শেষ সম্বল

জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান। ন’ টি সংখ্যা আবার আবৃতির মতন করে আউড়াল হীরু। আবার একবার। দুটো আঙ্গুলের মধ্যে ধরা একটা আধ-ময়লা দশ টাকার নোট। সংখ্যাগুলি নোটের গায়ে লেখা ক্রমিক। মানুষের জীবনে অর্থ ফুরিয়ে আসে শুনেছিল হীরু – কিন্তু অর্থ ফুরোলে অনুভূতিটা যে কিরকম হবে বুঝতে পারত না। আজকে পারছে। আজকে সব অর্থেই হীরুর অর্থ শেষ – জীবনের এবং জীবন ধারণের উপায়ের। হীরুর দু আঙ্গুলের মধ্যে ধরা তার শেষ অবলম্বন – কুলুঙ্গিতে রাখা ধূলো পড়া ,রঙ জ্বলে যাওয়া গনেশ ঠাকুর চাপা দেয়া দুই ভাঁজ করা এই দশ টাকার নোটটা। সযত্নে বুক পকেটে নোটটাকে রেখে দিয়ে নিজের জামাটা ঠিক করে নিল হীরু। গনেশের পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলো। জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান – আর একবার অস্ফুটে অউড়ে নিল হীরু নিজের শেষ সম্বলের পরিচয়।

——————————————–

রসায়নে অনার্স ছিল হীরালাল মণ্ডল’এর। শহরের নয় – মফস্বলের কলেজ। পড়াশোনার চেয়ে ইউনিওনবাজী, গুন্ডাগিরি হত বেশি। পার্ট ওয়ান কোন রকমে পাস করলেও পার্ট টু আর উৎরোতে পারেনি হীরু। বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না, নিজের মনের না। তাই দ্বিতীয়বার আর পার্ট টু দেয়ার চাড় করেনি। কলকাতাতে এসে সোনারপুরে একটা কেমিক্যাল কম্পানিতে সামান্য মাইনের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট এর চাকরি পেয়ে গেল। বছর ঘুরেছে কি ঘোরেনি – গোলমাল শুরু হোল কারখানায়। প্রথমে মালিক বনাম ইউনিওন, পরে ইউনিওন বনাম ইউনিওন। কয়েক মাস পরেই কারখানার গেটে তালা। হীরু আর তার সহকর্মীরা অনেকদিন কারখানার গেটে অনশন করেছিলো – কিসসু হয়নি। পরে কুরিয়ার কম্পানি, দোকানের সেলসম্যান এমনকি হাউসিং সোসাইটির দ্বারওান – সব কিছু চেষ্টা করে শেষ মেশ হীরু বাসের কনডাকটার হয় – তিরিশের সি রুটে। সেই বাস এখন আর বেড়য় না। তেলের দাম বাড়া আর তার তাল না মিলিয়ে ভাড়া না বাড়া – মালিকের বাস চালানো পোষায় না। বাসটা পড়ে আছে গড়িয়ার কাছে একটা গ্যারেজের পেছনের মাঠে। কনডাকটারই করার সময়েই জুয়া খেলা আর নেশা করা শুরু করে হীরালাল। এই দুইয়ের প্রভাবে শরীর আর অর্থ দুটোই পাল্লা দিয়ে ক্ষইতে থাকে। তারই শেষ পরিণতি আজকের এই কুলুঙ্গির গনেশের নীচে রাখা জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান। জীবনের অর্থ কমতে কমতে দশ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

—————————————–

বাইপাসটা যেখানে এসে কামালগাজীতে মিশেছে, সেইখানে একটা দাপনার ঘুপচি বাড়িতে থাকে হীরু। খোলা নর্দমা পেড়িয়ে রাস্তায় পরে হাঁটতে লাগল হীরালাল। দুপুর বেলার অটোগুলো পাশ দিয়ে জিজ্ঞাসু ভাবে চলে যাচ্ছে – প্রশ্নই ওঠে না ধরার। হাঁটতে হাঁটতে হীরু ঢালাই ব্রিজের মেট্রো স্টেশনে পৌঁছাল। দম দম গামী ট্রেন আসতে কুড়ি মিনিট সময় আছে এখনো।

“কোথায় যাবেন?” রুক্ষ ভাবে জিগ্যেস করলো কাউন্টারের ওইদিকের লোকটা

“যে কোন”

“যে কোন মানে? কোন স্টেশন যাবে?” মুহূর্তে সম্বোধন আপনি থেকে তুমি সম্বধনে নেমে এল

“ওই তো – দিন না – গড়িয়া”

“দশ বের করছেন কি? দেখছেন না এইটা এগজ্যাক্কট চেঞ্জ কাউন্টার? পাশের লাইনে যান”

আঙ্গুলের ফাঁকে ধরা জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান – মুচকি হাসল হীরালাল। জীবনের শেষ সম্বলের সঙ্গে আরও মিনিট দুয়েক কাটানো যাবে – তা মন্দ কি?

“একটা টাকা হবে?” পাশের কাউন্টারের লোকটি প্রশ্ন ছুড়ে দিল হীরুর দিকে না তাকিয়েই

“না দাদা, এই আছে – আর নেই”

কাউন্টারের লোকটি থাবা মেরে তুলে নিল হীরুর রাখা দশ টাকার নোট টা। এই ছিল এই নেই – হীরালাল মণ্ডলের শেষ সম্বল চলে গেল একটা টিনের কৌটোর ভেতর। মাত্র কয়েক হাত দূরে কিন্তু চলে গেল চিরতরে। কালো চাকতি টিকিট আর দুটো দু টাকার চাকতি সড়াৎ করে ছুড়ে দিল কাউন্টারের দাদা। টাকার চাকতির নম্বর থাকে না – আলাদা করে তাদের সঙ্গে আত্মতিয়তা হয় না। সিঁড়ি ধরতে গিয়ে হীরু দেখল কল্যাপ্সিবিল গেটের ওইদিকে কোলে একটি শিশুকে ধরে এক মহিলা ভিক্ষে করছে। হাত বাড়িয়ে টাকা দুটো তাকে দিয়ে দিল হীরু। ব্যাস – একদম বাঁধন মুক্ত সে

————————————————-

ওই দূরের বাঁকে ট্রেন আসছে দেখা যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে লোক প্রায় নেই বললেই চলে। গতকাল বিজয়া দশমী গেছে – ছুটির মেজাজ কাটেনি এখনো। হীরু স্লথ পায়ে প্ল্যাটফর্মের একদম ধারটায় গিয়ে দাঁড়ালো। ঢাকের আওয়াজ আসছে। কাছের কোন পাড়ার ঠাকুর বিসর্জন যাচ্ছে। “আসছে বছর – আবার হবে”। ট্রেনটা একদম প্ল্যাটফর্মের কাছে এসে পড়েছে।

Advertisements

ঘুষ

কম্পিউটার এর মনিটরটা বন্ধ করে চেয়ারটা ঠেলে দাঁড়াতেই রঞ্জনের মনে হল সব্বাই তার দিকে দেখছে। রঞ্জন বড়াল আজ সাত বছর হয়ে গেল আবগারি বিভাগে চাকরি করছেন। আবগারি মানে এক্সসাইস অ্যান্ড কাস্টমস। নির্ঝঞ্ঝাটের চাকরি – সকাল নটায় সীটে এসে বসা, ফাইল দেখা, দুপুরে অফিসের বেয়ারা উমেশকে দিয়ে পাশের গলির চাইনিজ দোকানের চাউ মিন, দিনে অন্তত তিন কাপ চা আর পাঁচটা বাজলেই কাজ গুটিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা – এই হোল রঞ্জনের দিন-নামচা। বাড়িতে রঞ্জনের বউ আর বছর পাঁচেকের ছেলে। ছোট্ট ছিম ছাম সংসার। কিন্তু আজকেই সব কিছু গড়বর।

আজকে রঞ্জন জীবনে প্রথম ঘুষ নিয়েছে।

ব্যাপারটা সামান্যই। কলকাতা শহরে আর মদের দোকানের পারমিট দেয়া হয় না। তবে পুরনো পারমিট যাদের আছে তারা অনেক সময় পারমিট বেচে দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে মদের দোকান চালানোটা একটু দৃষ্টিকটু লাগে হয়েত! কিন্তু কোর্ট কাছারি করে সেই পুরনো পারমিটে একখানা নতুন সীলমোহর লাগাতে পারমিট ক্রেতাকে আসতে হয় এই আবগারি বিভাগে। গত একমাস ধরে পাইকপাড়ার এক মদের দোকানী ঘুরে চলেছেন এই সীলমোহরের জন্যে। ওনার কেনা পারমিটটি বহু পুরনো – সেই ফাইল খুজে, ঘেঁটে বের করতেই অনেক সময় গেছে। আজকে রঞ্জন অন্তত জানতে পেরেছে যে পুরনো ফাইলটা আছে – হারিয়ে, পুড়ে যায়নি। আর দিন তিনেকের মধেই বাকি কাজ হয়ে যাবে। এইটে যেই না রঞ্জন দোকানের নতুন মালিককে বলেছে অমনি লোকটা একটা ব্রাউন পেপারে মোড়া এক ইঞ্চি মোটা একটা প্যাকেট রঞ্জনের সামনে রেখে বললেন “এইটা রাখুন স্যার। প্লিজ, না বলবেন না। আপনি যে আমার কত উপকার করলেন স্যার”। নিচু, গদগদ স্বরে এইতুকু বলেই লোকটি হাথ জোড় করে নমস্কার করে হাওয়া। ঘটনাটার জের কাটতে সময় লাগল রঞ্জনের। কিংকর্তব্যবিমুরহ হয়ে বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল প্যাকেটটার দিকে। সবুজ রবারব্যান্ড দিয়ে দুই প্যাঁচে আটকান। গোটাগোটা অক্ষরে লেখা “ফোর  মিস্টার এল কে আদক” – যদিও যিনি রেখে গিয়েছেন তার নাম আদক নয়। খামের নীচে বাঁ দিকে একটা ঠিকানা – পাইকপাড়ার। নির্ঘাত ওই লোকটার অন্য কোনও ব্যবসার। ঘণ্টা খানেক জবুথবু হয়ে বসে থাকার পর এক কাপ আদা চা খেয়েই রঞ্জন ঠিক করে নিল – যা থাকে বরাতে, নিয়ে নেবে সে টাকাটা। সরকারি মাইনে আর কততুকুই তার – আর জিনিষপত্রের দাম তো সরকারি-বেসরকারি দেখে বাড়ে না! না হয় কুন্তলার জন্যে একটা দামি শাড়িই কিনে নেবে টাকাটা দিয়ে – আগামী ছাব্বিশে বৈশাখ রঞ্জনের বিবাহ বার্ষিকী।

“চললেন নাকি রাঘব বড়াল? আজকে খানিক আগেই বেরচ্ছেন যে? কোনও স্পেশাল প্ল্যান আছে নাকি?” ইন্সপেকশনের রায়বর্মণ মাথা তুলে জিগ্যেস করলো। ঠোঁটের কোণে হাল্কা কেন? রায়বর্মণের টেবিল খুব দূরে নয় – তবে কি ও শুনতে পেয়েছে কথাগুলো?

