সাধনা

[দেবলোক। খুব ভারী পোশাক, উজ্জল নীল রঙের দাড়ি আর একদম বেমানান  শিরস্ত্রাণ পরে দেবেশ্বর ব্রহ্মা একটা গোলমেলে চোঙ্গা মার্কা যন্ত্রে চোখ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে]

হেই ইউ নারদ – কাম হিয়ার। লুক থ্রু দ্য ফুটোস্কোপ। কি করছে ওই লোকটা?
বাওয়া – সটান খাড়া, উর্ধবাহু আর ডান পা ভাঁজ করে বাঁ জানুর ওপর রাখা। তিন দিনের না কামানো দাঁড়ি গোঁফ! ঠিক বুঝতে পারছি না প্রভু। হাইলি সাসপিশাস।
চিত্রগুপ্ত কোথায়? ওই বলতে পারবে
নেই স্যার। বিগ ডেটা প্রোজেক্ট নিয়ে ব্যাস্ত – ডিস্ট্রিবিউটেড হ্যাডুপ ডেটাবেসে ম্যাপরিডিউস এপ্লাই করে জন্ম মৃত্যু প্রেডিক্ট করার চেষ্টা করছে। আপনি নিজে কিছু বোঝার চেষ্টা করেছেন প্রভু?
করিচি। বামুন বেশে গিয়ে প্রথমে ভিক্ষে আর তাপ্পর বগলে কাতুকুতু দিয়েছি। কিসসু হয়নি। ফিরে এসে ঊর্বশী আর রম্ভাকে পাঠালাম। মুন্নি থেকে জিলিপি থেকে চামেলী – কোনো নাচেই কাজ দিলো না। ইচ্ছামৃত্যু-তিত্যুর জন্যে সাধনা করছে না তো রে?
কেস কেলো – দাঁড়ান নিজে গিয়ে দেখে আসি

[কয়েক মুহূর্ত পরে নারদের পুনঃ প্রবেশ]

পরেছি প্রভু, পেরেছি! সাধনার হেতু নির্ধারণ করতে পেরেছি
পেরেছিস? বাঃ – বাছার জন্যে খুব মায়া হচ্ছে রে। কি চায়? বল – দেরী করিস নি – দিয়ে দি!
পারবেন না প্রভু
হওয়াট! আমি হলাম ব্রহ্মা আর সামান্য এক মর্তের সাধকের ইচ্ছা পূরণ করতে পারব না? ইয়ার্কি হচ্ছে? কি এমন চায় সে? ব্রহ্মাস্ত্র হলে আমার স্টকেই আছে, পাশুপত হলে শিবুদাকে হওয়াটসয়াপ করলেই এসে দিয়ে যাবে।
ওই সব নয় স্যার। ওই সবের অনেক ওপরে। ও জিনিষ আমাদের কাছে নেই – কোনোদিন আসবেও না।
কি সে জিনিষ নারদ?
আইফোন সিক্স প্লাস, প্রভু

ছবি দেখিয়া কিনিবেন

“আমাদিগের কৃতী ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা তাহাদের ব্যবসা সামগ্রীতে নিজদিগের নাম জুড়িয়া দেয়। ইহাতে অপরিসীম সাহস লাগে। কিন্তু ইহা করিলে ব্যবসার মান উন্নত হয় – সামগ্রীর প্রতি ক্রেতাগনের বিশ্বাস বৃধি পায়। আমরা ইহাকে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং কহিয়া থাকি। উদাহরণ – কার্থবার্টসন য়্যান্ড রবার্টস।”
“কিন্তু স্যার, আপনাদের দেশে কি কেবল একজনই কার্থবার্টসন আর একজনই রবার্টস আছেন?”
“তোমার প্রশ্ন বোধগম্য হইলো না – তুমি কি বলিতে চাহ, বাবু?”
“স্যার, লোকে যদি চিনতেই না পারলো কোন কার্থবার্টসন আর কোন রবার্টস তাহলে আর নাম দিয়ে কাম কি? ঘোষ য়্যান্ড কোং দিলেই হয়। ”
“তোমার নিকট ইহার অধিক বেশি উত্কৃষ্ট কোনো সমাধান আছে?”
“আছে স্যার। এক্সট্রিম পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং শুনেচেন? না? শুনুন স্যার। আমি আর আমার এই বন্ধু ঠিক করিচি আমাদের ব্যবসা সামগ্রীতে শুধু নিজেদের নামই নয় – নিজেদের ছবিও লাগাবো। ক্রেতাগনের কোনো ভ্রান্তির জায়গাই থাকবে না। সারা জগৎ খুঁজে দেকুন তো স্যার এই রকম আর কোতাও দেকেচেন কিনা?”
“তোমাদের সাহসের আমি কুর্ণিশ করি বাবু – ভেরি ব্রেভ তোমরা। আমি প্রফেসর ফিলিপ কটলারসন সারা পৃথিবীতে শিক্ষা প্রদান করিয়াছি কিন্তু ইহা হেন সাহসের পরিচয় ইতিপূর্বে কোথাও দেখি নাই। আমি ভবিষ্যতবাণী করিতেছি – এক শতাব্দী অতিক্রম করিয়াও কোনো ব্যবসায়ী ইহাহেন সৎ সাহস দেখায়িতে পারিবে না। উঠিয়া আইস বাবু তোমরা দুই জন – কি নাম তোমাদিগের?”
“এই স্যার আমার নাম শ্রী দুলাল চন্দ্র ভড় আর এই আমার বন্ধু শ্রী বেণীমাধব শীল। “

রামনামী

Ramnami guru Mehtr Ram

Ramnami guru Mehtr Ram

এদের সমাজের নাম রামনামী। অস্পৃশ্য। বাস ছত্তিশগড়। এরা নিজেদের দেশে পরিত্যক্তই বলা যায়। এদের গ্রামের সন্ধান চাইলে কেউ দেখিয়ে দেয় না – চট করে কথার প্রসঙ্গ ঘুড়িয়ে ফেলে। কিম্বা স্রেফ না শোনার ভান করে। স্বাধীনতার আগে কিন্তু এরা পুরোপুরি গান্ধী ভক্ত ছিল। খুব আশা ছিলো এদের যে নতুন ভারতে নতুন ভাবে বাঁচবে – অস্পৃশ্যের তকমা আর তাদের থাকবে না। স্বাধীনতা এলো কিন্তু এদের দিন বদলালো না। বছর দশের ঘুরতেই রামনামীরা বুঝলো যে তারা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই থাকবে। বিদ্রোহ করলো রামনামীরা। ধর্ম বিদ্রোহ। হরিজন তারা – ভগবানের সন্তান, তাই ভগবান রামকেই বেছে নিল নিজেদের পরিচয় হিসেবে। রামের সন্তান বলে নিজেদের ঘোষণা করলো। তাদের রাম কিন্তু অযোধ্যার রাম নয় – তারা রামকে নিজেদের মতো করে তৈরী করে নিল| তৈরী করে নিলো নিজেদের রামায়ণ। এমনকি তাদের ধর্মগ্রন্থ রামচরিতমানসের প্রতিটি দোহার বিকল্প ব্যাখ্যা তৈরী করলো তারা। এই কি শেষ? নিজ সৃষ্ট ঈশ্বরের কাছে এই কি চরম আত্মসমর্পণ? না। ভগবান প্রদত্ত দেহটিকেও রামনামীরা অঞ্জলী দিল তাদের ভগবানের কাছে। সর্বাঙ্গে উল্কি করে আত্মস্থ করলো রামচরিতমানসের এক একটি দোহা। সূচ্যগ্র দেহপটও ছাড়া গেল না এই সমর্পণের মহালীলায়। পরের প্রজন্ম অবিশ্যি উল্কির ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়েছে। তাই এখন রামনামী সমাজে স্রেফ চারজন বেঁচে আছেন যাদের শরীর জুড়ে রামচরিত মানসের উল্কি!

রামনামীদের গল্প শুনছিলাম আমার আলোকচিত্রী বন্ধু জয়দীপ মিত্রের কাছে। চত্তিশগড়ের  মাটি ফাটা গরমে ঘুরে বাবু কয়েকদিন কাটিয়ে এলেন রামনামীদের গ্রামে। রামনামীদের নাম হয় – পদবী হয় না। নিজেদের মতো পদবী বেছে নেয় তারা। কেউ শর্মা, কেউ প্যাটেল কেউ মেহতা। একজন নাকি ব্যানার্জীও আছে! সকাল হলেই রামনামী সমাজে শুরু হয় গান আর নাচ। এক অদ্ভূত সুরে এরা রামচরিতমানস আবৃত্তি করে, রাম নাম লেখা একটা বিশাল চাদর গায়ে জড়িয়ে দুলে দুলে নাচে। মাথায় ময়ূরপুচ্ছের মুকুট!

