বসন্ত এসে গেছে

IMG_20150411_092512_1428728714872চট করে মুখবন্ধটা সেড়ে ফেলি। আমার দুঁদে আলোকচিত্রী বন্ধু জয়দীপ মিত্র (গুগল করুন) একটা বাংলা ভ্রমণ পত্রিকা চালাতো। “যারা পরিযায়ী”। খুব যত্ন করে দামি কাগজে ছাপতো। খুব বেশি কেউ কিনতো না। তাই যা হয় – গত বছর  বন্ধ হয়ে গেলো পত্রিকাটি। গোটা দুয়েক পূজাবার্ষিকী সংখ্যা পড়ে আছে আমার কাছে। ওই পত্রিকার জন্যে এই লেখাটা বছর তিনেক আগে লিখি “আমার শহর” নাম দিয়ে। জয়দীপ তাগাদা না দিলে তাও লিখতুম না। আজকাল পরিযায়ী পাখি আর দেখা যায় না – তারাও তাদের শহর খুঁজে পেয়েছে ঘর ছাড়া অন্য ঘরে। আমারই মতন। 

—– X ——

দুহাজার এক সালের মার্চ মাস। সেইদিন ইডেন গার্ডেনে ব্যাট হাতে মহাকাব্য লিখছেন ভি ভি এস লক্ষ্মণ আর রাহুল দ্রাবিড়। সারা শহর ভেঙ্গে পড়েছে হয় মাঠে নয়ত টেলিভিশনের সামনে। বেশ গরম ছিল সেইদিন কলকাতাতে। সেই দিনেই কলকাতা বিমানবন্দর থেকে হায়দ্রাবাদ হয়ে ব্যাঙ্গালরের হ্যাল এয়ারপোর্টে নামলাম যখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গিয়েছে। সঙ্গে সম্পত্তি বলতে একটা সদ্য কেনা ভি আই পি সুটকেস, একটি আই টি কম্পানির নিয়োগপত্র আর কোনোদিন না আসা একটা শহরকে ঘিরে কৌতূহল আর চিন্তা – ভালো লাগবে তো এখানে থাকতে?

গন্ধ। গন্ধের সঙ্গে মানুষের স্মৃতির যোগ সর্বজনবিদিত। কিন্তু একটা গন্ধ যে কাউকে একটা শহরের প্রেমে ফেলে দিতে পারবে সেইটা নেহাতই অজানা ছিল আমার কাছে। রিচমণ্ড রোডের গেস্ট হাউস থেকে বেড়িয়ে ট্রিনিটি সার্কেলের দিকে যাচ্ছি ঠিক তখনি হটাত নাকে এল গন্ধটা। শুখনো উক্যালিপট্যাস গাছের ঝরে যাওয়া পাতা একজায়গায় জড় করে কারা যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। ঈষৎ কটু, মাতাল অথচ মন তাজা করে দেয়া গন্ধটা ধোঁয়ায় মিশে ভেসে এসেছে বসন্তের বাতাসে। এক লহমায় সেই গন্ধ আমাকে নিয়ে গেল কয়েক দশক পেছনে – আমার শৈশব কাটা শিল্পশহর বার্নপুরে। ঠিক এইভাবে সেখানে উক্যালিপট্যাস এর পাতা একত্র করে জ্বালানো হত বিকেলবেলায়। আমাদের ফুটবল খেলার মাঠেও ধেয়ে আসতো সেই ধোঁয়ায় মেশানো পাতার গন্ধ। ওই গন্ধটা আমার বহুদিনের পরিচিত। খুব পুরনো বন্ধু। রিচমণ্ড রোডে সেইদিন ধোঁয়ার গন্ধ যেন পথে হটাত দেখা সেই পুরনো বন্ধুর মত জড়িয়ে ধরে বলেছিল “কি রে, কখন এলি? থাকবি তো কিছুদিন?” ব্যাঙ্গালরের যে পুরকর্মী সেদিন পাতা জ্বালাছিলেন তাঁর কাছে আমি চির ঋণী। চোদ্দ বছর হয়ে গেল – উক্যালিপট্যাস গাছ শহরে প্রায় বিলুপ্ত – কিন্তু আমি সেই শৈশবের গন্ধ গায়ে মেখে থেকে গেলুম এই শহরে। আমার শহরে।