“নাহ, শরীরটা খুব জুতের লাগছে না”।

“দেখো হে, সিজিন চেঞ্জের সময় – সাবধানে থেকো। পথে যেতে যদি কোনও খদ্দেরের দোকান পাও তবে ঢুকে এক ঢোঁক মেরে দিলেই দেখবে অনেক ভালো লাগছে। হে হে হে”।

রঞ্জন মদ খায় না। তবে এইটা ঠিক যে দুপুর থেকেই – মানে খাম পাওয়ার পর থেকেই মাথাটা ঢিপ ঢিপ করছে। শরীর খারাপটা স্রেফ অজুহাত নয়।

পাঁচতলার আফিস থেকে রঞ্জন সিঁড়ি ভেঙ্গেই নামে। দিব্বি লাগে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নামতে – মাঝের ফাঁকটা দিয়ে দেখা যায় কারা উঠছে নামছে। আজকেও রঞ্জন লিফট না ধরে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করলো। চারতলায় পৌঁছাতেই গলা বাড়িয়ে দেখতে পেল দু জন উর্দি ধারী পুলিশ সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে আসছে ওপরে। চরাং করে মাথায় শক খেলে গেল রঞ্জনের। রেইড! মুহূর্তের মধ্যে সব্বাইকে আফিসে আটকে রেখে পকেট, ব্যাগ, দেরাজ খানাতল্লাশি চালাবে এরা। আর রঞ্জনের হাথে ছোট্ট ফলিও ব্যাগে রয়েছে এল কে আদক মার্কা এক ইঞ্চি পুরু টাকার খাম। মানে ধরা পড়া ও শ্রীঘর। নিজের ছেলের কাছে মুখ দেখাবে কি করে রঞ্জন? চটজলদি ঘুরে গিয়ে রঞ্জন লিফটের বোতামটা টিপে দিল। পুলিশ আছে এক আর দোতলার মধ্যে – তার ভেতরে রঞ্জনকে সটকে পড়তে হবে অন্য পথে। ঘড়ঘড় শব্দে পেল্লায় গ্রিলের দরজা ওয়ালা লিফট হাজির হোল। দৌড়ে ঢুকে পরে হাঁপাতে লাগল রঞ্জন বড়াল। চৈত্রের গরম খুব তেমন না – তবুও বেশ বুঝতে পারল শিরদাঁড়া বেয়ে ঘামের ফোঁটা গেঞ্জি ছাপিয়ে শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে।

রাস্তায় বেড়িয়ে অনেক ভালো লাগতে শুরু হোল রঞ্জনের। বিকেলের হাওয়াটা মন আর শরীর, দুইই চাঙ্গা করে তুলল। রঞ্জন মেট্রো ধরবে – আপিস থেকে মহাত্মা গান্ধী রোড স্টেশন অবধি অন্য দিন অটো ধরে রঞ্জন – আজকে ভাবল হাঁটা যাক, মনটা স্থিতি হবে খানিক। কোনার পানের দোকান থেকে একটা গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে মানুষ আর ফুটপাথে বসা ব্যাপারির পসরা বাঁচিয়ে হাঁটা দিল রঞ্জন। কত টাকা হবে, খামটাতে? কত টাকার নোটে ঘুষ দেয় লোকে? হাজার না পাঁচশো? একশর তো আকজের দিনে কোনও দামই নেই। বেশ মজা পেল রঞ্জন মনে মনে হিসেবটা কষতে। ধরা যাক হাজারের নোট আছে। কটা হাজারের নোট রাখলে এক ইঞ্চি খানেক উঁচু হবে? একশ? মানে একশ ইনটু হাজার টাকা এখন রঞ্জনের ফলিও ব্যাগে ওই অঙ্কের টাকা? খুব ইচ্ছে করছে রাস্তায় কোথাও বসে টাকাটা গুনে নিতে। নিরাপদ হবে কি? কাউকে কখনও তো রঞ্জন দেখেনি রাস্তায় বসে টাকা গুনতে। কোনও রেস্টুরেন্টে বসা যায় বটে, কিন্তু রঞ্জনের একা একা রেস্টুরেন্টে যাবার অভ্যাস নেই। মনে মনে হিসেব কষাটাই বেশ – রঞ্জন আজকে পথ হাঁটার একটা অদৃশ্য সঙ্গী খুঁজে পেয়েছে!

ট্রেন আসতে মিনিট পাঁচেকের দেরি। রঞ্জন আজকে ফলিও ব্যাগটাকে ভালো করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে – অন্যান্য দিনের মত বগলের নীচে চেপে রাখেনি। আঁকড়ে রাখার কারণ আছে। মেট্রোতে ঢুকে রঞ্জন একটা বিশেষ থামের পাশে দাঁড়ায় – বরাবর। জায়গাটা ট্রেনএর মাঝামাঝি পড়ে, যেই কামরা গুলোতে বিশেষ ভিড় হয়েনা। আজকে সেই থামের নীচে দাঁড়ানোর একটু পরেই রঞ্জন খেয়াল করলো একজন লোক – মাঝারি হাইট, কদম ছাঁট চুল, একটু নোংরা গোল গলা টি শার্ট আর কালো প্যান্ট – তাকে আড়চোখে নিরীক্ষণ করে চলেছে। লোকটাকে যেন কোথায় দেখেছে রঞ্জন। বিদ্যুতের মত মনে পড়ে গেল – পানের দকানে সিগারেট কেনার সময়। লোকটা দাঁড়িয়ে হিন্দিতে পানওয়ালার সাথে কথা বলছিল। এই ধরনের লোকেরা রঞ্জন শুনেছে বিহার ইউ পি থেকে আসে আর ছিনতাইবাজ হয়। শিকারি বেড়ালের ঘ্রাণ শক্তি এদের – হয়েত বুঝতে পেরেছে রঞ্জনের কাছে মাল আছে।

ট্রেন এ উঠে বসতে পেয়ে গেল রঞ্জন। কদম ছাঁটও রঞ্জনের কামরায় উঠলো – দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে হ্যান্ডলে হাথ রেখে। চোখে চোখে রাখতে হবে একে, ভাবল রঞ্জন। “আগামী স্টেশন সেন্ট্রাল, প্ল্যাটফর্ম ডানদিকে … আগলা স্টেশন সেন্ট্রাল …” বেজে উঠলো প্রতিদিনের শোনা ঘষিকার কণ্ঠস্বরের চেনা শব্ধগুলো। রঞ্জন যাবে কবি সুভাষ – মানে গড়িয়া বাজার, কলকাতা শহরের দক্ষিণ শহরতলিতে – প্রায় প্রান্তিক স্টেশন। সেন্ট্রাল স্টেশনে রঞ্জনের কামরায় এক দঙ্গল কমবয়েশি ছেলে উঠলো। এদের কারুর মাথায় গান্ধী টুপি, তাতে কালো দিয়ে লেখা “ইন্ডিয়া আগাইনস্ত করাপশন”। রঞ্জন জানে এদের ব্যাপারে – সারা দেশ জুড়ে চলছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আর দেশের কমবয়েশি ছেলে মেয়েরা ভিড়ে পড়েছে সমাজের সুদ্ধিকরণে। এরা সভা করে, মিছিল করে, দুর্নীতিকে খোলসা করে লোকের সামনে ধরে সমাজের পরিবর্তন করতে চায়। সাধারন লোকও ভীষণ সমর্থন করে এদের। কয়েকটি ছেলে এসে দাঁড়ালো রঞ্জনের সামনে।

“কি বলছিলি বল। ইনকাম ট্যাক্সের আফিসের ব্যাপারে? ট্রেন আসায় শোনা হোল না”, একজন ছেলে অন্য একজনকে বলল

“ও, দারুন মজার ব্যাপার। ইনস্পেক্টরগুলো কি করে জানিস? দেরাজের অর্ধেক করাত দিয়ে কেটে ফেলে ফাঁকা জায়গার নীচে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট বসিয়ে রাখে। তুই ধর ঘুষ দিলি – লোকটা চট করে টাকাটা দেরাজে ঢুকিয়ে ঠেলে দেবে। টাকাটা আর দেরাজে থাকবে না, গিয়ে জমবে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটএ!”

“হা হা হা … দারুন কেস। এইটা জানতুম না। তারপর কি করলি?”

“আমার বাবার ফাইল ছিল। প্রতি সপ্তাহে ঘুরিয়ে চলেছে আমাকে। পরিষ্কার বুঝতে পারছি ঘুষ চাইছে – দিলেই ছেড়ে দেবে ফাইলটা। একদিন দুপুরে গেলাম, খামে টাকা ভরে। কথায় কথায় বাড়িয়ে দিলাম টেবিলে আর লোকটাও একদম ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে দেরাজে। তারপর এইটা ওইটা বকতে লাগল – এই নেই সেই নেই কিন্তু তবুও সে নিজের তাগিদে ফাইল পাস করিয়ে দেবে – এই সব। এর মধ্যে আমি হটাত বললুম ‘স্যার, মুখের চুইং গামটা দাঁতে আটকে যাছে। আমার রুট কানাল করা দাঁত – কষ্ট হচ্ছে। একটু ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট টা দেবেন, ফেলে দেবো?’ যেই বলা, লোকটার মুখ চোখ পুরো লাল। প্যানিক! ধারনা করতে পারবি না কি হাল হোল!”

“দিস পিপেল শুড বি টট আ লেসেন। পাবলিক ফ্লগিং হওয়া উচিত এই সব লোকদের”, অন্য ছেলেটা বেশ গম্ভীর হয়ে বলে উঠলো। “দিস ইজ নো লাফিং ম্যাটার”

নতুন ট্রেনের বাতানকুল কামরা হলেও রঞ্জন ফের পিঠে ঘামের আবির্ভাব বুঝতে পারল। এতদিন রঞ্জন বুঝতে পারত না কেন তার পায়ের কাছে রাখা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটটা মাঝে মাঝেই বেপাত্তা হয়ে যায়। আর নতুন এনে দিতে বললেই উমেশ মুচকি হাসি হাসে কেন। ইনকাম ট্যাক্সের রীতি যে আবগারি বিভাগেও চলবে এইটে আর তেমন কি ব্যাপার।

গাড়ি টালিগঞ্জ ছাড়িয়ে এখন পাতাল থেকে বেড়িয়েছে। অন্ধকার হয়ে গেছে, রাস্তার আলো, ট্রেন লাইনের পাশের বাড়িগুলোর আলো – সব জ্বলে উঠেছে। কোলের ওপর রাখা, হাথ দিয়ে চেপে ধরে থাকা ফলিও ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে হটাত রঞ্জনের খেয়াল হোল – আচ্ছা, পাইকপাড়ার মদের দোকানী এই টাকাগুলো পেলো কোথা থেকে? নিশ্চয়ই ক্রেতাদের টাকা। রঞ্জন মদ খায় না, কিন্তু মদে ভেসে যাওয়া অনেক সংসারের কথা জানে। যাদের এই টাকা তারা কি মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে বউদের মারে? কুন্তলার মুখাটা মনে পড়ে গেল রঞ্জনের। কি ধরনের দোকান এই পাইক পাড়ার লোকটার? ভদ্রলোক বেশি যায় না দিনমজুরি পাওয়া লোকেরা? বাড়িতে বউরা হয়েত অপেক্ষা করে থাকে টাকা আনলে বাজার হবে বলে আর এদিকে বাবু মদে চূড় হয়ে ঢোকেন বাড়ি। প্রশ্ন করলেই কিল চড় লাথি জোটে বউয়ের কপালে। মনটা বিষিয়ে উঠলো রঞ্জনের। পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল একশ ইনটু হাজারের হিসেবটা। অত ভেবে লাভ নেই। এই যে সীটে বসে আছে রঞ্জন সেই সীটে আগে যে বসেছে সে হয়েত খুনি বা গাড়ি চোর – তার খবর তো আর রঞ্জন রাখে না। তবে এই টাকা কার এই নিয়ে ভাবা কেন?