আজকে সকালে সপরিবারে গিয়ে প্রজাধর্ম পালন করে এলাম – বোতাম টিপে ভোট দিয়ে। বোতাম টেপার সময় মনে পড়ে গেল – ছত্তিশ গড়ের জঙ্গলে রামনামীদের গ্রামে নিশ্চয় এখন সভা বসেছে – ময়ূরের পালক মাথায় পরে নেচে চলেছেন মেহতার রাম। নিজের মনে, নিজের সনে। তার সর্বাঙ্গে বিরাজ করছেন ঈশ্বর – গণতন্ত্রের ঈশ্বরে প্রয়োজন তাদের অনেক দিন হলো মিটে গিয়েছে।

পূঃ: ওপরে মেহতার রামের ছবিটি জয়্দীপের তোলা

আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে

সৌম্য ব্যানার্জি এখন কি করছে জানি না তবে সেইদিন দুপুরে আমার সঙ্গে ব্যাটিং করছিল।

ইন্ট্রা কলেজ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সেমি ফাইনাল। আমাদের থার্ড য়িয়ার বনাম কচি কাঁচাদের ফার্স্ট য়িয়ার। পঁচিশ ওভারের খেলা হতো। উত্তেজনা থাকত বেশি, আয়োজন তার চেয়ে ঢের কম। শীতের নরম দুপুরের রোদে ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় জমত খেলার মাঠে। আম্পায়ার নিরপেক্ষ – যে দল খেলছে না তাদের থেকে দুজন। স্কোর রাখা নিয়েই হত মুশকিল। যুধ্ধুমান দুই দলই নিজেদের স্কোরার বসাতো – যাতে কারচুপি না হতে পারে। সেই প্রথম আমি স্কোরে জল মেশানো ব্যাপারটা জেনেছিলুম (পরে সেই পদ্ধতিতে বার্ষিক সেলস কোটায় জল মেশাতে চেষ্টা করেছি – উইথআউট এনি সাকসেস)

যাক, ম্যাচের কোথায় ফেরা যাক। পুটকেগুলো প্রথমে ব্যাট করে বেশ বেধরক ঠেঙিয়ে গুচ্ছের রান বাগিয়ে বসলো। সব থেকে বেশি প্যাদানি খেয়েছিল আমাদের লীড পেসার – সৌম্য ব্যানার্জি। ওর বোলিং তো মার খেয়েছিলই – তার থেকে বেশি মার খেয়েছিলো ওর প্রেস্টিজ। সবে কেমিস্ট্রির রেশমীর সাথে প্রেমটা অঙ্কুরিত হচ্ছে – বাস স্টপ থেকে বাড়ির দুয়ার অবধি এগোনোর সাহস সঞ্চয় হয়েছে। সেই রেশমী বাউন্ডারির বাইরে বসা আর তার সামনেই ফার্স্ট য়িয়ারের ছোড়া কিনা পর পর তিন বলে তিন চার চাবকে দিল? আর করবি তো কর বল করতে নেমে পটা পট আমাদের চার ব্যাটসম্যান নামিয়ে দিল সামান্য রানের বিনিময়? প্রেস্টিজ তখন রালি সিং এর ফালুদার মত কুচি কুচি।

আমি বরাবরই সর্ব ঘটে কাঠালির মত – স্লিপে ফিল্ডিং, হালকা স্পিন বল আর মিডিল অর্ডার নুন আনতে পান্তা টাইপ ব্যাট। আমার ওপর কিনা এসে বর্তালো এই রানের মহাসাগর পার। তবে কিনা আমিও তখন খানিক দেস্পো। থার্ড য়িয়ার হয়ে গিয়েছে, মেয়েরা স্রেফ এসে আঁক কষিয়ে ফুটে যায় – বেশ বুঝতে পারছিলাম ওই এক্সট্রা কারিকুলারএর ছিপেই খেলিয়ে তুলতে হবে কিছু একটা। এন্ড হওয়াই ওয়েস্ট সাচ এন অপ্পরচুনিটি? ক্রিকেটে দলের পিঠে দেয়াল – সামনে ফাইনালের হাতছানি আর রানের পাহাড়। এদিকে হাথে উইকেট বেশি নেই। পরে অবিশ্যি ওই একই থিমে আমির খান গ্রেসী সিংহ আর এক মেমসাহেবকে এক ছিপে গেঁথে তুলেছিল। তবে সেইদিন কলকাতার বুকে চলছিল মহারণ। আমি যত পাগলা মনটাকে বেঁধে মন দিয়ে খেলার চেষ্টা করি, সৌম্য ততই “ফাইট” “ফাইট” বলে প্রায় প্রতি বলের পরেই বক্সারের মতো হাথ ছোড়ে। বাঁকা চোখ রেশমীর দিকে। যাই হোক, কিছু কোদাল চালিয়ে, কিছু তানপুরা বাজিয়ে আমরা রান সংগ্রহে মন দিলাম।

এইবারে স্কোর রাখার ব্যাপারটা বলি। আমাদের হয়ে স্কোর রাখছিল শুভাশীষ। উঠতি গায়ক। কলেজ ফেস্টে মাইক খোলা পেয়ে গিটারিয়া দেবুকে বার খাইয়ে হয়েত তোমারি জন্য গেয়ে দারুন নাম করেছে। আর ওদের – মানে ফার্স্ট য়িয়ারের হয়ে স্কোর রাখছিলো অর্পিতা। শুভো আর অর্পিতা দুজনেই বাগবাজার অঞ্চলে থাকে – সুভোর পুরোদস্তুর নজর আছে অর্পিতার ওপর। স্কোর রাখা হত খাতায় আর একটা ওভার শেষ হতেই – বা দরকার পড়লে তার মধ্যেও – চিত্কার করে স্কোর বলা হত খেলোয়ারদের জন্যে। “আর বাকি দশ ওভার, দরকার সত্তর রান” – এই ধরনের। সুভাশিষের গানের গলা (গণসঙ্গীত নয়) – তাই অর্পিতার গলাটাই পাচ্ছিলাম বেশি। ব্যাট করতে করতে তো আর রান গোনা যায় না, কিন্তু যতই ঠেঙিয়ে রান তুলি না কেন, আস্কিং রেট্ যেন আর নামতে চায় না। আর সৌম্যও ফাইট এর ডেসীবেল বাড়িয়ে তুললো। কিন্তু সেই যাই হোক, শেষ রক্ষা হলো না। ঠিক মনে নেই, কিন্তু এই খানিক দশ বারো রানে আমাদের হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেল ফার্স্ট য়িয়ার।

কিছুদিন পরে ফাইনালের দিন জানতে পারলাম এই স্ক্যাম অফ দ্য সেঞ্চুরি র ব্যাপারে (নব্বই’এর দশক, তাই সেঞ্চুরি সম্বন্ধে একটা ভালো ধারণা হয়ে গিয়েছে। এই স্ক্যাম বোফর্স কেও হার মানায়) প্রথম সন্দেহ হলো অর্পিতাকে স্কোর রাখতে না দেখে। আমার বাড়ির গলিতেই থাকে ফার্স্ট য়িয়ারের সুগত – লাড্ডু নামেই বেশি পরিচিত। চেপে ধরলুম আর লাড্ডু হড় হড় করে উগরে দিল সেই কারচুপির গপ্প। সেইদিন দুপুরে আমাদের ব্যাটিং শুরু হতেই নাকি অর্পিতা সুভাশীষদার প্রতি প্রেম রসে চুপচুপে কিছু মান্না দের গান শুনতে চেয়ে আবদার করে। কেন শোনাবে না শুভো? ঘাড় একটু সোজা করে চোখ বন্ধ করে শুভো গান ধরলো “ঘর ও সংসার সবাই তো চায়” ও পরে “লতিতা ওকে আজ চলে যেতে বলনা” র মত কালজয়ী গান। প্রেমরসে ভারী হয়ে উঠলো পরিবেশ। এর মধ্যেই সৌম্য মারলো এক অনবদ্য কভার ড্রাইভ – হাক পাক করে দৌড়ালাম তিন রান। শুভ গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো “কত হলো?” “এক রান শুভদা, তুমি গানটা শেষ কর দেখি!”, বলল অর্পিতা। এই ভাবেই চলল স্কোর রাখা। সৌম্য’র ফাইট কে তলিয়ে চলছে “তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছ, দিত পারনি” – ঠিক যেন বানর আর তৈলাক্ত বাঁশ। শেষে যখন “যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে ধুয়ো লাশ আমার লাল পানি দিয়ে” তখন আমাদের অবস্থা সেই বটগাছতলায় দেবদাসের মত। খেল খতম।

গত কাল ইহলোক ত্যাগ করেছেন মান্না বাবু – ওনার গান আমাদের ডুবিয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগেই!

