ব্রাউন সাহেবের বাড়ি

দুহাজার সালে বোম্বাই শহরের পাট গুটিয়ে রওনা হলাম ব্যাঙ্গালোর পানে। মন খুব খুশি। বোম্বাই শহরটা ঠিক ধাতে পোষায় নি – খানিক রবীন্দ্রনাথের খাঁচার পাখির মতো নিজেকে বোঝানোর প্রবোধ দিয়ে টিঁকে ছিলুম। ব্যাঙ্গালোর সম্বন্ধে শোনা ছিল সামান্য কিছু: সামান্য হলেও কিন্তু সেইগুলি আমাদের কাছে ছিল বেশ জরুরি। সুন্দর আবহওয়া, মাঝারি মাপের শহর, চোখ চাইলে সবুজ প্রলেপ আর জীবনের গতি একশো মিটার দৌড়ের মত না। শহরের ভূগোল বলতে জানা ছিল স্রেফ দুটি অঞ্চল – ইনফ্যান্টট্রি রোড – আমার হবু অফিস আর ফ্রেজার টাউন।

যে যাই বলুক না কেন আমার পুরনো সাহেবী নাম ছেটানো শহর দিব্বি লাগে। তার লেখা পড়ে বড় হয়েছি ঠিকই কিন্তু ক্যামাক স্ট্রিটকে অবনীন্দ্রনাথ সরণী বললেই কেমন জানি কৌলিন্য চলে যায়। ক্যামাক স্ট্রিট নাম থাকলে মনে হয় যেন ঠিক মত ঝাড়ু পড়বে, খানা খন্দ বোজানো হবে, পথের ধারের গাছগুলি বেশি সবুজ থাকবে – সবাই সম্ভ্রমের চোখে দেখবে। আমার দাদু সব সময় নিউ মার্কেটকে হগ মার্কেট বলতো – শুনেই কেমন জানি কেক পেস্ট্রির গন্ধ আসত নাকে। এই সব কারণে ফ্রেজার টাউন নামটা ভীষণ মনে ধরেছিল – আর ধরেছিল একদম ক্ষুদে বয়েসে। সত্যজিত রায়ের “এক ডজন গপ্পো” র একটা ছিল “ব্রাউন সাহেবের বাড়ি” – একদম গায়ের লোম খাড়া করা গল্প। সেই গল্পের পটভূমি ব্যাঙ্গালোর আর অকুস্থল ফ্রেজার টাউনের এক পোড়ো বাংলো বাড়ি – যেখানে মরা সাহেবের ডায়রীর রহস্য উদঘাটন হয় আর ফিরে আসে মৃত সাইমন। এক মার্জার – বেড়াল – সাহেবের পোষা আর নাম সাইমন। সেই ফ্রেজার টাউন – ছোট্ট বেলার স্মৃতির একটা কোনা আঁকড়ে ধরে আসা ব্যাঙ্গালোরে।