গড়িয়াতে নেমে অটোর লাইনে দাঁড়ালো না রঞ্জন। একটু পেছনে হেঁটে গেলে অনেক সময় খালি অটো তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়। বলতে বলতেই একটা অটো এসে পড়ল – ড্রাইভার মাথা বার করে নরেন্দ্রপুর নরেন্দ্রপুর বলে ডাকছে। পেছনের সীটে গা এলিয়ে একটাই লোক বসে। দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়ল রঞ্জন। অটোটা দাঁড়িয়ে পড়ল বাকি সওয়ারি তুলবে বলে। কিছুক্ষণ সময় লাগবে ভর্তি হতে – পরের ট্রেন এলে লোক হবে। হটাত রঞ্জনের পাশে বসা লোকটি চিৎকার করে অটোর ড্রাইভারকে গালমন্দ করতে শুরু করে দিল। ছাপার অযোগ্য কুৎসিত ভাষা – আর ভক ভক করে দেশী মদের গন্ধ! আদি গঙ্গার আবর্জনার পচা গন্ধ আর এই মদের দুর্গন্ধ দুই মিলে রঞ্জনের যেন অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার জোগাড়। এর মধ্যে ড্রাইভার তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে চলে এসেছে – একটা হাতাহাতির আরম্ভ হবার অপেক্ষা। কোনও লোক আর এই অটোর দিয়ে আসছে না। রঞ্জনের মাথা ঘুরতে শুরু করলো – এ কি হচ্ছে আজকে? সেই দুপুরবেলা এল কে আদক মার্কা খাম পাওয়া থেকে শুরু হয়েছে। আর পারছে না রঞ্জন – একটা ভারি পাথর যেন কেউ তার মাথায় বসিয়ে দিয়েছে। ঠিক করে ফেলল রঞ্জন – নেমে পরবে। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পা জড়িয়ে গেল ওর – হুমড়ি খেয়ে রাস্তায় পড়ে যাচ্ছিল আর একটু হলেই – একজনকে ধরে নিজের ভারসাম্য ধরে ফেলল রঞ্জন। আর নয় – শান্তি চায় এখন সে। আদি গঙ্গার খালের ওপর ব্রিজটার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ফছাত করে ফলিও ব্যাগটার জিপ খুলে খামটা বের করে ফেলল। একটু ঝুঁকে খালের জলে বিসর্জন দিল রঞ্জন তার বিকেলের একশ ইনটু হাজারের হিসেব – আর ভেবে রাখা ইতিউতি কিছু পরিকল্পনা। ঝুপ করে পড়ে গেল খামটা জলের মধ্যে। অন্ধকারে কয়েকটা বুড়বুড়ি দেখতে পেলো যেন রঞ্জন। খানিক জলতরঙ্গের পর খালের জল আবার শান্ত – যেমন ছিল তেমন।

“ইষ্টিকুটুম দেখছ না যে বড়?”, মহামায়াতলার দু কামরার ফ্ল্যাটে ঢুকে জুতো খুলতে খুলতে কুন্তলাকে জিগ্যেস করলো রঞ্জন। টি ভি তে একটা ইংরেজি চ্যানেলের খবর হচ্ছে।

“ঘুরোতে ঘুরোতে দেখলাম গো – কারা যেন গোপন ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে এক আমলাকে ঘুষ নিতে ধরেছে! সেই দেখাচ্ছে। কেতা কেতা নোট গো – আমার খুব লোভ হচ্ছিলো সে তুমি যাই বল না কেন। আমাদের যে কেন কেউ ঘুষ দেয় না!”

“হুহ, ঘুষ দেয়াও যেন অত সহজ আর নেয়াও যেন জলভাত। ছাড় ওই সব। চায়ের জল বসাও দেখি – আমি চট করে গা ধুয়ে আসছি। আজকে কি হোল তার গপ্প শোনাবো”।

বছর দশেক পর

স্টেশনটা ছোট্ট। কয়েকটা ট্রেনের ডিব্বা তো প্ল্যাটফর্ম উপচে যায়। লোকেরা হেঁচড়ে নামে – বাচ্চাদের কোলে করে নামায়। টিটি বাবু থাকেন না বললেই চলে। স্টেশন থেকে বেড়িয়েই রিকশা পাবেন। সাইকেল রিকশা। মোটরের ভটভটানি একদম নেই – তবে লোকের গলার আওয়াজ শুনতে পাবেন। রিকশাতে উঠে বসে কোথায় যাবেন বলতে না বলতেই শুনতে পাবেন আপনার ট্রেন ভোঁ মেরে ফের চলা শুরু করলো। আরও শান্ত হয়ে পড়ল চারপাশ।

নাকে রুমালটা লাগিয়ে রাখবেন। লাল মাটির দেশ তো – তার ওপর ভরা বসন্ত। খুব ধুলো উড়বে। তা বলে যেন মাঝে মাঝে ফুসফুস বোঝাই করে প্রান্তরের বাতাস নিতে ভুলবেন না! আপনি যেখান থেকে এয়েচেন সেখানে এই জিনিষ নেইকো! হাওয়াটা একটু ভেজা ভেজা মনে হচ্ছে না? হবেই তো – ওইতো আর একটু দূরে গেলেই নদী। রাস্তা একটু ঢালু হয়েছে কিনা? দেখছেন না, রিকশাওয়ালা এখন আর অতটা বেগ পাচ্ছে না গাড়িটা চালাতে। গুন গুন করে গান ভাঝছে ব্যাটা!

ব্যাস ব্যাস – এসে গিয়েছেন। পথের ধারে ওই যে দোকানটা – ওইটেই তো গন্তব্যস্থল! সবুজের  দিকচক্রভালের মধ্যে লাল হলুদের ছোপ আর মেটে ধুলোর মাঝে ধপধপে সাদা দোকানঘরটা। নামটাও বেশ – “পান্থজনের”। এখানে তো কারুর তেমন তাড়া থাকে না – তাই সবাই চায় দু দণ্ড জিরিয়ে নিতে। শরীর জিরনোর জন্যে চা, শরবত আর মন জুড়োনোর জন্যে বাউল গান – অঢেল ব্যবস্থা। সত্যিকারের বাউল গান! বাউলদেরই তো দোকান। অতিথি আপ্যায়ন থেকে পরিবেশন – সে পানীয়ই হোক বা খাবার বা গান – সব তারাই করেন। আমি তো নিমিত্ত মাত্র। বসুন না খানিক – বেঞ্চিটা গাছের নিচে নিয়ে বসুন। ওই দেখুন – মদন বাউলের আবার এখন গান পেয়েছে! সব ছেড়ে ছুড়ে বাবু বসে একতারা বাজিয়ে গান করছে – মুরশেদি বাউল গান! ভাল লাগছে না? ট্রেন যাত্রার আর রিকশা চড়ার ক্লান্তি কমে আসছে না? এই কিছুদিন হল স্যার শহুরে ইঁদুর দৌড় থেকে নিজেকে অব্যাহতি দিয়ে এইখানে আস্তানা গেড়েছি। গানে, গপ্পে, নদীর হাওায়, পলাশের রঙ্গে দিব্ব্যি কাটছে দিন গুলো…

“হওয়াই আর ইয়উ টেলিং মি অল দিস?”

মনটা পিছিয়ে গেল স্যার। দশটা বছর। সেদিনও ওই একি প্রশ্নের উত্তরে আমি এই কথাগুলো  কয়েছিলাম। দশটা বছর যে কোথা দিয়ে চলে গেল বুঝতেও পারলুম না

“সো লেট মি আস্ক এগেইন – হয়ের ডু ইয়উ সি ইয়উরসেলফ ইন দ্য নেক্সট টেন ইয়ার্স?”

“স্রেফ বেঁচে থাকতে চাই স্যার। ব্যাস, বেঁচে থাকতে চাই”।

———————————————

লেখকের কথা: সব লেখার মন থেকে কলম বেয়ে পাতায় নামার পেছনে কোনো একটা প্রভাব থাকে। এই লেখার জন্যে সেই প্রভাব বন্ধুবর তন্ময় মুখার্জির একটা ছোট্ট টুইট। কাজে ভরা দুপুরবেলায় নচিকেতার একটা গানের লাইন অকস্মাত মনে করিয়ে দিলো সে কালকে – “আমি কোনো বাউল হব এইটাই আমার এম্বিশন”

ধন্যবাদ তন্ময়!

বধ্য উম্মাদ

রিকশাটাকে সামনের রাস্তাটা দিয়ে যেতে দেখেছিল চন্দ্রশেখর। দেখেই কেমন জানি সন্দেহ হয়েছিলো সওয়ারিটির ব্যাপারে। সাইকেল রিকশাতে একলা বসে অমন হাথ ছুড়ে কথা কয় নাকি আবার কেউ? আর সাইকেল রিকশাওয়ালাটা আপন মনে পেডাল করেই চলেছে – যেন পেছনে যেটা হচ্ছে সেইটা শুনতেই পাচ্ছে না। সেই রিকশাটাই গেট পেড়িয়ে চলে যাবার পর আবার উল্টো দিক থেকে ফেরত এল। এসে দাঁড়ালো গেটের সামনে। দোতলার ঘরের জানলা দিয়ে সব দেখছে চন্দ্রশেখর। লোকটা কথা বলেই যাচ্ছে অনর্গল! হাথ তো নানা ভঙ্গিতে নাড়ছেই, মাঝে মাঝে ঘাড় বেঁকিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে হাসছে, কথা কইছে! চন্দ্রশেখর এই রকম ব্যবহার দেখে অভ্যস্ত কিন্তু খানিক কৌতূহলবশে দেখতে লাগল ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়।

সওয়ারি লোকটা জামা প্যান্ট কিন্তু ভালই পরে আছে। মাথার চুল যদিও খানিক উস্ক খুস্ক। মোটামুটি এই দুরত্ব থেকে চন্দ্রশেখর সওারির চোখে চশমা আছে দেখতে পাচ্ছে। লাফিয়ে রিকশা থেকে নামতে গিয়ে একটু হড়কে গেলেন সওারিবাবু। রিকশাওয়ালাটা হাথ বাড়িয়ে সামলে দিলেন ওনাকে। সওারিবাবু একটা হাথ রিকশাওালার দিকে বাড়িয়ে ধরেছিল – কথা বলার দমকে খানিকক্ষণ ওই ভাবেই রেখে দিল! মুখ নড়ে চলেছে অবিরাম। এখন আবার ঘুরে ঘুরে কথা বলছে – যেন রিকশাটা কোন জাগ্রত বিগ্রহ আর তাকে ঘিরে ভক্তের প্রদখখিন। একবার বোধহয় রিকশাওয়ালাটা ভাড়া ছেয়েছিল – তার দিকে বরাভয় দেবার মত করে হাথ ওঠালেন সওারিবাবু। আর কয়েক মিনিট ওই মুনি ঋষির মত ঠুটো হয়েই দাঁড়িয়ে রইলেন।

চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে চন্দ্রশেখর প্রথমে মিটি মিটি হাসছিলেন। একটু একটু করে হাসিতে শব্দ যোগ হল। শেষে চন্দ্রশেখর মাথা নাড়তে নাড়তে জানলার সামনে থেকে সড়ে গেলেন। হাসতে হাসতে বললেন “শালা বধ্য উন্মাদ…পাগল কি গাছে ফলে?”

ওদিকে সাইকেল রিকশার সওয়ারিবাবু লাল বাড়িটার গেটের দিকে এগিয়ে এসেছে। কান থেকে মোবাইল ফোনের তার খুলতে খুলতে দ্বারওয়ানকে জিগ্যেস করলো – “ভাই এই কে এইচ এফ এম ডি টা কোনদিকে বলতে পারেন ভাই?” দ্বারওয়ান বলল, “সে তো এই বাড়িটাই দাদা। করুণাময়ী হাউস অফ দ্য মেন্টালি ডিরেঞ্জেড। বাগান পেড়িয়ে চলে যান। বারান্দার পরেই রিসেপশন। বারান্দায় জুতো খুলে যাবেন কিন্তু”।

ঠাকুমা

“দারুণ হয়েছিল ছবিটা – সব্বাই কেমন সটান তাকিয়ে ক্যামেরার দিকে। হাসছে সব্বাই। কিন্তু এই দারুণ ছবিটাকে ঝোলানর জন্যেই কি অপেক্ষা করছিলে ঠাকুমা? নইলে অমন মোক্ষম সময়ই বেরতে হল ঘর থেকে?”

সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে অল্প একটু ফুলের কেয়ারি। কেয়ারির গা ঘেঁষে একটু দুরেই রান্নাঘর। রান্নাঘরের দুই পাশে স্নান ঘর আর কয়লা, কাঠ রাখার ঘর। কেয়ারির উল্টো দিকে, মানে সদর দিয়ে ঢুকে ডান দিকে চার ধাপ সিঁড়ি ভাঙলেই একটা লম্বা দাওয়া। আজকের দিন হলে লোকে দিব্বি এইটিকে প্যাঁটিও বলে চালিয়ে দিত। চলটা ওঠা সিমেন্টের মেঝে – ইতস্তত কয়েকটা চেয়ার ছড়ান। তাদের একটার সাথে অন্যটার কোন মিল নেই। আর রয়েছে একটা জুতোর তাক – শু র‍্যাক। দাওয়ার লাগা তিনটে দরজা – মানে তিনটে ঘর। একদম বাঁ পাশেরটা শোবার ঘর আর মাঝখানেরটা বৈঠক খানা। শুনতেই অমন জলসাঘর মার্কা লাগে, আদতে কিন্তু স্রেফ তিনটে কাঠের সোফা পাতার মত জায়েগা – আর একটা শো কেস। দাওয়ার একদম ডান দিকের ঘরটা ঠাকুমার। উঁকি দিলে প্রথমেই দেখা যায় ঠাকুরের আসন। তাতে অনেক দেবতা দেবীরা একে পরস্পরের গা ঘেঁষে বিদ্যমান। সরস্ঘবতী ছবিটা সব থেকে বড়।ঘররের এক কোণে একটা উঁচু খাট। ঠাকুমা ওতে ঘুমন।

ক্যামেরাটা মামার। রাশিয়ান। সদ্য কেনা, এবং এক রীল সাদা কালো ফিল্ম ভরা হয়েছে। আর একটা ছবি তুললেই ছত্তিরিশ – মানে রীল শেষ আর স্টেশন রোডে এস বি স্টুডিওতে ডেভেলপ করতে দিয়ে যাওয়া যাবে। আলাদা করে দুই ভাই, তাদের দুই মার, দুই বাবার – বিভিন্ন কম্বিনেশনে ছবি তোলা হয়ে গিয়েছে। বাকি একটা গ্রুপ ফোটো। মামা নেমে গিয়েছেন দাওয়ার নীচে, আর চেয়ার মেঝে মিলিয়ে তৈরি বাকি পরিবার। সটান ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সবাই। ডানদিককে একটু ভেতরে এনে, সবাইকে তাদের সেরা হাসি বের করার কড়া হুকুম দিয়ে খছাত করে শাটার পড়ার সাথে সাথে সেই ঘটনাটা ঘটল যেইটার সবার ভয় ছিল। নিজের ঘর থেকে ঠাকুমা বেড়িয়ে এলেন। আশির কাছে বয়েস। সেমিজ আর সাদা থান পড়নে – চৌকাঠ ডিঙ্গনোর জন্যে কাপড়টা হাঁটুর কাছে তোলা। বেড়িয়েই ছবি তোলার দৃশ্য দেখে একটু অবাক ভাবে ক্যামেরার দিকে তাকানো। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। একটা হাথ হাঁটুর ওপর। বেঁকে যাওয়া শিরদাঁড়া খানিক সোজা কৌতূহল ভরে। একটা সম্মিলিত আওয়াজে ঠাকুমা বুঝলেন যে তিনি বেশ গর্হিত কোন কাজ করে ফেলেছেন।

একগাদা চার ইঞ্চি বাই ছয় ইঞ্চি প্রিন্ট করা ফটোগ্রাফের মধ্যে এই ছবিটা হাথে নিয়ে অমিত বলে উঠল “দারুণ হয়েছিল ছবিটা – সব্বাই কেমন সটান তাকিয়ে ক্যামেরার দিকে। হাসছে সব্বাই। কিন্তু এই দারুণ ছবিটাকে ঝোলানর জন্যেই কি অপেক্ষা করছিলে ঠাকুমা? নইলে অমন মোক্ষম সময়ই বেরতে হল ঘর থেকে?”

“বুঝি নাই ভাই। বুঝলে যাইতাম না”, ছোট্ট জবাব দিয়েছিলেন ঠাকুমা

—————————————————————————————————-

“আর কোন ছবি নেই? এই ছবিটা থেকে এনলারজ করে মুখ বের করতে গেলে দাদা প্রচুর পিক্সেল এসে যাবে। অন্য কোন ছবি আছে কিনা দেখুন না?” স্টুডিয়োর মালিক ফটোটা মন দিয়ে দেখে বললেন অমিত সেনকে। “বলছেন বিখ্যাত মানুষ অথচ এই একটাই ছবি?”

“বিখ্যাত তো বটেই। টাউনে বিদ্যুৎ আসেনি তখনও। হ্যারিকেন নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের পড়াতেন। সেই পয়সায় সংসার চালাতেন আর কিছু জমাতেন মেয়েদের জন্যে স্কুল খুলবেন বলে। আমার ঠাকুমা। ওনার জীবনের ওপর একটা প্রবন্ধ লিখছি। কিন্তু এই গ্রুপ ছবিটা ছাড়া তো আর কোন ছবি নেই”।

 

চশমান্বেষী

choshmaপুজোর উপন্যাস লেখা সমাপ্ত হইয়াছে – গত সপ্তাহে প্রকাশকের জিম্মায় ছাড়িয়া হাঁফ দিয়া বাচিয়াছি। আজকাল অকালবোধনের কতটা প্রাক্কালে কে পূজাবার্ষিকী প্রকাশ করিবে তার জমজমাট রেষারেষি শুরু হইয়াছে। বাঙালি পূজা মন্ডপে পূজার নুতন লেখার পর্যালোচনা করিতে পারিবার অঢেল সময় পায়। ব্যোমকেশের হাতে কোন বড় কাজ নাই। সরকার বাহাদুরের পুলিশ অত্যন্ত পারদর্শিতার সহিত দুশমন দমন করিতেছে – ব্যোমকেশ কে বিরক্ত করার কারণ তাহাদের ঘটে নাই। ব্যোমকেশকে কয়েক মাস পূর্বে ইষৎ তিক্ততার সহিত সাধারণ নাগরিকের পুলিশ ভক্তির কটাক্ষ করিতে শুনিয়াছি। তবে গত হপ্তায় বার দুয়েক ব্যোমকেশের ফোন আসে এবং ও দিনের বেলায় বেশ কিছুক্ষণ বাড়ির বাহিরে কাটায়। আমার অসমাপ্ত উপন্যাসের নায়ককে সংসারের জটিল ও কুটিল পথ হইতে সিধে রাস্তায় অবতরন করাইতে ব্যাস্ত থাকায় আমার ব্যোমকেশের সঙ্গ দেয়া হয়ে ওঠে নাই। এদিকে কলকাতা শহরে গত তিন দিন ধরিয়া অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হইয়াছে – পথ ঘাট কর্দমাক্ত। তাই বিশেষ দরকার ছাড়া গৃহের বাহিরে যাইবার তাগিদও অনুভব করি নাই। সত্যবতীও খিচুরী, ডিম ভাজা, বেগুনি ইত্যাদি লোভনীয় খাদ্য সামগ্রী পর্যাপ্ত পরিমানে রান্ধিয়া আমাদের গৃহে থাকিবার কারণের পাল্লা ভারী করিয়া তুলিয়াছে। তদসত্তেও ব্যোমকেশ বার দুয়েক ছাতা বগলে করিয়া বাহিরে গিয়াছে। প্রথম দিন সত্যবতী জানিতে চাহিয়াছিল কি এমন কর্ম ব্যোমকেশের যাহা না সম্পন্ন করিলে মহাভারত অশুদ্ধ হইবে তবে সঠিক কোন জবাব না পাইয়া হাল ছাড়িয়া দেয়। দ্বিতীয় দিন ব্যোমকেশ বাহির হইবার উপক্রম করিতেই শুনিলাম রান্নাঘর থেকে সত্যবতী গুন গুন করে গান ধরিল – গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে, মধুর মধুর বংশী বাজে। বুঝিলাম সংসারে নামক রণভূমিতে যুদ্ধ জিতিবার জন্যে সরাসরি আক্রমণই এক মাত্র অস্ত্র নহে।

যুগপৎ স্বামীর অভাব ও তার প্রতি বিরুপতার কারণে সত্যবতী উপুরজুপরি চায়ের সরবরাহ ও চিঁড়ে ভাজা, পোস্তর বড়া ইত্যাদির মাত্রা বাড়াইয়া তুলিল। দুপুর গড়িয়ে যেতেও যখন ব্যোমকেশের পাত্তা পাইলাম না, তখন আমরা দুইজন মধ্যাহ্ন ভোজন সারিয়া পান মুখে দিয়া গল্প করিতে বসিলাম। কয়েক বৎসর যাবত ব্যোমকেশের গল্প লইয়া ছবি বানাইবার হিড়িক পরিয়াছে। আমরা এই সব ছবির চিত্ররূপ লইয়া চায়ের পেয়ালায় পর্যাপ্ত তুফান তুলিয়াছি। ছবিতে ব্যোমকেশের শানানো, ছিপ ছিপে চেহারার পাশে আমার ঈষৎ স্থুল ও জড়ভরত চরিত্রায়নের পরিহাস করিতে ব্যোমকেশ ছাড়ে নাই। শেষে একটা ছবিতে সত্যবতীর আবির্ভাবে গৃহে শান্তি পরিস্থাপিত হয় – বিবাহিত নায়কের স্ত্রীচরিত্র বর্জিত চিত্ররূপ নাটকীয়, সংসারীয় ও নানা বিস্তর কারণে একেবারেই কাম্য নহে। যাই হোক, ব্যোমকেশের আর একটি কীর্তি অবলম্বনে একটি নূতন ছবি মুক্তি পাইবার দোরগোড়ায়। পাড়ায় পাড়ায় দেয়ালে হ্যান্ডবিল সাঁটানো হইয়াছে – দৈনিক কালকেতুর পাতায়ও ছবির কিছু স্থিরচিত্র ছাপানো হইয়াছে। সেই সূত্র ধরিয়াই আমি ও সত্যবতী আলোচনা করিতেছিলাম যে  ব্যোমকেশের কোন কীর্তি লইয়া এক নাটকীয় ছবি করা যাইতে পারে, এবং তাহার নায়ক নায়িকা চরিত্রে কাহাদের অভিনয় করা সমীচীন হইবে  বাহিরে বৃষ্টি থামিলেও বিদ্যুৎ ও বাজ পরিবার বহর দেখিয়া অনুমান করা যায় দুর্যোগ এখনো সরিয়া যায় নাই। ঠিক এমন সময় হুড়মুড় করিয়া দরজা ভাঙ্গিয়া ফেলার উপক্রম করিয়া ব্যোমকেশের প্রবেশ! চটি কর্দমাক্ত, কাপড়ে কাদার ছিটে – কিন্তু মুখে একগাল হাসি। “ওহে কপোত কপোতী, তোমাদের প্রেমালাপে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্যে ক্ষমা চাইছি!”, বলিয়া মিটি মিটি হাসিয়া দাঁড়াইল – তার ভাবসাব একদমই ক্ষমাপ্রার্থীর নহে। “জামা জুতো ছেড়ে আসছি অজিত, তারপর দারুন গপ্পো শোনাব। ওগো প্রিয়ে, এক কাপ চা হবে কি খানিক আদার কুচি দিয়ে?”, ব্যোমকেশকে মুখে মুখে ছড়া কাটতে বহুদিন শুনি নাই। সত্যবতী মুখ টিপিয়া উঠিয়া রান্নাঘরের দিকে গেল। খানিক পর শুনিলাম গান ভাসিয়া আসিতেছে – বধু এমন বদলে তুমি কোথা । বিরহী যক্ষ কখনো মেঘ, কখনো সঙ্গীতকে প্রেমের হাতিয়ার করে।

আরামকেদায় বসিয়া, আমার টিন হইতে সিগারেট ধরাইয়া একরাশ ধোঁয়া ছাড়িয়া ব্যোমকেশ শুরু করিল। “অপরাধের মহামারি, মক্কেলের মহামারি এই সবের মধ্যে যখন একটা সামান্য কেস আসে, সেইটাই খড় কুটোর মতো আঁকড়ে ধরতে হয়, বুঝলে অজিত। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে দুর্জয় ঘোষের বাড়িতে যখন চুরি হল, উনি আমাকে ডাকলেন স্রেফ এই কারণে যে পুলিশ তার অতি পুরনো ও বিশ্বস্ত চাকর নলেনকে ধরে নিয়ে গিয়ে হাজতে ভরে রেখেছে”।

“কি চুরি গেল?”