দুগ্গা পুজোর দশ

পূজোর আর মাত্র কয়েক দিন ঘন্টা বাকি। মোহনবাঁশি রুদ্র পাল পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করে নিতে নিতে নিজেকে প্রশ্ন করছেন – হ্যাভ আই মেড ইট লার্জ? মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির দুঁদে ভাইস প্রেসিডেন্ট সান ফ্রান্সিসকোর কন কল ক্যানসেল করে দিচ্ছেন আলোকসজ্জা ফাইন টিউন করবেন বলে। কোন্দোমিনিউম এর কমুনিটি হল থেকে ভেসে আসছে “শুভ্র শঙ্খ রবে” এর কোরাস। কতক লজ্জা কতক কোমরের ঘের পেছনে ঠেলে রেবা, অর্পিতা, দেবযানী, দীপালি বৌদিরা পা মেলাচ্ছেন তালে তালে। মোদ্দা কথা হলো দা ফেস্টিভাল ইজ ইন দা এয়ার। কিন্তু আপনি? আপনি তৈরী তো? টু টেক দা বুল – মানে থুড়ি মহিষাসুর – বাই দা হর্ন? চট করে দেখে নিন আপনার দশভূজার দশটি মোক্ষম অস্ত্র। এইগুলি না নিয়ে মাঠে নেমেছেন কি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর মতো কচু কাটা হয়েছেন (দরকার পড়লে একটা প্রিন্ট নিয়ে সঙ্গে রাখুন)

পুদিন হারা: অথবা রানট্যাক। বাগবাজারে জমিয়ে সিঙ্গারাটা খেলেন যে, গাড়ি যতক্ষণে পাঁচ মাথার মোড় আসবে তখন গোল বাড়ির কষা মাংসের গন্ধ কি ভ্যারেন্ডা ভাজবে নাকি? আর যদি মানিকতলা এড়িয়ে সেন্ট্রাল এভিনিউ ধরেন তাহলে গিন্নী কি চাট দেখে হতভম্ব কুইজারের মত “পাস” বলবেন? সঙ্গে রাখুন ছোট্ট সবুজ বড়ি – টুক করে চালিয়ে দিন। দেখবেন যতক্ষণে সব ঘাটের জল খেয়ে বেদুইনে পৌছেছেন ততক্ষণে পেটে গণেশের ইঁদুর ডিস্কো করছে। ঝাঁপিয়ে পড়ুন মশাই – ডরনেকা নেহি, পুদিন হারা খানেকা

ব্যান্ড এইড: হেঁটে যদি ঠাকুর না দেখলেন তো করলেন কি? ঔক্কে, মে মাসে কেনা আই টেন টা নিয়ে বেরোবেন? যেখানে পার্কিং করবেন সেখান থেকে বালিগঞ্জ কালচারাল প্রচুর দূর। আর পায়ে নির্ঘাত নতুন টাটকা শ্রী লেদার্স? ওই যে নরম সরম জেলি মার্কা জিনিষটা গোড়ালির কাছে উঁকি দিছে ঐটে খেয়াল করেছেন? একডালিয়া র দত্ত মেডিকেল বন্ধ। করবেন কি? নেংচে মরে পালিয়ে যাবার রাস্তা ধরবেন? তৌবা তৌবা। ঘাবড়াও মত পদাতিক – পকেট থেকে ব্যান্ড এইড বের করুন, লাগান আর হাজার বছর ধরে পথ হাঁটুন পৃথিবীর বুকে

খুচরো টাকা: বিশেষ করে যদি গাড়ি নিয়ে বেরোন। পার্কিংএর ছোকরা কে একশো ধরিয়েছেন কি কোথায় ধা হয়ে যাবে নেতাজীর মতো – আর টিকিও দেখতে পাবেন না। নেমে যে চেইজ করবেন প্রখর রুদ্রর মতো সেও সম্ভব নয় – পেছনে গাড়ি হর্ন এবং গলা বের করে হুড়ো – দুই ই দিতে শুরু করেছে। বুক পকেটে খুচরো টাকা রাখুন – ভুলবেন না। আজকে থেকে অটো অন্ধকারে যে কাটা দশগুলো গছিয়ে দিয়েছিল সেইগুলি জমিয়ে রাখুন।

পাতি নোকিয়া ফোন: মনে পরে সেই খুদে বিতিকিচ্ছিরি দেখতে ফোনটিকে? মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, এই পুজোয় ঐটিকে বের করুন, আর একটা প্রি পেইড সিম ভরুন। আরে বাবা জানি, আপনার কাছে কাম্পানি প্রভাইডএড আই ফোন ফাইভ আছে, নিয়ে বেরোবেন। কিন্তু যতবার মায়ের সামনে হাথ ওঠাবেন ভক্তিতে সেই ফাঁকে টুক করে একটা ছবি কি তুলবেন না? আর ছবি ই যদি তুললেন সেইটে কি টুইটার বা ফেসবুকে দেবেন না? আর দিলেনই যদি, কটা রি টুইট বা লাইক পেলেন ঘন ঘন দেখবেন না? মশাই, এই করতে করতে কলেজ স্কোয়ার থেকে মহম্মদ আলী পার্ক পৌছাতে পারবেন না ব্যাটারির চৌদ্দটা না বাজিয়ে। তখন সরলা মাসীকে কালকে বেলা করে আসতে বলার ফোনটা করবেন কথথেকে শুনি? বের করুন নোকিয়া, লাগান নাম্বার। ইউ আর অল সেট

এইচ এম টি ঘড়ি: ছাড়ুন মশাই ওই সব ট্যাগ হোগার, বউম মের্সিয়ার আর ওমেগা। সন্তোষ মিত্র স্কোঅরের লাইনের ভিড় ভুলে গেছেন? মানুষের স্রোতে আপনি স্রেফ একটি খরকুটো। ভেসে চলেছেন। কার হাথ ধরছেন টাল সামলাতে, কে আপনাকে খিমছে ধরছে কিছুই বুঝতে পারবেন না। বৌবাজারের মোড়ে এসে যখন “কটা বাজে রে?” বলে কব্জি ঘুরিয়েছেন ততক্ষণে মাল ফাঁকা। গেলো তো, গত বছরের বোনাস? ওই রাস্তাও মাড়াবেন নি (ধুর মশাই, নেবুতলা পার্ক যাবেন, বারণ করছি না) – কিন্তু হাতে রাখুন এইচ এম টি অশোক। যেমন নাম তেমন কাম – চলে গেলেও পস্তাবেন না। পরের মাসে পাঁঠার মাংস থেকে বিরত থাকুন – দেখবেন ঘড়ির দাম উঠে এসেছে। কলেস্টলও কম।

হাথ পাখা: আরে না বাবা – রথের মেলায় যে শক্ত ডাঁটি ওয়ালাগুলো পাওয়া যায় সেগুলি নয়। বেশ হাল ফ্যাশনের ফোল্ডিং পাখা। দেখতে মাউথ অর্গানের মতো কিন্তু খুলে ধরলে যেন সাওয়ান কা মাহিনা তে বানওয়া নাচে মাউর। সুক্ষ কারুকাজ করাও পাওয়া যায় – দাম একটু বেশি পড়বে। বগলে ডিও স্প্রে করা হয়ে গেলে এক পোঁচ খুশবু এইটেতেও মেরে দিন। ঝলকে ঝলেক গন্ধ ছড়াবে, পলকে পলকে পুলক। কি বললেন, কেন নিয়ে বেরোবেন? ও হরি – তা নেবেন না তো গাড়ির পেছনের সীটে বসে কি সেদ্ধ হবেন নাকি? এ সি চালাবেন? মশাই আশি টাকা পেট্রল – বাপের জমিদারী না শ্বশুরের মিনিস্টারি – কোনটা আছে? এ ছাড়া যখন কাকুড়গাছির হানি দা ধাবাতে ডিনার খাবার লাইনে বসে থাকবেন তখন মৃদু মন্দ হওয়া খেতে পারবেন – খিদেটা চনমনে পাবে, মেজাজ কন্ট্রোলে থাকবে।

