবনের গতি একশো মিটার দৌড়ের মত না। শহরের ভূগোল বলতে জানা ছিল স্রেফ দুটি অঞ্চল – ইনফ্যান্টট্রি রোড – আমার হবু অফিস আর ফ্রেজার টাউন।

যে যাই বলুক না কেন আমার পুরনো সাহেবী নাম ছেটানো শহর দিব্বি লাগে। তার লেখা পড়ে বড় হয়েছি ঠিকই কিন্তু ক্যামাক স্ট্রিটকে অবনীন্দ্রনাথ সরণী বললেই কেমন জানি কৌলিন্য চলে যায়। ক্যামাক স্ট্রিট নাম থাকলে মনে হয় যেন ঠিক মত ঝাড়ু পড়বে, খানা খন্দ বোজানো হবে, পথের ধারের গাছগুলি বেশি সবুজ থাকবে – সবাই সম্ভ্রমের চোখে দেখবে। আমার দাদু সব সময় নিউ মার্কেটকে হগ মার্কেট বলতো – শুনেই কেমন জানি কেক পেস্ট্রির গন্ধ আসত নাকে। এই সব কারণে ফ্রেজার টাউন নামটা ভীষণ মনে ধরেছিল – আর ধরেছিল একদম ক্ষুদে বয়েসে। সত্যজিত রায়ের “এক ডজন গপ্পো” র একটা ছিল “ব্রাউন সাহেবের বাড়ি” – একদম গায়ের লোম খাড়া করা গল্প। সেই গল্পের পটভূমি ব্যাঙ্গালোর আর অকুস্থল ফ্রেজার টাউনের এক পোড়ো বাংলো বাড়ি – যেখানে মরা সাহেবের ডায়রীর রহস্য উদঘাটন হয় আর ফিরে আসে মৃত সাইমন। এক মার্জার – বেড়াল – সাহেবের পোষা আর নাম সাইমন। সেই ফ্রেজার টাউন – ছোট্ট বেলার স্মৃতির একটা কোনা আঁকড়ে ধরে আসা ব্যাঙ্গালোরে।

IMG_20130810_162550আর হলো গিয়ে এক অবাক কান্ড – আমার অফিস আমাদের বাসা ঠিক করে দিল বেনসন টাউনের এক ফ্ল্যাটে। ব্যাঙ্গালোরের পূব দিকে (তখন সবাই পূব বলতো – এখন পুরো অঞ্চলটাই মধ্য ব্যাঙ্গালোর হয়ে গিয়েছে। ভৌগলিক পূব আর শহুরে পূবের মধ্যে গড়ে উঠেছে অনেক মাইলের দুরত্ব!) এই বেনসন টাউন। বাড়ির পাশ বরাবর একটা রেল লাইন আর রেল লাইনের উল্টোদিকের অঞ্চলটাই সেই ছোট্ট বেলার ফ্রেজার টাউন। বড় দোকানপাট বলতে সবই ওই ফ্রেজার টাউনে – তাই হামেশাই রেল লাইন পেড়িয়ে যেতে হত ফ্রেজার টাউনে। সুন্দর ছবির মতো সাজানো এই অঞ্চলে হটাতই একদিন দেখলাম বাড়িটাকে। প্রমেনএড রোড আর সন্ডার্স রোডের সংযোগ স্থলে বাড়িটা যেন বেওয়ারিশ পড়ে আছে। পরিতক্ত কতদিন কে জানে। অনেকটা জায়গা নিয়ে বেশ একটা বড় মাপের বাংলো বাড়ি। সামনের বাগানে – মানে এক কালে যেখানে বাগান ছিল – এখন আগাছার জঙ্গল। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়িটার বিশাল মাপের জানলাগুলি কয়েকটা ভেঙ্গে পড়েছে, সামনের বারান্দায় অবর্জনার স্তুপ। পিরামিডের মতো টালির ছাদ – সেটি বিলকুল অক্ষত আছে। না – ঢোকার একটা গেট থাকলেও সেই গেটের বাইরে “এভারগ্রীন লজ” কথাটা লেখা নেই। সত্যি বলতে কি – কিছুই লেখা নেই। কিন্তু একটা ফলক গোছের কিছু যে ছিল সেইটে দাগ দেখে পরিষ্কার বোঝা যায়। একদিন সন্ধে বেলায় ওই বাড়িটার সামনে, একটা টিমটিমে ল্যাম্প পোস্টের (তখনও ব্যাঙ্গালোরে হ্যালোজেন আলোর দৌরাত্ব শুরু হয়েনি) নীচে দাঁড়িয়ে আমার আর সন্দেহ রইলো না যে এইটেই ব্রাউন সাহেবের বাড়ি। ইষৎ লালচে আকাশের গায়ে কালো ভুতুড়ে ভাবে মেলে আছে নিজেকে। আর গাছগুলো থেকে যে কালো কালো জন্তুগুলি উড়ে যাচ্ছে ইতি-উতি সেইগুলো যে বাদুড় তা বলে দিতে হয় না। একটা কোনো পাখি বিকট ক্যা-ক্যা করে দেকে উঠছে থেকে থেকে। আমার সাহস একটু কম – হয়েত খানিক্ষণ দাঁড়ালে শুনতে পেতাম বুড়ো ব্রাউন তার প্রিয় বেড়ালকে ডাকছেন – “সাইমন, সাইমন – কাম হিয়ার”।

IMG_20130810_162603আর তারপর দেখুন কান্ড – গত বছর যখন সত্যজিতের ছেলে সন্দীপ এই গপ্পটা নিয়ে ছবি করলে তখন তার খোল নলচে এমন বদলে গেল যে ব্যাঙ্গালোর হয়ে গেল উত্তরবঙ্গের চা বাগান! বেচারা ব্রাউন সাহেবের বাড়ি – মানে আমার ব্রাউন সাহেবের বাড়ি – সেই একলাটি ই রয়ে গেল। আগাছা অনেক বেড়ে গিয়েছে, বাড়ির গায়ের চলটা উঠে গিয়েছে বেশ কয়েক জায়গায় – হটাত করে যেন বয়েস বেড়ে গিয়েছে বাড়িটার। ওই অঞ্চলের পাট গুটিয়ে আমিও কেটে পড়েছি অন্য পাড়ায়। তবে মাঝে মাঝেই আসা যাবার পথে দেখে যাই আমার ব্রাউন সাহেবের বাড়ি। একটু বেশি পথ হলেও বাড়িটার পুরোটা ঘুরে যাই – নাহ, এখনো কোনো প্রমোটারের বোর্ড লাগেনি। বুড়ো ব্রাউন বুক পেতে ধরে রেখেছে তার প্রিয় বেড়ালের স্মৃতি বিজরিত আধ ভাঙ্গা বাড়িটা। কোনো অন্ধকার রাতে এখনো মখমলের আরাম কেদারায় হয়েত ঘুমোতে আসে সেই কালো বেড়ালটা – আর সেই সুখেই ভরে ওঠে বুড়ো ব্রাউনের বুক।