“বাড়ির দলিল। দুর্জয় ঘোষের শ্যামবাজারে একটা বাজারের আংশিক মালিকানা আছে। বিস্তর আয় হয় সেখান থেকে। সেই মালিকানার দলিল। থাকতো যে সিন্দুকে সেইটা থেকে নলেন নাকি পূর্বে কয়েকবার তার বাবুর জন্যে কাগজ বের করে দিয়েছে – তাই তার পক্ষে সিন্দুকের বাকি জিনিষের হদিশ জানা সহজ ছিল। বরাট দারোগার তাই মত”।

“দুর্জয় ঘোষ তো বিষয় সম্পত্তির রাঘব বোয়াল – তার সিন্দুক থেকে দলিল চুরি করলে আংশিক মালিকানার কেন? অংশীদারদের সঙ্গে মেলা হ্যাপা করতে হবে না?”

চা আসিয়াছিল ও তাহাতে আদার সুগন্ধ পাইয়া বুঝিয়াছিলাম বাহিরে মেঘ ঘনীভূত হইলেও ঘরের আকাশে রোদের ঝিলিক খেলিয়াছে। চায়ের পেয়ালা টানিয়া লইয়া তাহাতে লম্বা চুমুক দিয়া ব্যোমকেশ কহিল “শুধু কি তাই নাকি? ওই দলিল নিয়ে নলেন করবেটা কি? বরাটের ধারণা ও বাকি অংশীদারদের ওই দলিল মোটা টাকায় বিক্রি করার ধান্দা ফাঁদছিল। কিন্তু সেই যুক্তিতেও বিস্তর গলদ। যতই শহুরে হোক না কেন, আদতে গ্রাম্য নলেনের পক্ষে চুরির পর এই জটিল কাণ্ড ঘটানো প্রায় অবাস্তব”।

“নলেনের ওপর সন্দেহ পড়ল কি করে গা?”, সত্যবতী স্টোভ নিভাইয়া দিয়া বৈঠকখানায় ফের আসিয়া বসিয়াছিল।

“চশমা”

“চশমা?”, আমি ও সত্যবতী যুগপৎ প্রশ্ন করিলাম

“হ্যাঁ, চশমা। অকৃতদার দুর্জয় বাবু বাড়িতে একলাই থাকেন। চুরির সেই রাত্তিরে উনি বাজ পড়ার আওয়াজে জেগে যান ও রাস্তার ল্যাম্প পোস্টের আলোয় চোরের চেহারা খানিক দেখতে পান। সবটা ভালো না দেখলেও এইটে পরিষ্কার দেখেন যে চোরের চোখে চশমা আছে। একে তো বাড়িতে আর কেউ নেই আর নলেন চশমা পরে। ব্যাস, মারে হরি রাখে কে – সোজা বরাটের শ্রীগৃহে “।

“আহারে, বেচারা হয়েত সত্যি চুরি করেনি। তা তুমি এই সবের মধ্যে কি করলে গা?”

ব্যোমকেশ ত্রিপয়ের উপর পা তুলিয়া দিয়া কহিল “আমি সত্যান্বেষী – সত্য খুঁজে বের করা আমার কাজ। তাই করলুম”।

“সেই সত্য কি কর্নওয়ালিস স্ট্রিটেই ঘোরা ফেরা করছিল নাকি?”, প্রশ্ন করিলাম

“কর্নওয়ালিস নয় অজিত, সে অনেক দূর। সত্যের নিবাস লোয়ার সার্কুলার রোডে!”

“হেঁয়ালি না করে বলবে একটু খুলে”

“দুর্জয় ঘোষের পুরনো বন্ধু নীলাঞ্জন দত্ত – থাকেন লোয়ার সার্কুলার রোডে। পেশায় চিত্রপরিচালক – বেশ কিছু জনপ্রিয় ছবি তৈরি করেছেন যার কিছু তোমরা পয়সা খরচা করে হলে দেখতেও গিয়েছ। ইদানিং তার দুর্দিন শুরু হয়েছে – গোয়েন্দা গল্পের ছবি করবেন কিন্তু প্রযোজক হাথ উল্টো করতে নারাজ। নীলাঞ্জন দুর্জয়কেও অনুরোধ করেছিল ছবি তৈরির পয়সা দিতে, কিন্তু দুর্জয় রাজি হয় নি। মন্দার সময় চলছে তার ব্যবসায় – এই কারণে। পরে নীলাঞ্জন জানতে পারে যে এই দুর্জয় কিছুদিন আগে গোপনে এক পরিচালককে আর্থিক সাহায্য করে সেই একই গোয়েন্দা ছবি তৈরি করতে। ক্রোধে এই নীলাঞ্জনই সেই রাত্তিরে দুর্জয়ের সিন্দুক থেকে দলিল চুরি করে”।

“বাবা, তা তুমি ধরলে কি করে?”

“চোরের মন বোঁচকার দিকে, অজিত। আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল চশমাটা রেড হেরিং – ওইটা যুক্তিকে বিপথে চালাবার জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে। সেইদিন বিকেলে দেখি নীলাঞ্জন দত্ত হাজির দুর্জয়ের বাড়িতে। যিনি চশমা পরেন না অথচ চশমাকে কুকীর্তির জন্যে ব্যবহার করবেন সে কিন্তু কিছুদিন চশমা চোখে ঝালিয়ে নেবে নিজেকে সড়গড় করতে। অনভ্যাসের চশমা – তায় পুরু কাঁচ। নীলাঞ্জন দত্ত কে লক্ষ্য করে দেখলাম উনি মাঝে মাঝেই চোখ ছোট বড় করছেন – যেন চোখে কোন সমস্যা আছে। জিগ্যেস করাতে এড়িয়ে গেলেন। তারপর কাছ থেকে দেখি নাকের দুই পাশে, চোখের নিচে অল্প ছড়ে যাবার দাগ। পরিষ্কার বুঝলাম যে ইনি কোন কারণে ইদানিং হটাতই চশমা ব্যবহার শুরু করেন ও অনভ্যাসের দরুন ভারি চশমায় চামড়ায় কাটাকুটি”।

“বাঃ, এই তো সব মিলে যাছে। নীলাঞ্জন চশমার জন্যে চুরির সময় ঠিক দলিল না নিয়ে একটা আংশিক মালিকানার দলিল চুরি করলেন আর ফাঁসাবার জন্যে বেছে নিলেন বেচারা নলেনকে”

ব্যোমকেশের সিগারেট পুড়িয়া ইঞ্ছিখানিক মাপের ছাইয়ের ডাণ্ডায় পর্যবসিত হইয়াছিল। সামনে ঝুঁকিয়া আমার টিন হইতে আরেকটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিয়া ব্যোমকেশ কহিল, “সাবাস, অজিত। তুমি ছেঁদো প্রেমের উপন্যাস ছেড়ে গোয়েন্দা গল্প লেখ দেখি – পাঠকরা অনেক বেশি খাবে! যাইহোক, আজকে নীলাঞ্জন যখন আমার আর দুর্জয়ের সঙ্গে দুর্জয়ের বাড়িতে তখন বরাট নিলাঞ্জনের লোয়ার সার্কুলার রোডের বাড়ি তল্লাশ করে সেই দলিল ও চশমা উধহার করেছে। নীলাঞ্জন এখন বরাটের জিম্মায় – ব্যাটা সব কবুল করেছে”।

“বাবা, চশমার চমৎকার – কি বল?”

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিয়া পকেট হইতে একটা মোটা ফ্রেমের চশমা বাহির করিয়া ত্রিপয়ের উপর রাখিল।

“এইটে কি? পারিশ্রমিক?”, এক প্রিয় ছবির শেষ দৃশ্যে শোনা এক সংলাপ কে ব্যোমকেশের দিকে ছুঁড়িয়া দিয়া প্রশ্ন করিলাম। সত্যবতী খানেক হতভম্ব খাইয়া বসিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ টেবিলের ওপর পড়ে থাকা  দৈনিক কালকেতুটি টানিয়া লইয়া সেই পাতাটি মেলিয়া ধরিল যাহাতে তাহার কীর্তির মুক্তি-আসন্ন ছবির নায়ক নায়িকাদের কিছু স্থিরচিত্র ছাপা হইয়াছে। মূল ছবিটিতে নায়কের খানিক উদাস চাহুনি – ডিটেকটিভ হিসাবে অনুপযুক্ত হইলেও দৃষ্টির প্রখরতা মনের ভাবকে খানিক বুদ্ধিদীপ্ত করিতে সক্ষম হইয়াছে। নায়কের প্রাজ্ঞ ভাব ফুটাইয়া তুলিতে পরিচালক তাহার নাকের ওপর একটি মোটা ফ্রেমের চশমা আঁটিয়া দিয়াছেন। ব্যোমকেশ মুখায়বে খানিক তিক্ততা, খানিক ব্যাঙ্গ মিশাইয়া চশমার ডাঁটি দিয়া সেই ছবিটির দিকে ধরিয়া কহিল, “আমাকে কখনো চশমা পড়তে দেখেছ?”

মানিতে বাধ্য হইলাম যে নেহাত ছদ্মবেশ ধারণ করা ব্যাতিত ব্যোমকেশকে কখনো চশমা ব্যবহার করিতে দেখি নাই। তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষুরধার – বরং রাত জাগিয়া লেখালেখি করিতে করিতে আমার মাঝে মাঝে চোখ ব্যথা করিয়া থাকে।

“তাহলে?”, এইবার ব্যোমকেশকে বেশ উত্তেজিত দেখিলাম। সদ্য জ্বালানো সিগারেট টি চায়ের কাপে ডুবাইয়া সে কহিতে লাগিল। সত্যবতী দেখিলাম আঁচলের আড়ালে মুখ লুকাইয়া হাসির দমক চাপার চেষ্টা চালাইতেছে।

“কেন বল দেখি, চশমার সঙ্গে বুদ্ধির এই বেয়াড়া যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা? এই চশমাটাই এই ছবির নষ্টের মূল। দুর্জয় ঘোষের পয়শায় তৈরি এই ছবি আর এই সেই উদ্ভট চশমা। বাংলা চিত্র পরিচালকরা যে হারে আমাকে চশমা পরাতে শুরু করেছেন অজিত, তাতে আমাকে – বা আমার গল্পের ছবির নাম – সত্যান্বেষী না রেখে চশমান্বেষী রাখতে পারত”।

সত্যবতী আর পারিল না, উছস্বারে হাসিয়া উঠিল। আমি স্থাণুবৎ বসিয়া রহিলাম। দেখিলাম ব্যোমকেশ তাহার আক্রোশ ফলাইয়া চশমাটির ডাঁটি ভাঙ্গিয়া বস্তুটিকে অকেজো করিয়া তুলিল। “বাঁশ না থাকলে দেখি কানুর বাঁশি বাজে কি করে”।

“পারিশ্রমিকের এমন অপচয় করতে আছে? বাঁটুল সর্দারকে দিয়ে দিলে চোর বাজারে বিক্রি করে নাহক কিছু টাকা তো উদ্ধার করা যেত?”, আমার বৈষয়িক মন আমাকে তাহার চেনা পথে টানিয়া লইয়া গেল।

“পারিশ্রমিক ওইটে নয় – এইটে”, বলিয়া ব্যোমকেশ জামার পকেট হইতে দুইটি মোটা ছাপা কাগজের ফালি বাহির করিল। কোন খানদানি অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পত্র বোধকরি।

“এইগুলি কি গা”, সত্যবতী প্রশ্ন করিল

“দুর্জয় ঘোষের ছবি দেখার অগ্রিম নিমন্ত্রণ। আগামি শুক্রবার রিলিজ করছে ছবিটা আর বিস্যুদবার বিকেলে কিছু গন্যমান্য লোকদের চিত্রবাণী হলে অগ্রিম দেখানো হবে ছবিটা। চোর ধরে দেবার এই পারিশ্রমিক দিলেন দুর্জয় ঘোষ”।

“কিন্তু দুটো কেন – ঠাকুরপো যাবে না আমাদের সাথে?”