ছাতা: নাক সিটকোবেন না – একদম না। এই রাজ্যে ওনারা সংখ্যায় কমতে থাকলেও বিধির কিন্তু বাম হতে এক সেকন্ডও লাগে না। মুদিয়ালির মোড়ে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি এলে করবেনটা কি? গাড়িবারান্দার নিচে কতক্ষণ দাড়াবেন? সঙ্গে ছাতা থাকলে নির্ভয়ে রাসবিহারীর দিকে হাঁটা দিতে পারবেন পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে পথ চেনা গুনগুন করতে করতে। আবার নাক সিটকোচ্চেন? আরে মশাই স্টাইলের সাথে কে কম্প্রমাইজ করতে বলেছে? বার্গান্ডি রঙের কুর্তার সঙ্গে রং মিলিয়ে কিনুন না হালকা অ্যাশ কালারের ছাতা। দেখবেন ম্যাডক্সএর ভিজে সুন্দরীরা কেমন ঈর্ষার চোখে তাকাবে।

ডি এস এল আর: ছাড়ুন তো মশাই আপনার স্যামসাং এস থ্রির আট মেগাপিক্সেল। চাঁদে আর পোঁ … যাগ্গে। কম আলোয় তুলবেন শিব মন্দিরের প্রতিমার ছবি, কলেজ স্কোঅরের আলোর প্রতিবিম্ব জলের মধ্যে, শ্রীভূমির দুর্গার হাথে ঘুর্ণীয়মান চক্র, এক্সটেন্ডেড এক্সপোজারএ একডালিয়ার বয়ে যাওয়া ঝাপসা জনস্রোত। তখন ডি এস এল আর ছাড়া কিছুই পোষাবে না। মনে রাখবেন আপনি টেস্ট ম্যাচের খেলোয়াড় – আনতাবরি বিশ-বিশ এর জুয়াড়ি নন। ফেসবুকেই জীবন শেষ নয় – বিজয়ার অতিথি আপ্যায়ন আছে। কুচো নিমকি, নারকেল নাড়ু আর সিঙ্গেল মল্ট এগিয়ে দিয়ে টেবিলে ছড়িয়ে রাখবেন তোলা ছবিগুলো। দেখবেন মিসেস ঘোষ আপনাকে টোটালি অন্য চোখে দেখতে শুরু করবেন।

রুমাল: দুটো। মিনিমাম। পারলে একটা একটু টার্কিশ তোয়ালে গোছের। মনে রাখবেন এইটে দুর্গোত্সব – ক্রিসমাস নয়। গরম থাকবে – ভ্যাপসা ধরনের। কপালের দুই দিক দিয়ে পদ্মা গঙ্গা বয়ে যাবে। নাকের ডগায় ঝুলে থাকবে টলটলে ঘামের ফোঁটা। ঘাড়ের থেকে ডাউনস্ট্রিম নেমে ভিজিয়ে দেবে আপনার আনন্দ থেকে কেনা ডিজাইনার তসর পাঞ্জাবি। এই সবের কিছুই হবে না যদি মনে করে সঙ্গে রুমাল রাখেন। অঙ্কুরেই বিনাশ করুন ঘামকে। মুখ, ঘাড় আর মন – তিনটিই ফুরফুরে থাকবে।

১০ পুজো স্পিরিট: এইটে কিন্তু না নিয়ে বাড়ি থেকে একদম বেরোবেন না। ঠিক আছে – আপনি এমনিতে হায়াত ছাড়া বাইরে খান না – কিন্তু অষ্টমীর রাতে লেকটাউনের ফুঠপাথে যদি ডাবল এগ মটন রোল খেয়ে চোয়া ঢেকুর না তোলেন তো কল্লেন কি স্যার? এমনিতে ভিড় পছন্দ করেন না – অপরিচিতের গা ঘেষাঘেষি একদম নো নো। আরে বাবা, রোজ করতে তো বলছি না – পুজোর সময় কমন ম্যানের কাঁধে কাঁধ মেলান না – দিব্ব্যি লাগবে। মনে গুনগুন করে সলিল চৌধুরী ভাজুন – আরো বেটার ফীল করবেন। সসিয়ালিসম’এর প্রতি বিশ্বাসটা দেখবেন ফের অঙ্কুরিত হয়ে উঠছে।

কিছু মিস করে গেলুম নাকি? মারুন মারুন কমেন্ট মারুন জলদি।

বোলো দুগ্গা মাইকি – জয়!

শাপমোচন

শেষ বয়েসে বেশ কিছু বছর আমার দিদিমা আমাদের সঙ্গে থাকতেন। তখনও অহর্নিশি টেলিভিশনের যুগ শুরু হয়েনি। স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বিকেল ছটায় কৃষি দর্শন না দেখে আমার দিদিমা সন্ধে দিয়ে আমাকে একটা অনুরোধ করতেন। শাপমোচন শোনাতে।

Shapmochonরবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য “শাপমোচন”: আর সেইটে শোনা হত গ্রামোফোন রেকর্ডে। ছোট্টবেলা থেকে আমাদের বাড়িতে প্রচুর গ্রামোফোন রেকর্ড দেখে এসেছি। কিছু রেকর্ড খুব পুরনো – কিছুর সামান্য ঐতিহাসিক মূল্য আছে হয়েতো (যেমন আমাদের পড়শী টিকুর মাসি পূর্বা দাম – যাকে আমরা শিশুসুলভ বালখিল্যে “গুড় বাদাম” বলতাম – এর সই করা একটা রেকর্ড) “রেকর্ড” নামক রচনা লিখতে দিলে হয়েত পড়ুয়ারা শুরু করবে – রেকর্ড তিন প্রকার – এই বলে। ঠিকই। তেত্তিরিশ, পয়তাল্লিশ আর আটাত্তর – এই হলো রেকর্ডের কাস্ট সিস্টেম। এইগুলি রোটেশন পার মিনিট – এক মিনিট সময়ে চাকতিগুলি এতগুলি চক্কর কাটত। আর একটা ছোট্ট পিন রেকর্ডের গায়ে ঘষটে বের করত আওয়াজ। আটাত্তরে দু পিঠে দুটি গান – অথবা তখনকার দিনের খুব চলতি – একটা গানের দুটি অংশ। এই অংশ ভাগ করে গান ব্যাপারটা আমার দিব্যি লাগতো। বেশ মাথা খরচা করে তৈরী হত এই গানগুলি। রেকর্ডের পিঠ পরিবর্তন মানে গানের ভাবের বা গল্পেরও একটা দিক পরিবর্তন। একপিঠে তার প্রিয়তমার সঙ্গে সাতটি বছর আগের প্রথম দেখার স্মৃতি মেলে ধরলেন জগন্ময় মিত্র। আর অন্য পিঠে সময়কে এগিয়ে নিয়ে গেলেন সাতটি বছর, ফিরে গেলেন সেই মালতী তলে “যেখানে দাড়ায়ে প্রথম, বলেছিলে ভালবাসি”। সেই মালতী তলায় আজও ফুল ফোটে, বাঁশী বাজে – কিন্তু সেই প্রিয়তমা আর নেই। হয়েত মৃত্যু তাকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছে তার প্রিয়র কাছ থেকে। দুঃখ যেমন সুখের অন্য পিঠ বই কিছু না তেমনি একটা রেকর্ডে ধরা থাকত জীবন গল্পের দুটো পিঠ। ঠিক একই ভাবে সলিল চৌধুরী রেকর্ডের এক পিঠে রচনা করলেন ঘুঘু ডাকা ছায়ায় ঢাকা গ্রামের শান্ত ছবি আর অন্য পিঠে শোনালেন দূর্ভিক্ষের ডাকিনী যোগিনীদের উদ্দাম মরণ নৃত্যের কথা।

এইরকম ভাবে ভাঙ্গা হত রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যগুলোকে। সঙ্গীত পরিচালক বেশ কায়দা করে কাজটি করতেন – ভিনাইল রেকর্ডের খাঁজ আর ঘোরবার গতি, এই দুই ভেরিয়াবেল নিয়ে তৈরী হতো গান আর কথায় সমৃদ্ধ মোটামুটি এক ঘন্টার অনুষ্ঠান। শাপমোচন রেকর্ডটি বেশ চোস্ত ভাবে তৈরী – অযথা শিল্পীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েনি। অরুনশ্বরের গান গাইছেন হেমন্ত মুখার্জী আবার উনিই অরুনশ্বরের সংলাপ বলছেন। দরাজ ভরাট গলায় সূত্রধরের ভূমিকায় নজরুল পুত্র কাজী সব্যসাচী। গল্পের প্রথম ভাগে – বা রেকর্ডের প্রথম পিঠে অরুনেশ্বর ও মধুশ্রী স্বর্গ থেকে বিতরিত হলেন, মর্ত্যে এলেন ও বিবাহ বন্ধনে বাঁধা পড়লেন। বধূর পতিগৃহে যাত্রা দিয়ে আনন্দের প্রথম পিঠ শেষ হয়। ভালবাসার উল্টো পিঠে সংঘাত – কাব্যেও তাই ও রেকর্ডেও তাই। সন্তোষ সেনগুপ্তের সঙ্গীত পরিচালনায় জীবন্ত হয়ে উঠলো জীবন কাব্য।IMG_20130817_141428