IMG_20130810_162550আর হলো গিয়ে এক অবাক কান্ড – আমার অফিস আমাদের বাসা ঠিক করে দিল বেনসন টাউনের এক ফ্ল্যাটে। ব্যাঙ্গালোরের পূব দিকে (তখন সবাই পূব বলতো – এখন পুরো অঞ্চলটাই মধ্য ব্যাঙ্গালোর হয়ে গিয়েছে। ভৌগলিক পূব আর শহুরে পূবের মধ্যে গড়ে উঠেছে অনেক মাইলের দুরত্ব!) এই বেনসন টাউন। বাড়ির পাশ বরাবর একটা রেল লাইন আর রেল লাইনের উল্টোদিকের অঞ্চলটাই সেই ছোট্ট বেলার ফ্রেজার টাউন। বড় দোকানপাট বলতে সবই ওই ফ্রেজার টাউনে – তাই হামেশাই রেল লাইন পেড়িয়ে যেতে হত ফ্রেজার টাউনে। সুন্দর ছবির মতো সাজানো এই অঞ্চলে হটাতই একদিন দেখলাম বাড়িটাকে। প্রমেনএড রোড আর সন্ডার্স রোডের সংযোগ স্থলে বাড়িটা যেন বেওয়ারিশ পড়ে আছে। পরিতক্ত কতদিন কে জানে। অনেকটা জায়গা নিয়ে বেশ একটা বড় মাপের বাংলো বাড়ি। সামনের বাগানে – মানে এক কালে যেখানে বাগান ছিল – এখন আগাছার জঙ্গল। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়িটার বিশাল মাপের জানলাগুলি কয়েকটা ভেঙ্গে পড়েছে, সামনের বারান্দায় অবর্জনার স্তুপ। পিরামিডের মতো টালির ছাদ – সেটি বিলকুল অক্ষত আছে। না – ঢোকার একটা গেট থাকলেও সেই গেটের বাইরে “এভারগ্রীন লজ” কথাটা লেখা নেই। সত্যি বলতে কি – কিছুই লেখা নেই। কিন্তু একটা ফলক গোছের কিছু যে ছিল সেইটে দাগ দেখে পরিষ্কার বোঝা যায়। একদিন সন্ধে বেলায় ওই বাড়িটার সামনে, একটা টিমটিমে ল্যাম্প পোস্টের (তখনও ব্যাঙ্গালোরে হ্যালোজেন আলোর দৌরাত্ব শুরু হয়েনি) নীচে দাঁড়িয়ে আমার আর সন্দেহ রইলো না যে এইটেই ব্রাউন সাহেবের বাড়ি। ইষৎ লালচে আকাশের গায়ে কালো ভুতুড়ে ভাবে মেলে আছে নিজেকে। আর গাছগুলো থেকে যে কালো কালো জন্তুগুলি উড়ে যাচ্ছে ইতি-উতি সেইগুলো যে বাদুড় তা বলে দিতে হয় না। একটা কোনো পাখি বিকট ক্যা-ক্যা করে দেকে উঠছে থেকে থেকে। আমার সাহস একটু কম – হয়েত খানিক্ষণ দাঁড়ালে শুনতে পেতাম বুড়ো ব্রাউন তার প্রিয় বেড়ালকে ডাকছেন – “সাইমন, সাইমন – কাম হিয়ার”।

IMG_20130810_162603আর তারপর দেখুন কান্ড – গত বছর যখন সত্যজিতের ছেলে সন্দীপ এই গপ্পটা নিয়ে ছবি করলে তখন তার খোল নলচে এমন বদলে গেল যে ব্যাঙ্গালোর হয়ে গেল উত্তরবঙ্গের চা বাগান! বেচারা ব্রাউন সাহেবের বাড়ি – মানে আমার ব্রাউন সাহেবের বাড়ি – সেই একলাটি ই রয়ে গেল। আগাছা অনেক বেড়ে গিয়েছে, বাড়ির গায়ের চলটা উঠে গিয়েছে বেশ কয়েক জায়গায় – হটাত করে যেন বয়েস বেড়ে গিয়েছে বাড়িটার। ওই অঞ্চলের পাট গুটিয়ে আমিও কেটে পড়েছি অন্য পাড়ায়। তবে মাঝে মাঝেই আসা যাবার পথে দেখে যাই আমার ব্রাউন সাহেবের বাড়ি। একটু বেশি পথ হলেও বাড়িটার পুরোটা ঘুরে যাই – নাহ, এখনো কোনো প্রমোটারের বোর্ড লাগেনি। বুড়ো ব্রাউন বুক পেতে ধরে রেখেছে তার প্রিয় বেড়ালের স্মৃতি বিজরিত আধ ভাঙ্গা বাড়িটা। কোনো অন্ধকার রাতে এখনো মখমলের আরাম কেদারায় হয়েত ঘুমোতে আসে সেই কালো বেড়ালটা – আর সেই সুখেই ভরে ওঠে বুড়ো ব্রাউনের বুক।

Advertisements