আরামকেদারায় মাথা পেছন হেলাইয়া, কণ্ঠে ভারি বর্ষার একরাশ ক্লেদ লইয়া ব্যোমকেশ কহিল “ঠাকুরপোই যাবে। আমি না। আমি সেইদিন আমার গল্পের ছবি দেখতে যাব যেদিন আমার সত্যি সত্যি চশমার প্রয়োজন হবে!”

বুঝিলাম সত্যান্বেষীর অন্ন্যেষণ এর ধ্রুবতারা হইল সত্য, সেই সত্যের কোন নাটকীয় রুপ সত্যান্বেষীর মোহ আকৃষ্ট করে না।

জোচ্চোর

“যদি নামে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ”| কথাটা মনে হতেই অরিন্দমের হাসি পেয়ে গেল | কোথায় রাজা? সে সব তো গত বছর চুকে বুকে গিয়েছে – এখন তো রানীর সাম্রাজ্য | ঠিক আছে – মাঘের শেষের এই বৃষ্টি যদি রানীর রাজ্যেও কিছু কেরামতি দেখায় তাহলে ক্ষতি কি? শীতকালের সন্ধে – পাঁচটা বাজতে না বাজতেই অন্ধকার আর তার ওপর আজকে দুপুর থেকেই শাওন গগনের ঘোর ঘনঘটা | অরিন্দম বারাসাত কলেজ থেকে ক্লাস শেষ করে বেরোতে গিয়েই আন্দাজ করেছিল আজ কপালে ভোগান্তি আছে – শীতকালে তো আর কেউ ছাতা নিয়ে বেরোয় না, অরিন্দম ও সঙ্গে ছাতা আনেনি | কলেজ থেকে বেরিয়ে অল্প বাঁ দিকে গেলে চাঁপাডালির মোড় আর ডান দিকে বেশ কিছুটা গেলে ডাক বাংলো | কলেজের ঠিক বাইরে এসে অরিন্দমকে একটা সিন্ধান্ত নিতে হলো | চাঁপাডালিতে বাসে ভিড়টা হয় বেশি – গত হপ্তায় গোড়ালি মচকানোটা এখনো ভালো সাড়েনি – ওই ভিড় ঠেলে বাসে ওঠা মুশকিল হবে | হয়েত হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে হবে আর বৃষ্টি এলে কোনো প্রটেকশন ছাড়াই কাক ভেজা | অন্যথা একটু পা চালিয়ে ডাক বাংলো পৌঁছে যাওয়া যায় | ডাকবাংলো চাঁপাডালির আগের স্টপ – বাসটা খালি আসে – অন্তত ভেতরে ঢোকা যাবে | সমস্যা হবে যদি এই এক স্টপের রাস্তার মধ্যে বৃষ্টিটা নেমে পড়ে – এ দিকটা তেমন ডেভেলপ করেনি এখনো যে কোনো দোকানের পাকা ছাউনি বা ফুটপাথে মাথা বাঁচানো যাবে | যা থাকে বরাতে – এই ভেবে অরিন্দম সোজা ডাক বাংলোর দিকে হাঁটা দিল | পায়ের অসুবিধে খেয়াল রেখে, সাবধানে হেঁটে জখম গোড়ালী নিয়ে অরিন্দম ঠিক দুটো স্টপের মাঝামাঝি পৌঁছেছে আর আচমকা আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি | সঙ্গে বাজ পড়া | জায়েগাটা নিরিবিলি না হলেও খুব লোকজন নেই সেই সময় | অরিন্দম একটু চাপা অসহায় বোধ করতে লাগলো | কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা মাথার ওপর রেখে বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে যাওয়া রাস্তার সামনে চেয়ে একটু দূরে একটা চায়ের দোকানের ছাউনি দেখা গেল | নিজের অদৃষ্টকে অস্ফুটে একটা তেতো কথা শুনিয়ে অরিন্দম তে-ঠেঙ্গা দৌড়ের মত ছুট দিল সেই ছাউনি লক্ষ করে |

অরিন্দম হুগলি মহসীন কলেজের অধ্যাপক – ইতিহাস এর | ইতিহাসেরই  ছাত্র ছিল অরিন্দম | অরিন্দম এর স্থির ধারণা ইতিহাস বিষয়টা ছাত্রদের পড়ানো হয় যাতে তারা বড় হয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হতে পারে – কারণ এখনো অবধি সে ইতিহাসের যোগ্য কোনো চাকরির সন্ধান পায়নি | সে মামুলি ছাত্র ছিল তাই বি এ পাশ করার পর যে কটি পরীক্ষা দিয়েছিল কোনটাতেই উতরোয় নি – অগত্যা মাস্টার্স , ইউনিয়ন এর দাদাদের হাতেপায়ে ধরে, মৃত পিতৃদেবের কিছু পয়সা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাদাদের  ঘুষ দিয়ে এই জুনিয়র প্রফেসর এর চাকরি | কলেজের ইউনিয়ন এ চেনাশোনা আছে বলে মাঝেমাঝেই অন্য কলেজের স্পেশাল ক্লাস, বা কোনো প্রফেসরএর অবর্তমানে ক্লাস নেয়া – এই সব সুযোগগুলি জুটে যায় | তাতে দৌড়ঝাপটা একটু পড়ে বটে, কিন্তু টাকাটা পাওয়া যায় | আর সেই সূত্রে কিছু কোচিং ক্লাসের সঙ্গে চেনা জানা হয়ে গেলে তো কথাই নেই – কাঁচা টাকা আসে কিছু পকেটে | বারাসাত সেদিক থেকে বেশ স্বর্ণখনি – বারাসাত গভার্নমেন্ট কলেজ আছে, আর তার কয়েক স্টপ আগে ওই কলেজের এক প্রাক্তন অধ্যাপক – নন্দকিশোর সামন্ত – একটা কোচিং সেন্টার খুলেছেন | সেইখানেই আজ সকালে অরিন্দম টানা চার ঘন্টা আই এ এস পরীক্ষার্থীদের পড়িয়ে, বারাসাত কলেজএ দুটো ক্লাস নিয়ছে | মাসের শেষ সপ্তাহ – তাই কোচিং সেন্টার এর হিসেব মিলিয়ে বেশ কিছু টাকা অরিন্দমের মানি ব্যাগে | কলেজের মাইনে চেকে দেবে – একাউন্টস ডিপার্টমেন্টএর সরকারবাবুকে তোয়াজ না করলে নিজে থেকে পাওয়া যাবে – সে আশা বৃথা |  সারাদিন বক বক করে গলাটা বেশ ধরে আসছিল অরিন্দমের আর সেই সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজতে হলো এই চায়ের দোকানের ছাউনিটাতে আসতে গিয়ে | ভালোই  হলো, এই সময়ে চা টা মন্দ লাগবে না | ছাউনির সামনে একটা জটলা মতন – কেউ সাইকেল রেখে দাড়িয়ে আছে আবার কেউ পথচারী | অরিন্দম ছাউনির সামনের ভিড়টা পেড়িয়ে ভেতরে এসে অল্প বয়েসী মালিক ছেলেটিকে বলল – “বেশ ভালো করে আদা দিয়ে বানাও তো একটা স্পেশাল চা – আর চিনি দিও না” | চা বা কফি – কোনটাতেই চিনি নেয়না অরিন্দম – বরাবর – ফ্লেভার নষ্ট হয়ে  যায় | দু তিনটে স্টোভ জ্বলছে – তাতে দুধ, চা জ্বাল দেয়া হচ্ছে – এলাচের গন্ধে বেশ লাগছে বাতাসটা| পকেট থেকে রুমাল বের করে অরিন্দম মাথাটা বেশ ভালো করে মুছে নিল – চুলটা বড় হয়েছে – এই রবিবার কাটাতেই হবে| ভালো করে মাথা মুছে অরিন্দম দেয়ালে লাগানো মা কালীর ছবির কাঁচে মাথার চুলটা আঙ্গুল দিয়ে ঠিক করে নিছে এমন সময়ে মনে হলো যেন ওর পেছনে এক জন ভদ্রলোক বেশ মন দিয়ে আরিন্দমকে জরীপ করছেন | দ্রুত ঘুরতেই ভদ্রলোক তড়িঘড়ি চোখ সড়িয়ে নিলেন আর চট করে ফের দোকানের দিকে পিঠ করে দাড়ালেন | মাঝবয়েসী, কাঁচা পাকা চুল পাতলা হয়ে গিয়ে মাথার ঠিক মাঝখানে একটু টাক, গায়ের রং এক কালে বেশ ফর্সা ছিল এখন রোদ্দুরে পুড়ে তাম্রবর্ণ, পাঁচ নয় এর মত উচ্চতা, পরনে কালো প্যান্ট, নীল হাফ শার্ট আর একটা বেশ পুরনো ধুসর রঙের জ্যাকেট |

দোকানের ছেলেটা “বাবু, চা” বলে গেলাসটা এগিয়ে দেয়া আর হঠাত হওয়ার দিকবদলের জন্যে তেড়ে বৃষ্টির ছাট সোজা দোকানের দিকে – দুটো ঘটনা একসঙ্গেই ঘটল | সঠিক বলতে তিনটে ঘটনা ঘটল | ধুসর জ্যাকেট বৃষ্টির তোরে দোকানের ভেতরে চার পাঁচ ফুট পিছিয়ে এলেন সামনের লোকের ধাক্কা খেয়ে | পেছোতে গিয়ে ওনার প্রায় অরিন্দমের সঙ্গে কলিশনের যোগাড়  এবং অরিন্দমের সেইটা আন্দাজ করে হাতের গেলাসটাকে চটজলদি সড়িয়ে নিল ধূসর জ্যাকেটের রাস্তা থেকে| নিজেকে টালমাটাল অবস্থা থেকে সামলে নিতে নিতে ধুসর জ্যাকেট অরিন্দমের কনুইটা ধরে একটু স্থিতি হলেন | “থ্যান্ক ইউ, স্যার | লাগেনি তো?”, হাথ টা অরিন্দমের কনুই থেকে কব্জির দিয়ে নামিয়ে এনে খুব অপ্রস্তুত ভাবে ধুসর জ্যাকেট কথাটা বললেন | চোখ কিন্তু সোজা অরিন্দমের চোখে | অরিন্দম হালকা হেসে, ঘাড় নেড়ে না বলল আর তার সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন – “বিধান নগর কলেজ না? ইকোনমিক্স ?” কব্জিতে তখনও ভদ্রলোকের হাথ – “না, আপনার ভুল হয়েছে | আমি হুগলী মহসিনে হিস্ট্রি” – একটু রুক্ষ ভাবেই বলল অরিন্দম | চায়ের দোকানের ভেতরটা বেশ অন্ধকার – একটা মাত্র আলো জ্বলছে – সেই বাল্বটার ওপর দীর্ঘ দিনের তেল-কালি- তাই আলোর চেয়ে আবছায়াটাই বেশি জাকালো | ধুসর জ্যাকেট হাথটা সড়িয়ে এক পা পিছিয়ে গিয়ে ঘাড়টা একটু কাত করে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন অরিন্দমের দিকে | আচ্ছা জ্বালা হলো তো – গেলাসের চায়ে একটা চুমুক দিয়ে অরিন্দম ভাবলো এর থেকে চাঁপাডালির মোড় ভালো ছিল ! “নাম অরিন্দম সেনগুপ্ত, কলেজ এ পড়াকালীন থাকতে মানিকতলা তে – ঠিক কিনা?” অরিন্দম একটা বেমক্কা বিষম খেল | মুখের চা অন্ননালী শ্বাসনালী গন্ডগোল করে ফেলে সে এক যাচ্ছেতাই কান্ড| ধুসর জ্যাকেট এর ঠোটে একটা মৃদু ছেলেমানুষী   হাসি – সেই হাসিটা চোখের কোল অবধি পৌঁছে চোখ দুটো কে একটু ছোট করে দিয়েছে | লোকটির চোখের মণি দুটি কটা | “কিন্তু আপনি এই সব…”, কাশির দমকটা কমতে কোনক্রমে প্রশ্ন করলো অরিন্দম | ধুসর জ্যাকেট উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলেন – “কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট এর প্রফেসর দের মনে আছে? বলাই চৌধুরী, স্বপন মুখার্জী…এদের মনে আছে?” বিলক্ষণ মনে আছে অরিন্দমএর | নিজে আর্টসের ছাত্র হলেও কেমিস্ট্রি ফিজিচ্ক্স ডিপার্টমেন্ট এ বেশ যাওয়া আসা ছিল অরিন্দমের | অরিন্দমের খুব কাছের বন্ধু, সন্দীপ গাঙ্গুলি, কেমিস্ট্রির ছাত্র ছিল ওই কলেজের – এখন একটা ফার্মা কম্পানিতে কাজ করে | ধুসর জ্যাকেট যে নামগুলি বললেন সেগুলি খুবই পরিচিত নাম সব | অরিন্দম কিছু বলে ওঠার আগে ভদ্রলোক মিটিমিটি হেসে জিগ্যেস করলেন – “আর অমলকান্তি বিশ্বাস , এ বি  – এ বি কে মনে নেই?”