গাড়ি চালাতে চালাতে তো আর ভিনাইল রেকর্ড শোনা যায় না – আর আজকাল আবার রিমেকের দৌরাত্য। তাই সহজলভ্য সি ডি তে কিনলুম নতুন শাপমোচন। দৈর্ঘ্যে পুরোনোটার থেকে বড় – পুরনোটাতে যেমন সময়কে মাথায় রেখে অরুনেশ্বর “আনমনা আনমনা” গানটি পুরোটি গাননি – কিন্তু নতুনটিতে যেন শ্রোতার অঢেল অবসর। আর যেহেতু সি ডির পিঠ হয়না তাই গীতিনাট্যটাও কেমন জানি সিধে রাস্তায় চলে – নাটকীয় মোড় গুলি নেই বললেই চলে।

অনলাইনে খুঁজে পুরোনো শাপমোচন পেলাম – সি ডি তে। বার্ন করে নিতেই কয়েক জি বি তে নেমে এলো কৈশোরের সঙ্গীতময় সন্ধের স্মৃতি। কিন্তু কিছু জিনিস তো ফিরবে না। যেমন দিদু ধীর পায়ে এসে বলবে না “ভাই, রেকর্ডের পিঠটা বদলাইয়া দিবা?”

ব্রাউন সাহেবের বাড়ি

দুহাজার সালে বোম্বাই শহরের পাট গুটিয়ে রওনা হলাম ব্যাঙ্গালোর পানে। মন খুব খুশি। বোম্বাই শহরটা ঠিক ধাতে পোষায় নি – খানিক রবীন্দ্রনাথের খাঁচার পাখির মতো নিজেকে বোঝানোর প্রবোধ দিয়ে টিঁকে ছিলুম। ব্যাঙ্গালোর সম্বন্ধে শোনা ছিল সামান্য কিছু: সামান্য হলেও কিন্তু সেইগুলি আমাদের কাছে ছিল বেশ জরুরি। সুন্দর আবহওয়া, মাঝারি মাপের শহর, চোখ চাইলে সবুজ প্রলেপ আর জীবনের গতি একশো মিটার দৌড়ের মত না। শহরের ভূগোল বলতে জানা ছিল স্রেফ দুটি অঞ্চল – ইনফ্যান্টট্রি রোড – আমার হবু অফিস আর ফ্রেজার টাউন।

যে যাই বলুক না কেন আমার পুরনো সাহেবী নাম ছেটানো শহর দিব্বি লাগে। তার লেখা পড়ে বড় হয়েছি ঠিকই কিন্তু ক্যামাক স্ট্রিটকে অবনীন্দ্রনাথ সরণী বললেই কেমন জানি কৌলিন্য চলে যায়। ক্যামাক স্ট্রিট নাম থাকলে মনে হয় যেন ঠিক মত ঝাড়ু পড়বে, খানা খন্দ বোজানো হবে, পথের ধারের গাছগুলি বেশি সবুজ থাকবে – সবাই সম্ভ্রমের চোখে দেখবে। আমার দাদু সব সময় নিউ মার্কেটকে হগ মার্কেট বলতো – শুনেই কেমন জানি কেক পেস্ট্রির গন্ধ আসত নাকে। এই সব কারণে ফ্রেজার টাউন নামটা ভীষণ মনে ধরেছিল – আর ধরেছিল একদম ক্ষুদে বয়েসে। সত্যজিত রায়ের “এক ডজন গপ্পো” র একটা ছিল “ব্রাউন সাহেবের বাড়ি” – একদম গায়ের লোম খাড়া করা গল্প। সেই গল্পের পটভূমি ব্যাঙ্গালোর আর অকুস্থল ফ্রেজার টাউনের এক পোড়ো বাংলো বাড়ি – যেখানে মরা সাহেবের ডায়রীর রহস্য উদঘাটন হয় আর ফিরে আসে মৃত সাইমন। এক মার্জার – বেড়াল – সাহেবের পোষা আর নাম সাইমন। সেই ফ্রেজার টাউন – ছোট্ট বেলার স্মৃতির একটা কোনা আঁকড়ে ধরে আসা ব্যাঙ্গালোরে।

IMG_20130810_162550আর হলো গিয়ে এক অবাক কান্ড – আমার অফিস আমাদের বাসা ঠিক করে দিল বেনসন টাউনের এক ফ্ল্যাটে। ব্যাঙ্গালোরের পূব দিকে (তখন সবাই পূব বলতো – এখন পুরো অঞ্চলটাই মধ্য ব্যাঙ্গালোর হয়ে গিয়েছে। ভৌগলিক পূব আর শহুরে পূবের মধ্যে গড়ে উঠেছে অনেক মাইলের দুরত্ব!) এই বেনসন টাউন। বাড়ির পাশ বরাবর একটা রেল লাইন আর রেল লাইনের উল্টোদিকের অঞ্চলটাই সেই ছোট্ট বেলার ফ্রেজার টাউন। বড় দোকানপাট বলতে সবই ওই ফ্রেজার টাউনে – তাই হামেশাই রেল লাইন পেড়িয়ে যেতে হত ফ্রেজার টাউনে। সুন্দর ছবির মতো সাজানো এই অঞ্চলে হটাতই একদিন দেখলাম বাড়িটাকে। প্রমেনএড রোড আর সন্ডার্স রোডের সংযোগ স্থলে বাড়িটা যেন বেওয়ারিশ পড়ে আছে। পরিতক্ত কতদিন কে জানে। অনেকটা জায়গা নিয়ে বেশ একটা বড় মাপের বাংলো বাড়ি। সামনের বাগানে – মানে এক কালে যেখানে বাগান ছিল – এখন আগাছার জঙ্গল। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়িটার বিশাল মাপের জানলাগুলি কয়েকটা ভেঙ্গে পড়েছে, সামনের বারান্দায় অবর্জনার স্তুপ। পিরামিডের মতো টালির ছাদ – সেটি বিলকুল অক্ষত আছে। না – ঢোকার একটা গেট থাকলেও সেই গেটের বাইরে “এভারগ্রীন লজ” কথাটা লেখা নেই। সত্যি বলতে কি – কিছুই লেখা নেই। কিন্তু একটা ফলক গোছের কিছু যে ছিল সেইটে দাগ দেখে পরিষ্কার বোঝা যায়। একদিন সন্ধে বেলায় ওই বাড়িটার সামনে, একটা টিমটিমে ল্যাম্প পোস্টের (তখনও ব্যাঙ্গালোরে হ্যালোজেন আলোর দৌরাত্ব শুরু হয়েনি) নীচে দাঁড়িয়ে আমার আর সন্দেহ রইলো না যে এইটেই ব্রাউন সাহেবের বাড়ি। ইষৎ লালচে আকাশের গায়ে কালো ভুতুড়ে ভাবে মেলে আছে নিজেকে। আর গাছগুলো থেকে যে কালো কালো জন্তুগুলি উড়ে যাচ্ছে ইতি-উতি সেইগুলো যে বাদুড় তা বলে দিতে হয় না। একটা কোনো পাখি বিকট ক্যা-ক্যা করে দেকে উঠছে থেকে থেকে। আমার সাহস একটু কম – হয়েত খানিক্ষণ দাঁড়ালে শুনতে পেতাম বুড়ো ব্রাউন তার প্রিয় বেড়ালকে ডাকছেন – “সাইমন, সাইমন – কাম হিয়ার”।