ট্রুথ ইস স্ট্রেন্জার দ্যান ফিকশন – কথা শোনা ছিল তো বটেই কিন্তু কোনদিন উপলব্ধি হয়নি | সেই উপলব্ধিটা তা যে জানুয়ারী মাসের ঠান্ডা, বাদলার দিনে বারাসাতের একটা দাপনার আধ-পাকা চায়ের দোকানের জন্য অপেক্ষা করে আছে সেইটা কে জানত? বাইরে সজোরে একটা বাজ পড়ার মুহুর্তে দোকানের আলোটা কেঁপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অরিন্দম ধাপ্পাটা ধরতে পারল | কিছুদিন আগে এক আড্ডার আসরে ওই সন্দীপই খবরটা দিয়েছিল | কাজের সূত্রে সন্দীপ হাওড়া যায় – ট্রেনএ যাতায়াতের মত খবর সংগ্রহ করার মত সুযোগ আর কিছুতে নেই – সেই ট্রেনএই শোনা এই গ্যাংটার ব্যাপারে | নিপাট ভালো মানুষ সেজে এরা ঘোরেন শহর ও শহরতলির বিভিন্ন প্রান্তে | এদের মোডাস অপারেন্ডি হলো কোনো নিরিবিলি জায়গায়ে আচমকা কোনো ব্যাক্তিকে পরিচিত বলে ঘোষণা করা এবং তারপর  ট্রায়াল এন্ড এর্রর পধ্হতিতে তার কিছুটা পরিচয় জানা | তারপর খেজুরে আলাপ – সন্ধের দিকে হলেই ভালো, জালিয়াতি ব্যাপারটা দিনের আলোয়ে খুব একটা খোলে না – আর আলাপ করে নিজেকে প্রাক্তন অধ্যাপক বলে পরিচয় দেয়া | তারপর কথার পিঠে কথা এবং শেষে পকেটমার এর হাতে সর্বসান্ত হবার করুণ কাহিনী | অতঃপর কিছু টাকা ধার চাওয়া, ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, একটি ভুয়ো মোবাইল নম্বর এবং – সন্দীপএর ভাষায় – মেলট ইনটু থিন এয়ার নেভার টু বি সিন এগেন | যারা এই জালিয়াতিতে বেশি পটু তারা টার্গেট ঠিক করেন ভেবেচিন্তে আর তাদের একটু খোজখবর নিয়ে রাখেন | সেইদিন বেশ চকিত হয়েছিল অরিন্দম যে অধ্যাপক শ্রেণী নিয়েও এই সব জোচ্চুরি শুরু হয়েছে | কিন্তু ভাগ্গিশ সন্দীপ সেই ঘটনা টা বলেছিল তাই আজ এই কেমিস্ট্রির অধ্যাপকটিকে চিনে নিতে অসুবিধে হলো না অরিন্দমের | ছিপে যখন মাছ ফেসেইছে, তখন একটু খেলিয়ে পাড়ে তোলা যাক না কেন – ভাবলো অরিন্দম |

“বলেন কি, এ বি কে মনে থাকবে না? গলফ গ্রিন থেকে আসতেন পড়াতে – ফিজিকাল কেমিস্ট্রি পড়াতেন হনার্স এ”, অরিন্দম সটান ধুসর জ্যাকেটের দিকে চেয়ে বলল | ধুসর জ্যাকেট এর ঠোটের কোলে এখনো সেই হালকা হাসি | “এখন দেখলে চিনতে পারবে? ধরো অল্প আলোয়ে, বারাসাতএর কোনো চায়ের দোকানে বাদলার সন্ধে বেলায়?” হাসি টা একটু প্রশস্ত করে ধুসর জ্যাকেট প্রশ্ন করলেন | এর পর অরিন্দম যেটা করলো সেইটা হয়েত শেষ করেছিল থার্ড ইয়ারএ সত্যজিত রায়ের “অতিথি” নাটকের একটি চরিত্রে | “স্যার, আপনি! এত আমি ভাবতেই পারছি না স্যার” বলে সোজা ধুসর জ্যাকেটের পা উদ্দেশ্য করে ডান হাত বাড়িয়ে কোমর থেকে ঝুকে এগিয়ে যাওয়া | ধুসর জ্যাকেট তত্পরতার সঙ্গে আরিন্দমকে ধরে ফেলে, লজ্জিত কন্ঠে প্রণামে বাধা  দিয়ে বললেন “একটু ধারে গিয়ে দাড়ানো যাক” | বৃষ্টিটা একটু ধরে যাওয়াতে ভিড়্টাও খালি হয়েছিল | অরিন্দম আর লোকটি – এখন আর ভদ্র বলা চলে না – একটু পেছনে একটা বেঞ্চিতে দিকে এগোলো | “একটা চা বলবে নাকি ভাই – শুকনো গলায় কি আর আড্ডা জমবে? এত দিনের জমানো কথা !” অরিন্দম একটু সময় নিয়ে লোকটির দিকে চেয়ে বলল “নিশ্চই বলব স্যার – তার আগে বলুন আপনার পকেটমারটা হলো ঠিক কোথায়?”

লোকটি অরিন্দমের সামনাসামনি একটা বেঞ্চিতে বসতে যাচ্ছিল | বসার আগে পকেট  থেকে একটা রুমাল বের করে বসার জায়েগাটা ঝেড়ে নেওয়ার জন্যে একটু ঝুকে পরেছিল লোকটি | অরিন্দমের কথাটা যেন ওর শিরদাঁয়ে একটা ইলেকট্রিক শক দিল – মাথাটা অরিন্দমের দিকে ঘুরিয়ে সটান খাড়া হয়ে উঠলো ধূসর জ্যাকেট | তারপর বসার জায়েগাটা সাফ না করেই ধপ করে বসে পড়ল | অরিন্দম কিন্তু আজকে একদম টপ ফর্মে – হাঁক দিয়ে দোকানের ছেলেটাকে দুটো বড় আদা-এলাচ দিয়ে চা আর বিস্কুট দিতে বলল | ওর সামনে যে ঘটনাটা ঘটছে সেটা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ! “ঘাবড়াবেন না স্যার, এই জোচ্চুরিটা আমার কমন পড়ে গেছে”, নিজের আস্থার বহিপ্রকাশ দেখে অরিন্দম নিজেই বেশ পুলকিত বোধ করলো, “তবে চিন্তা নেই, পুলিশ ডাকব না | ওদের নির্ঘাত হাথ করা আছে আপনার | স্রেফ আপনার প্রফেশন নিয়ে একটু আড্ডা দেব স্যার | স্যার বলেই বলবতো, নাকি – অন্য কোনো পরিচিতি আছে এ বি ছাড়া?”

“অচিন্ত্য | বাবলা বলে ডাকে সবাই”, ধূসর জ্যাকেটের গলাটা একটু খাদে নেমে একটা ঘরঘরে স্বর বেরোচ্ছে এখন |