IMG_20130810_162603আর তারপর দেখুন কান্ড – গত বছর যখন সত্যজিতের ছেলে সন্দীপ এই গপ্পটা নিয়ে ছবি করলে তখন তার খোল নলচে এমন বদলে গেল যে ব্যাঙ্গালোর হয়ে গেল উত্তরবঙ্গের চা বাগান! বেচারা ব্রাউন সাহেবের বাড়ি – মানে আমার ব্রাউন সাহেবের বাড়ি – সেই একলাটি ই রয়ে গেল। আগাছা অনেক বেড়ে গিয়েছে, বাড়ির গায়ের চলটা উঠে গিয়েছে বেশ কয়েক জায়গায় – হটাত করে যেন বয়েস বেড়ে গিয়েছে বাড়িটার। ওই অঞ্চলের পাট গুটিয়ে আমিও কেটে পড়েছি অন্য পাড়ায়। তবে মাঝে মাঝেই আসা যাবার পথে দেখে যাই আমার ব্রাউন সাহেবের বাড়ি। একটু বেশি পথ হলেও বাড়িটার পুরোটা ঘুরে যাই – নাহ, এখনো কোনো প্রমোটারের বোর্ড লাগেনি। বুড়ো ব্রাউন বুক পেতে ধরে রেখেছে তার প্রিয় বেড়ালের স্মৃতি বিজরিত আধ ভাঙ্গা বাড়িটা। কোনো অন্ধকার রাতে এখনো মখমলের আরাম কেদারায় হয়েত ঘুমোতে আসে সেই কালো বেড়ালটা – আর সেই সুখেই ভরে ওঠে বুড়ো ব্রাউনের বুক।

বালেশ্বর

নামের সঙ্গে কাজের এমন অদ্ভুত মিল খুব কম দেখা যায়।

একটু পিছিয়ে যাই আমার শৈশবে। শিল্পনগর বার্নপুরে কেটেছিল জীবনের প্রথম পনেরোটি বছর। ছোট্ট, ছবির মত সাজানো উপনগর। এইরকম উপনগরীতে যেমনটি হয় ঠিক তেমনই সব দোকানপাট আঁকড়ে ছিল রেল ষ্টেশনকে। ষ্টেশন রোডের দোকানের মধ্যে চুল কাটাবার সেলুনও ছিল কিন্তু সেখানে আমাদের অবাধ গতিবিধি ছিল না। সেখানে যেতেন আমাদের বাবা কাকারা – বড়রা। আমাদের মধ্যে কচিদ-কদাচিৎ কারুর ভাগ্য হয়েতো শিকেয় ছিঁড়ত – তারা যেত সেই সেলুনে চুল কাটাতে। ফিরে এসে তারা গপ্পো বলত স্প্রে করে ঘাড়ে জল ছেটাবার আর গদি দেয়া নরম চেয়ারএর। আমাদের সে সুযোগ বিশেষ হত না। তাই আমাদের জন্যে ছিল ঘরে এসে চুল কেটে দেয়ার নাপিত। একজন নাপিতই ছিল পুরো অঞ্চলটায়। নাম বালেশ্বর। নামের সঙ্গে কাজের অদ্ভুত মিল।

বালেশ্বরকে কোন দিন ধুতি- শার্ট ছাড়া কিছু পড়তে দেখিনি। আর সেইটে থাকতো ধবধবে সাদা। শীতকালে একটা জহর কোট। পায়ে কালো পাম্প শু আর কাঁচা পাকা চুল পাট করে ব্যাকব্রাশ আঁচড়ানো (আমরা মাঝে মাঝে আমাদের খুদে মনে আলোচনা করতাম – “বালশ্বরের চুল কে কেটে দেয়?”)।. বালেশ্বরের হাথে থাকতো একটা ছোটো আলুমিনিয়ামের বাক্স তার মধ্যে থাকতো চিরুনি, কাঁচী, ক্লিপ ইত্যাদি। অক্লান্ত বালেশ্বর হেঁটে যেত উপনগরীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত (তখন আমাদের উপনগরীতে সাইকেল রিক্সা ছাড়া আর কোন যানবাহন ছিল না)।, কোনো বাড়ি থেকে ডাকলে সেই বাড়িতে ঢুকে চুল ছেঁটে দিত বালেশ্বর – বেশির ভাগই খুদে খদ্দের মিলত, কখনো বাবা কাকারাও ছাঁটিয়ে নিতেন বালেশ্বরের কাছে। একটা ছোট টুল বাগানে পেতে, খবরের কাগজের ওপর, বালশ্বর কাজ শুরু করত। শুরুর ঠিক আগে মা এসে চিরাচরিত নির্দেশ দিয়ে যেতেন – “ছোট করে কাটবে বালেশ্বর!” বালেশ্বর শুধু একটা কথায় উত্তর দিত – সত্যি বলতে কি, আমি বালেশ্বরকে কখনো আর কোন বাড়তি কথা বলতে শুনিনি – একটু গম্ভীর গলায়, সামান্য মুচকি হেসে বালেশ্বর বলত – “বেশ”।,ব্যাস, ওই একটাই কথা। বেশ। আমরা একটু বড় হলে, সাহস করে মা’র হুমকি অগ্রাহ্য করে যদি বলতাম “বালেশ্বর, ওপরটা একদম কদম ছাঁট করে দিও না!” তারও জবাব আসতো – “বেশ”।,চুল ছাঁটা হয়ে গেলে,পয়সা নিয়ে নিজের সরঞ্জাম আলুমিনিউমের বাক্সে গুছিয়ে আবার চলা শুরু করত বালেশ্বর।

কালের নিয়মে হয়েত বালেশ্বর মারা গিয়েছেন। সেই সঙ্গে প্রায় মারা গিয়েছে পাড়ার নাপিতরা। তাদের আর দেখা যায়না। মধ্য কলকাতার রোয়াকে বসে একগাল ফেনা নিয়ে কেউ বিশ্বনাথের স্কোয়ার কাটের আলোচনা আর করেন না। সবার বড্ড তাড়া। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে এখন সপরিবারে চুল কাটতে যাওয়াই রেওয়াজ। আজকাল শুনি আগে থেকে ফোন করে গেলে ভালো হয় – অপেক্ষা করতে হয় না। সেই গড্ডালিকা প্রবাহে আমিও গা ভাসিয়েছি। তবু সেলুনের চেয়ারে বসে কেন জানি মনে হয় – এই যদি বলি “বালেশ্বর, ওপরের চুল একদম পাতলা হয়ে গিয়েছে, বেশি ছেঁটো না” হয়েত একটা গম্ভীর গলায় পেছন থেকে শুনতে পাব – “বেশ”।

কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি

“দাদু আপনার নেবু চা আর দুটো লেড়ে বিস্কুট – টোটাল হবে আঠারো টাকা। খুচরো দেবেন।”

লেকের ধারে মেলা ভিড়। তাই আমি একটু অন্যদিকে প্রাতঃ ভ্রমণ সেরে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলুম এমন সময় দোকানদারের ছুঁড়ে দেয়া কথাটা কানে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে বললেও আমাকে উদ্দ্যেশ করে নয়। দোকানীর কথা শুনে আমার পাশে একটু পেছন করে ঘুরে বসা দীর্ঘ কান্তি বৃদ্ধ জোব্বার পকেট থেকে কিছু টাকা ও পয়েসা বের করে গুনতে লাগলেন খুব স্লথ গতিতে। জোব্বা? এই মে মাসের গরমে জোব্বা? একটু অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে তো আমি একদম থ! শিট! এ যে রবি ঠাকুর! একদম জেরক্স কপি। সেই ঋষি সুলভ চাউনি, ঝক-ঝকে চোখ, পাতলা হয়ে আশা সাদা চুলদাড়ি গোঁফ। ভুল হবার কোন জো নেই!
“কি পাইনি, তার হিসাব মেলাতে মন মোর নহে রাজি …একটু হাথ বাড়িয়ে দামটা দোকানীকে দিয়ে দেবে, ভাই?”, বৃদ্ধ বললেন। আর সন্দেহ রইল না বিন্দুমাত্র – গাড়িতে ভয়েস অফ টেগোর সি ডি তে কতবার ওই খনাগলায় “তবু মনে রেখো” শুনেছি। ডাইভ দিয়ে পড়লুম পায়ে। ভট করে মুখ থেকে বেড়িয়ে গেল – “আমায় বাঁচাও রবি ঠাকুর, আমি নোংরা এক আস্তাকুর …।” সস্নেহে বুকে টেনে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গলফ গ্রীনের দিকে যেতে টুকরো কথা হল ওনার সাথে …।

আমি: এমনি আচমকা চলে এলেন যে?
রবিঃ অনেক কথা শুনতে পাই ওপরে বসে। আমার লেখার, গানের প্রসার – তারপর আমার গল্প নিয়ে ছবি। ছবিতে আমার গান। কপিরাইট উঠে যাবার পর আমার গানের বিবর্তন। অনেক কিছু শুনি। চক্ষু কর্ণের বিবাদ বেশিদিন রাখা সমীচীন না – তাই সরেজমিনে ভাবলুম দেখে যাই।

আমিঃ ভালো করেছেন! প্রথম প্রতিক্রিয়া?
রবিঃ ভাবলুম, বাঙ্গালীদের থেকে বাইরে লোকেরা আমাকে কেমন চিনেছে একটু বাজিয়ে দেখি। গেলুম উত্তর ভারতে। পরিচয় দিতেই কিছু লোক “আপনি সাইফ আলি খানের দাদাজি আছেন?” জিগ্যেস করলো। ইশ্বর জানেন কে এই আমার পড়ে পাওয়া নাতি। কিছু লোক জারা চিনল তারা গাক গাক করে “আপনি টেগোর আছেন? ভালবাসি, ভালবাসি … রসগোল্লা রসগোল্লা। একলা চল রে … চল রে” বলে ধেয়ে এল। বোঝো কাণ্ড! তাদের কাছে এই হল আমার পরিচয়। আর আমি এদের নিয়ে কবিতা লিখেছিলুম “পঞ্চনদের তীরে, বেণী পাকাইয়া শিরে”?