“বৃষ্টিটা আবার এলো, তাই বেরোনোর কোনো তাড়া নেই | ধীরে-সুস্থে বলুন তো দেখি এই লাইনের গপ্পো | কি ভাবে এলেন, ব্যাপারটা চলে কিভাবে আর মোস্ট ইম্পর্টান্ট – আমাকে টার্গেট করলেন কি ভাবে? বেশ অনেক কিছুই তো জানেন দেখছি আমার ব্যাপারে|”
লোকটির মাথা নিচু – দোকানের ম্লান আলোতে মাথার মাঝখানের টাক টা বেশি পরিস্ফুট | কত বয়েস হবে লোকটার? পঞ্চাশ? শরীরটা কিন্তু বেশ পোক্ত | হাসি পেয়ে গেল অরিন্দমের – এ বি র চেহারাটাও বেশ চৌকস ছিল – মহিলামহলে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন অমলকান্তি | সেদিক থেকে লোকটি বেশ ভালো ভাওতা ধরেছে ! হাথ দুটো টেবিলের ওপর জড়ো করে, বেশ একটু মনে জোর এনে লোকটি ফের অরিন্দমের দিকে তাকালো | সেই হাসি ব্যাপারটা একদম উধাও |
“মৌলানা কলেজে কেমিস্ট্রিতে ল্যাব আস্সিস্তান্ট এর কাজ করতাম স্যার | চাকরিটা দুনম্বরী করে পাওয়া – নিজে গ্র্যজুএশন পাস করিনি – বাবা মারা গেলেন তাই পরীক্ষা দেওয়া হলো না | তখন কলেজে যে ইউনিয়ন ছিল সেই পার্টিকে ধরে চাকরিটা পাওয়া স্যার | জানেন তো, কি কাজ করতে হয় | কেমিকাল কেনা, স্টক রাখা, ইনস্ট্রুমেন্ট ঠিক রাখা, ল্যাব ঘুছিয়ে রাখা, প্রফেসরদের ফাইফরমাস খেটে দেওয়া – এই সব | মাইনে যা পেতাম তাতে চলত না স্যার – খুব অনটনের সংসার ছিল|”
দোকানের ছেলেটা চা বিস্কুট দিয়ে গেছিল | লোকটা চায়ের গেলাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে যেন অনেকটা ধাতস্ত হলো | অন্তত গলার আওয়াজের জোরটা ফিরে পেল ধূসর জ্যাকেট | অরিন্দম কিছু বলল না – আজকে বাবলার গল্প  শোনার দিন | তার কেবল সূত্রধরের ভূমিকা – নিজে কথা বলে ছন্দপতন ঘটাবে না |
“তারপর বুঝলেন স্যার, চাকরিটা গেল|”
“কিভাবে? ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে তো চট করে সরকারী কলেজের চাকরি যায় না |”
“আরে ধুর মশাই – সেই ইউনিয়ন তো মধ্যকালীন পরিবর্তনের তোরে গেল পালটি খেয়ে | নতুন দাদারা এলেন – তাদের নতুন ভাইরা এলো | যাগ্গে, হচ্ছিল কি কেমিস্ট্রি ল্যাব থেকে সিলভার নাইট্রেট  সরাছিলাম বেশ কিছুদিন ধরে | জিনিসটার বাইরে দাম আছে – রুপোর দাম বাড়লেই জিনিসটার দাম বাড়ে | বাইরে বিক্রি করে বেশ উপরি হচ্ছিল | একদিন হাতেনাতে ধরা পরে গেলাম স্যার | সঙ্গে সঙ্গে চাকরি থেকে বরখাস্ত |”
“আর সেই সঙ্গে এই অন্ধকার জগতে প্রবেশ?”, একটা বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে খুব সাবধানে গেলাস থেকে মুখে পুরে প্রশ্ন করলো অরিন্দম
“না স্যার| ঠিক এই অন্ধকার নয় – অন্য অন্ধকার | কিছুদিন শিয়ালদা লাইনে পকেটমারের কাজ করেছিলাম|”
“পকেটমার? ওই বিদ্যেটা কি করে রপ্ত হলো?”, বেশ অবাক হয়েই প্রশ্ন করলো অরিন্দম
“ঠিক পকেটমার নয় স্যার – ওই পকেট মেরে মালটা হাথ বদল করার একটা ব্যাপার থাকে| খুব জলদি করতে হয় আর হাথে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেটে পরার একটা ছক করে নিতে হয় | ওই কাজটা করতাম আমাদের বস্তির এক পকেটমারের সঙ্গে | পার্টনারশিপ মডেল |” লোকটি অরিন্দমের দেখাদেখি বিস্কুটটা চায়ে ডুবিয়ে তুলতে গেল আর বিস্কুট ভেঙ্গে ফের চায়ের গেলাসে ! “দেখলেন স্যার, হাথের এই অবস্থা – এই নিয়ে পকেটমারি হয়?”, নিজের রসিকতায় নিজেই  মাথা হেলিয়ে হাসলেন লোকটা – অচিন্ত্য |”ইনকাম ভালই ছিল | মানিব্যাগের টাকাটা পাওয়া যেত আর ক্রেডিট কার্ড গুলো বেশ চড়া দামে বিক্রি হতো স্যার | ড্রাইভিং লাইসেন্সে থাকলে সেইগুলি বিহারীরা কিনে নিত বেশ চড়া দামে | সব মিলিয়ে বেশ ভালো স্কিম |”
“বন্ধ হলো কেন?”, অরিন্দম সূত্রধরের ভূমিকায় আজ অসাধারণ
“বাপি – মানে আমার মেন পার্টনার – একদিন ধরা পরে গেল | ট্রেনে ধরা পড়লে অতটা গোলমাল হয় না – কোনরকমে দরজা দিয়ে লাফিয়ে পড়তে পারলেই হলো – কিন্তু ধরা পড়ল শিয়ালদা স্টেশনে | রেল পুলিশ প্রথমে বেধরক মারলো তারপর আলিপুর জেল | এখনো ওখানেই আছে | পুরো বাপি বাড়ি যা কেস হয়ে গেছে!” ফের মাথা হেলিয়ে ধূসর জ্যাকেট হাসলো |
“তারপর এই লাইন ?”
“অনেক সেফ দাদা”, স্যার থেকে দাদাতে নেমে এলো অচিন্ত্য | “প্রফেসরদের ওপর শ্রদ্ধার ব্যাপারটা এখনো আছে – ধরা পরার চান্স নেই বললেই চলে | তবে ইনকাম টা অত বেশি না | আমি এমনিতে একটা এই অঞ্চলে ইঁট বালি সিমেন্টের সাপ্লাইএর ব্যবসা করি – এইটা সাইড বিজনেস বলতে পারেন”
“আমার এত খবর যোগার করলেন কথা থেকে?”
“আরে দাদা খুব সোজা | কোনটা শুনে ইমপ্রেস হলেন বলুন তো ? নাম আর কোথায় থাকেন – এই তো? কলেজটা তো প্রথমে মেলেনি | ঐটা জেনেছি কোচিং ক্লাসের কাশিয়ের নিতাইদার থেকে | ডাকবাংলো মোড়ে ওনার বাড়ি তৈরী হচ্ছে – বালি সিমেন্ট তো আমি সাপ্লাই করছি! আর আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা যা তাতে এখন যেখানে থাকেন, কলেজে পড়াকালীন সেখানে থাকতেন সেইটা হওয়াই স্বাভাবিক | মানিকতলা থেকে সাউথ সিটি হয়ে যাওয়ার চান্সটা কম!”
“কত নিতেন? ” প্রশ্নটা একটু আচমকা হতে অচিন্ত্য একটু ঘাবড়ে গেল | “আজকে এই যে ফাঁদ পেতেছিলেন – কত নিতেন আমার থেকে?”
” ও হো হো – তাই বলুন | পাঁচশো | আপনি যদি পুরোনো প্রফেসর কে ইমপ্রেস করতে হাজার দিতেন তবে অবশ্য না বলতুম না | তবে সাধারণত পাঁচশো দেয় লোকে – প্রফেসর মানুষ – ট্যাক্সি ভাড়াটা তো দিতে হবে না কি!”

হটাত বেশ একটা ঠান্ডা হওয়ার ঝটকা এসে পড়ল দোকানটার ভেতরে| অচিন্ত্য জ্যাকেট টা একটু জড়িয়ে বসলো – ঠান্ডা এড়াতে | অরিন্দম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল বৃষ্টি এখন প্রায় থেমে গেছে বললেই চলে | তাই দোকানের সামনের ভিড়্টাও পাতলা হয়েছে আর হওয়া আসছে কিছুতে বাধা না পেয়ে|
“একটা কথা বলব স্যার? আপনাকে হেঁটে আসতে দেখলুম | পাটা তো জখম মনে হচ্ছে | এই ফাঁকে বেড়িয়ে পড়ুন | ধীরে আস্তে ডাক বাংলো তে গিয়ে একটা চার্টার বাস ধরে নিন – খালি পাবেন| দেরী করলে ভিড় বাড়বে আর চার্টার বাস পাবেন না – দুশো আটতিরিশএ ঝুলে যাওয়া আপনার পোষাবে না|”, লোকটির স্বরে বেশ একটা আন্তরিকতা বেড়িয়ে এলো | কথাটা ধূসর জ্যাকেট মন্দ বলেনি – ফুটপাথ বিহীন এই রাস্তার কাদা-জল ঠেঙিয়ে ডাকবাংলো যেতেই কিছুটা সময় চলে যাবে| অন্ধকারও করে আসছে শীতের বিকেলের | অরিন্দম উঠে দাড়াতে অচিন্ত্যও উঠে দাড়ালো | পকেটে হাথ দিয়ে মানিব্যাগ বের করতে যাবে আর ধূসর জ্যাকেট সন্ত্রস্ত ভাবে বলল “ঐটে করবেন না স্যার| আপনি আমার মান রেখেছেন| লোকাল বলে হয়েত থানা পুলিশ করেননি কিন্তু চেঁচামেচি করে প্রেস্টিজের তো ফালুদা করে দিতে পারতেন| আপনি সজ্জন লোক – জেন্টেলম্যান – তাই ওই চা বিস্কুটের পয়সাটা দিয়ে লজ্জা দেবেন না স্যার |” অচিন্ত্য বেঞ্চিটা থেকে বেড়িয়ে অরিন্দমের মুখোমুখি দাড়িয়ে| আবছা আলোতে তার মুখের একদিনের না কামানো কাঁচা-পাকা দাড়ি দেখা যাচ্ছে | চোখের নিচের কালিটা অরিন্দমের আগে চোখে পড়েনি| ডান হাথটা এগিয়ে দিয়ে ধূসর জ্যাকেট বলল “দেখি স্যার, প্রত্যেক দিন তো আর সত্যিকারের ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়ে না – হাথটা দিন দাদা |” অরিন্দম হাথটা এগিয়ে দিতে অচিন্ত্য দৃঢ় ভাবে সেইটা ঝাকিয়ে বা হাথটা অরিন্দমের ডান কাঁধে  রেখে একটা আধা  আলিঙ্গন ব্যাপার করলেন | লোকটা জোচ্চর হতে পারে কিন্তু হৃদয়বান জোচ্চর – মনে মনে ভাবলো অরিন্দম|

দোকান থেকে বেড়িয়ে রাস্তার ধারের জল কাদা সামলে অরিন্দম এগোলো ডাকবাংলোর দিকে | শীতকালে গোধুলি বলে কোনো ব্যাপার হয় না – দিন থেকে সোজা সন্ধে – তবে একটা অদ্ভূত আবছায়া ঘিরে রয়েছে এই সময় বারাসাতের যশোর রোডের ধারে | একটা ল্যাম্প পোস্ট এর নিচে গিয়ে অরিন্দম পেছনে তাকালো একবার| অচিন্ত্য দোকানের ঠিক সামনে ওর দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে আছে – জ্যাকেটটা গলা অবধি বন্ধ করা, তাই একটু যেন লম্বা বেশি লাগছে | হাথ নাড়ল অরিন্দম | অচিন্ত্য হাথ নেড়েই হটাত সেই হাথ দিয়ে সামনের দিকে দেখালো অরিন্দমকে – বেশ কয়েকবার | তাড়াতাড়ি সামনে চেয়ে অরিন্দম দেখল একটা চার্টার বাস আসছে | চট করে কাঁচা রাস্তা ছেড়ে একটু যশোর রোডের ওপর উঠে হাথ দেখাতে বাসটা অরিন্দমের সামনে দাড়িয়ে পড়ল | এই রুটের সব বাস মানিকতলা হয়ে যায় – তাই জিগ্গেস করতে হলো না | অরিন্দম উঠে দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে দরজার যে ছোট জানলাটা থাকে সেইটে দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রইলো | চায়ের দোকানটা পেরোনোর সময়ে অচিন্ত্য ওরফে বাবলা কে একটা মুচকি হাসি ও হাথ নেড়ে বিদায় জানিয়ে অরিন্দম সামনের দিকে একটা জানলা দখল করে বসলো | বৃষ্টি থেমে গেছে – ভেজা ঠান্ডা হওয়াটা মন্দ লাগছে না| অরিন্দমের কেন জানি রবীন্দ্রনাথের শ্যামা নাটকের “ওই চোর ওই চোর” আর তারপর বজ্রসেনের “নহি চোর নহি চোর” মনে পরে গেল | নিজের মনে গুনগুন করে “এই পেটিকা আমার বুকের পাঁজর সে যে ” বলে অরিন্দম ওর ঝোলা ব্যাগটাকে কোলের ওপর রেখে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চলল| চোর যদি চুরি না করে, তাকে কি তবে চোর বলা যায়? “যার মনে চুরি, সেই তো আসল চোর ফেলুবাবু” – কথাটা মনে পড়ে গেল অরিন্দমের – কতবার যে দেখেছে ছবিটা| কি জানি সেই লজিকে অচিন্ত্যকে চোর বলা চলে কিনা – তবে সন্দীপকে কালকে জমিয়ে বলতে হবে এই ঘটনাটা|

ঠান্ডা বাতাসে অরিন্দমের একটু ঢুলুনি এসে গিয়েছিল | চলন্ত কিছুতে উঠলেই অরিন্দমের একটু ঢুলুনি আসে | বাসে ভিড় ছিল না মোটেই – পাশেও কেউ এসে বসেনি| উল্টোডাঙ্গা এসে গিয়েছে আর বাসের কর্তা উঠে পড়েছেন ভাড়া সংগ্রহে | “মানিকতলা অবধি কত?”, জিগ্গেস করলো অরিন্দম | “কুড়ি টাকা দেবেন”, দাড়িওলা বাস কর্তা জানালেন| অল্প একটু উঠে দাড়িয়ে পেছনের পকেটে হাথ দিয়ে মানিব্যাগ বের করতে গিয়েই অরিন্দম বুঝতে পারল সে জিনিসটি হওয়া | কোচিং ক্লাস থেকে পাওয়া কড়করে ছয় হাজার টাকা ছিল ওতে | বাসটা হটাত ব্রেক কষলো খুব জোরে আর অরিন্দম ধাক্কা খেয়ে ফের সিটে বসে পড়ল| বাস কর্তা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তার দিকে | পকেটমার ধূসর জ্যাকেটের প্রেস্টিজের ফালুদা না হয় অরিন্দম করেনি – কিন্তু সেইটে যে এখানে তার প্রেস্টিজ নিয়ে হবে না সেটা কে বলতে পারে| বেশ প্রশস্ত হেসে বাস কর্তা অরিন্দমকে বললেন, “আপনি সামন্তবাবুর কোচিংএ ক্লাস নেন না? আমাদের ভাইপো পড়ে তো ওখানে |”, বাস কর্তার চোখে পুরোমাত্রায় সম্ভ্রম | “থাক স্যার, আপনাকে টাকা দিতে হবে না | প্রফেসর মানুষ আপনি|”