আমিঃ কিন্তু খানিক বিশ্বায়ান হয়েছে, এইটে কিন্তু মানতে হবে গুরুদেব
রবিঃ হ্যা, শুনলুম এক মহিলা নাকি অক্লান্ত ভাবে আমার গান হিন্দিতে গেয়ে চলেন? এই কি বিশ্বায়ান? কি নাকি এক ক্রিকেট ম্যাচের আগে মাঠে স্টেজ বেঁধে তারস্বাওরে আমার গান গাওয়া হয়েছে? এই কি বিশ্বায়ান? আমার লেখা শুনলুম ইন্টারনেটে দিয়েছে যাতে লোকে আর কষ্ট করে বাঁধানো বই এর ত্রিসীমানা না মাড়ায়। এক ছোকরা আই-প্যাড না কি বস্তুতে দেখাল। সে বানানের কি ছিরি। শোন ভাই, খান কয়েক ড্রাম বা ইলেকট্রিক গিটার বাজিয়ে “তোমায় নতুন করে পাব বলে” গাইলেই তো বিশ্বায়ান হয় না। বিশ্বের দর্পণে ধরতে হবে আমার লেখা, আলোচনা করতে হবে অন্তর্নিহিত বানীর। দেখতে হবে আজকের সমাজে আমার চিন্তাধারা খাপ খাচ্ছে কি না।

আমিঃ একটু ট্যান খেয়ে যাচ্ছি। তা এখন তো এই শহরে কান পাতলেই আপনার গান। ভালো লাগে?
রবিঃ তা লাগে! আগের মোড়ে শুনলুম “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সামান” বাজছে। একটু দাঁড়িয়ে পরেছি আর একটা ট্যাক্সি একদম দিয়েছিল আর কি ফের বাইশে শ্রাবণ করে। তবে কিনা এই গানগুলি আমি লিখেছিলুম একান্তে শোনার জন্যে – একাকীত্বের শূন্যতাকে পরিপূর্ণ করার জন্যে। তাই রাস্তার মোড়ে সেই গান বাজলে একটু বুকে বাজে – বাজে লাগে

আমিঃ এখনো কিন্তু আপনার গানের সি ডি, বই ভালো বিক্রি হয়। বাঙালি এখনো আপনাকে পেতে চায়
রবিঃ সে তো আমার শেষ যাত্রা থেকেই চাইছে। বাপরে – শকট জোড়াসাঁকো পেরিয়েছে কি পেরয়নি – লোকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে চুল, দাড়ি পটা পট ছিঁড়তে শুরু করে দিলে? নাকি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখবে! নোবেলটাও ঝেঁপে দিল। ভাগ্যিস নাইট খেতাব প্রত্যাখান করেছিলুম, নাহলে হয়েত কারো বৈঠকখানায় সেই মণিহার শোভা পেত এতদিন। আমাকে পেতে গেলে আমার জোব্বা থেকে কাপড় কেটে নিলেই তো হবে না – আমার মতবাদ কে গ্রহণ করতে হবে, সংকীর্ণতা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। “আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া” – এইটাকে সর্বান্তকরণে আঁকড়ে ধরতে হবে

আমিঃ কলকাতা শহরটাকে কি বলবেন?
রবিঃ বলার মত কিছু রেখেছ নাকি? বড়লোকের মল আর ছোটলোকের মুত্র – এই তো আছে এই শহরে। হ্যা, আর কিছু হত কুচ্ছিত আমার মূর্তি। সাধে কি আমি সুযোগ পেলেই পালাতাম শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন। আর বাছা, এই ব্রিজের রেলিঙগুলো সব সাদা নীল রঙ কেন?

আমিঃ আগ্যে গুরুদেব, ওইটি এখনকার মুখ্য মন্ত্রীর প্রিয় রঙ। উনি কিন্তু আপনার বিশেষ ভক্ত
রবিঃ সুনিছি ওনার ব্যাপারে – এই সেদিন সুনীল – মানে সুনীল গাঙ্গুলির সাথে কথা হচ্ছিলো। কোন সভায় জানি মধু কবির ছবির বদলে আমার ছবি লাগিয়ে দিয়েছিলেন! বোঝো কাণ্ড! তবে হ্যা, মানতেই হবে যে উনি আসার পর থেকে পার্টি আফিস গুলিতে আমার গানের চাহিদা বেড়ে গিয়েছে – বছরে তিরিশবার চিত্রাঙ্গদা আর শ্যামা শাপমোচনের অশ্রুমোচন এখন একটা গতানুগতিক ধারায় এসে গিয়েছে।

হাঁটেতে হাঁটতে থমকে দাঁড়িয়ে পরলেন রবীন্দ্রনাথ। মুখ তুলে চাইলেন পথের ধারে সার বাঁধা কৃষ্ণচূড়া গাছগুলির দিকে। রক্তরাগের আগুন ঝড়িয়ে গাছগুলি পথের ওপর লাল ফুলের গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। “এখনো শহরে এমন ফুল ফোটে? ফুরিয়ে বেলা, চুকিয়ে খেলা তপ্ত ধূলার পথে ঝরা ফুলের রথের চাকা এখনো শহর ছোঁয়? কি অনাবিল সৌন্দর্য”, বলে উঠলেন কবিগুরু। হাল্কা হাওওায় চুলগুলি উড়ছে। দুহাথ সামনে প্রসারিত করে গুনগুন করে গান ধরলেন কবিগুরু “রাঙিয়ে দিয়ে যাও, যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও”

“কি কেস দাদু? রাঙিয়ে দিয়ে যাও? পঞ্চায়েত ভোটের আগে সি পি এম নাকি?”, আচমকা দেখি গোটা দুয়েক পাড়ার মাস্তান টাইপের লোক এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। “এই পাড়া থেকে সব মাকুদের ঠেঙ্গিয়ে বের করেছি। এখন এখানে শুধু রোবিন্দ সঙ্গীত বাজবে – দিদি তাই বলেছেন। সেই সময়ে কে বস আপনি মাওবাদি দাড়ি চুমরে রাঙিয়ে দিয়ে যাও কপচাচ্ছ?”
“আরে দাদা, করেন কি! ইনি তো স্বয়ং রবিঠাকুর!”, আমি ঝটপট সামাল দিতে চেষ্টা করি
“বাওওাল করবেন না দাদা, বিলা হয়ে যাবে। আমরা সবাই বাইশে শ্রাবণ দেখেছি। আমরা জানি উনি লাস্ট সিনে নিজেকে গুলি করে মরেছেন। এখন আবার কেষ্ট ঠাকুর সেজে কে বে এই সং – শালা লাল রঙের সং গাইছেন?”, দু জনের ভিড় দেখলাম মুহূর্তে চার পাঁচে দাঁড়িয়ে গেল। বুঝলাম হাওওা গোলমেলে।
“চলুন তো দাদু পার্টি অফিসে – দেখি আপনার এই লাল টমেটো মার্কা গান কদ্দিন চলে! ওরে কচি, তোল দাদুকে সুমোতে আর নিয়ে চল অফিসে”।
হতভম্ব হয়ে দেখলুম দীর্ঘ কান্তি মানুষটিকে ঠেলে গাড়িতে তুলে নেয়া হল। ঋষি প্রতিম মুখে কোন ভাবান্তর নেই। আমার পানে চেয়ে স্মিত হাসলেন। গান গাইছেন “বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন, এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান”

গলির গল্প

সুরি লেন আর গোমস  লেন। মধ্য কোলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলের দুটো পাশাপাশি গলি। গোমস  লেনকে কেন জানি সবাই গোমেশ  লেন বলতো – একগাদা বাঙালি নামওালা রাস্তার মাঝে বেচারা ওই একটা ইংরেজ নামের রাস্তা – একটু উচ্চারণ বিভ্রাট তো হতেই পারে। এই সুরি লেন আর গোমস  লেন এর মধ্যে ছিল একটা সরু গলি – একপ্রান্তে সুরি লেনের কালি বাড়ি আর অন্য প্রান্তে গোমস  লেনের তেলেভাজার দোকান। ইংরেজি এল হরফের মত গলিটা এত সরু ছিল যে দুজন পাশ কাটিয়ে যেতে পারতো না।এমনকি একজন গেলেও তেরছা হয়ে যেতে হত – কাঁধে ঠেকত স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের ঠাণ্ডা। নিয়মই ছিল যে কাশতে কাশতে ঢুকতে হবে আর যদি হটাত মাঝপথে ওই এল এর কনুইএ দেখা যায় উলটো পথগামি দিগভ্রান্ত কাউকে তাহলে স্রেফ নার্ভের খেলা। যিনি দুর্বল চিত্ত তিনি পিছে হেঁটে যাবেন আর অন্যজন জেনেরাল মানেকশর মত গিয়ে পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বলবেন “আওয়াজ দিন, আওয়াজ দিন”।

গলিটা কখনো সূর্যের মুখ দেখেনি। এদিকে হয়েত আবার কত কি দেখেছে। সাতচল্লিশের দাঙ্গায় হয়েত কেউ এই গলি দিয়ে দৌড়ে প্রাণ বাঁচায় – হয়েত আবার কেউ হটাত অন্য প্রান্তে গিয়ে দেখে সড়কি বা কাটারি অপেক্ষা করে আছে।গলির প্রান্ত বদলালে হয়েত ধর্মও বদলে যায়! এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখত যে মেডেল পাওয়া ছেলেটা, যে মার অসুখ শুনে রাতের আঁধারে বর্ধমান থেকে লুকিয়ে এসেছিল মাকে একবার দেখতে -একাত্তরে এই গলিতেই হয়েত ভোরের আলো ফোটার আগে পুলিশের গুলি তার বুকটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছিল। ওই তো – ওই যে দেয়ালে সিমেন্টের কিছুটা চলটা উঠে আছে – ওইখানেই নিশ্চয় গুলিটা গিয়ে লেগেছিল।ইটগুলো মুখিয়ে রয়েছে কত গল্প শোনাবার জন্যে। বোবা হয়ে দেখেছে কত পথ চলতি উপাখ্যান।

ওই গলিটা পেড়িয়ে একটু দূরে সুরি লেনের কোনা ঘেঁষে সেনবাবুদের বাড়ি। জবাকুসুম তেলের সেনবাবু। যাদের তেলের বিজ্ঞাপনে স্বয়ং শরত পণ্ডিত – দাদাঠাকুর – পাঞ্চলাইন  লিখে দিয়েছিলেন। এক সুন্দরী যুবতী শ্যামা পুজায় রত – এই ছবির সঙ্গে এক ছত্র লেখা – “সাধনে জবাকুসুম, প্রসাধনে জবাকুসুম”।

Golir Golpoলাল রঙের তেলের সঙ্গে মিলিয়ে গোলাপি রঙের বাড়ী। কি বিশাল গেট। ছিল। এখন আর নেই। “তুষিত  প্রেয়সী চিত্ত যদি ইছছা চিতে, অনুরোধ  করি মোরা এই তৈল নিতে” গানে যে জিনিষ এক কালে বিকত সে কি আজকের দিনে চলে? চলে না। তাই সে তৈলর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ীর সামনের বাগানটাও লোপ পেয়েছে। লোপ পেয়েছে বলা ভুল – সুন্দর ছিমছাম গোলাপি বাড়ীটা ঢেকে দিয়ে একটা বেখাপ্পা ওনারশিপ ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে। দুটো ফুটফুটে বাচ্চা কে খেলতে দেখতুম ওই সামনের বাগানটায়। তাদের এক্কা দোক্কা খেলার চৌখুপিতে এখন কারো দশ ফুট বাই দশ ফুটের স্বপ্ন।

“ওরা দরজা বন্ধ করে না কেন, দিদু”? বাড়ীটার অদ্ভুত একটা নাম ছিল – ভূতের বাড়ী। পুরনো আমলের সাবেকি দালান বাড়ী। দরজাটা সব সময় খোলাই থাকত – বিশেষ করে দুর্গা পূজার সময়। দিদিমার হাত ধরে যেতাম ঠাকুর দেখতে। দিদিমার হাঁটুতে বাত ছিল – তাই বাড়ীর কাছের ঠাকুর গুলি দেখিয়ে আনতেন একদিন সন্ধেবেলা। ভূতের বাড়ীর খোলা দুয়ার দিয়ে ঢুকলে একটা বিরাট ঠাকুর দালান আর তারই মাঝবরাবর ডাকের সাজের প্রতিমা। ডাকের সাজ কথাটা দিদুর কাছেই শেখা। তবে ওই বাড়ীর দরজাটা কেন কখনো বন্ধ হয় না তার সদুত্তর আমার দিদিমা দিতে পারেন নি। পারবেনও না – বারো বছর হল মারা গিয়েছেন। ভূতের বাড়ী কবে মারা গিয়েছিল জানি না – বাড়ীটা আর নেই। সারপেনটাইন লেনের ভূতের বাড়ী এখন পঞ্চ ভুতে বিলীন।নতুন বাড়ীর ভিত শুরু হয়েছে – বাইরে একটা ছবি – নতুন বাড়ীটা কেমন হবে। কিনতে চাইলে ফোনও করা যায়া। নাহ, এই বাড়ীতে কি আর টানা টানা চোখের মা দুর্গা সবুজ রঙের অসুরকে বধ করবেন? একদিক থেকে ভাল হয়েছে – আমার ছেলে যদি আমাকে সেই প্রশ্নটাই করে বসতো যেইটা আমি দিদুকে করেছিলাম তাহলে বড়ই বেগতিক হত! ভালই হয়েছে বাড়ী ভেঙ্গে দিয়ে – না রইল বাঁশ, না বাজবে বাঁশরী।

মামাবাড়ির আশেপাশের এই গলিগুলোতে ছোটবেলার কত গল্প চাপ বেঁধে আছে। শীতের দুপুরে হাটতে হাটতে মনে হল এই বাড়িগুলো কত গল্প জানে। কিছু কিছু বাড়ী তো স্বয়ং গল্প। ওই তো, ওই বাড়ীটাই তো গগন চৌধুরীর স্টুডিও। ওই তো আধ-বন্ধ চিলেকোঠা ঘরের জানলা যেখানে মাঝ রাত্তিরে মারা যাওয়া লোকেরা নিজের ছবি আঁকাতে আসেন। গগন চৌধুরী কি জানলা দিয়ে দেখে ভূতের বাড়ীর ছবি এঁকেছিলেন? ওই দালানটাই না – যেখানে সোনার কেল্লার দুষ্টু লোকেরা ভুল মুকুলকে ফেলে রেখে গেছিল? আর ওই তো ওই বিশাল থামওয়ালা বাড়ীটা – সামনে পুরো আগাছার জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছে! ওর বৈঠকখানাতেই তো দাবার ঘুঁটি সাজিয়ে দুঁদে পুলিশ অফিসার – প্রাক্তন – প্রবীর রায় চৌধুরী বসে আছেন – আর খুঁজে চলেছেন নিজের হারিয়ে যাওয়া অতীতে ফিরে যাবার ভয়ঙ্কর সুন্দর কবিতাময় রাস্তা।

অতীতের সঙ্গে আজকের বড্ড সংঘাত – থমকে থাকা সময়কে কে যেন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে সামনের পথে ঠেলে দিয়েছে। সে যেতে চায়নি, জানেন, কিন্তু তবু তাকে যেতে হয়েছে কালের নিয়মে। ওই যে সর্বাধিকারীদের বাড়ীর সিং দরজার সিংহগুলো – পায়ের চাপে একটা বলকে ধরে রেখেছে। বাড়ীটা এখনো আছে – একটা ক্লিনিক না কি হয়েছে। সিংহগুলো একটু ভেঙ্গে গেলেও বেশ আছে এখনো। ছোটবেলায় এগুলোকে কি বিশাল মনে হত। এখন আর হয় না। বড় হয়ে গেছি কিনা! পাল্টে গিয়েছি কিনা!

শীতের দুপুরের রোদ হাল্কা লাল হয়ে আসছে – বেলা ঢলে এল। “পাল্টে গেলি তুই, আমিও পাল্টে গিয়েছি মাঝ পথে হাঁটতে হাঁটতে …”