আমি বরাবরই স্মল টাউন ম্যান। হয় মফঃস্বল নয় শহরতলীতে থেকেছি – তাই দিব্যি লাগতো ব্যাঙ্গালরের ছোট শহর ব্যাপারটা। আকাশচুম্বী বাড়ি নেই, গাদাগাদি ভিড় নেই, পরিষ্কার পথঘাট, পাড়ায় পাড়ায় ছিমছাম পার্ক আর চিরবসন্ত অবহাওয়া। গ্রীষ্মের দাবদাহ এদিক মাড়ায় না আর সন্ধে হলেই মাঝে মাঝে ঝির ঝিরে বৃষ্টি পড়ে একদম দুর্দান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। আজকেও বদলে যাওয়া ব্যাঙ্গালরের সাবেকি ক্লাবগুলোতে গিয়ে পাখার ব্যাবস্থা পাবেন না। আবার নিন্দুকেরা বলে এই আবহাওয়াই নাকি এখানকার মানুষদের কুঁড়ে করে দিয়েছে। সে প্রসঙ্গ যাক। আগে কোনোদিন না এলেও ব্যাঙ্গালরের একটা অঞ্চলের সাথে আমার পূর্বপরিচয় ছিল। ফ্রেজার টাউন। পরিচয় সুত্র একদম ছোটবেলায় পড়া সত্যজিৎ রায়ের গল্প “ব্রাউন সাহেবের বাড়ি”। গায়ে কাঁটা দেয়া ভূতের গল্প – একাকী থাকা বুড়ো সাহেব রাত হলেই দেখা পান তাঁর একমাত্র অথচ অধুনা মৃত সঙ্গী এক বেড়ালের। সেই বুড়োর বাড়ি লেখক ফেঁদেছিলেন এই ফ্রেজার টাউনে। সেই ফ্রেজার টাউনের গায়েই থাকতাম আমরা। একদিন পথ চলতে চলতে থমস বেকারির পেছনে, প্রমেনেড রোডে আবিষ্কার করলুম এক পেল্লাই পরিত্যক্ত বাংলো বাড়ির। এক গলা জঙ্গলের মাঝে বসে আছে আধভাঙ্গা বাড়িটা। গেট ঠেলে জঙ্গল ডিঙ্গিয়ে প্রথমেই একটা বড় বড় থামের বারান্দা সামনেটায়। এক সন্ধেবেলা ওই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে এক লহমায় চোখের সামনে ভেসে উঠলো দৃশ্যটা – ওই তো বুড়ো সাহেব দুধের বাটি হাতে ধরে ডেকে চলেছেন তার একমাত্র ভালবাসার পাত্রকে – ‘সাইমন, সাইমন’। এখনো আমি ওই বাড়িটার পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে ঘুরে যাই। প্রমটারি যুগে বাংলোটা কিন্তু এখনো রয়েছে সেইখানেই – হয়েত বুড়ো সাহেবই আগলে রেখেছেন। ছোট্ট বেলার আরও একটা স্মৃতির সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিল ব্যাঙ্গালর শহরটা। ভালবাসার খেলায় আরেক দানে কিস্তিমাত করলো আমাকে।

বন্ধু ব্যাপ্তি আমার কোনোদিন খুব বেশি ছিল না, কিন্তু ব্যাঙ্গালরে এসে নতুন বন্ধু হয়েছে বেশ কিছু যারা অনেকেই দক্ষিণ ভারতীয় (কিছু পুরনো বন্ধু যাদের কলকাতাতে ফেলে এসেছিলাম তারাও কেউ কেউ গুটিগুটি এসে হাজির হয়েছেন ব্যাঙ্গালরে – আমার আগেই। তাদের সঙ্গে পুনর্মিলন হয়েছে)। জীবনে আমি এই প্রথম খুব কাছ থেকে রক্ষণশীল দক্ষিণ ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থাটা দেখি। বাঙালিদের মধ্যে জাত, গোত্র ইত্যাদির উপচে পড়া বাড়াবাড়িটা কম – আমি তো পুজোতে পুরুতমশাই গোত্র জিগ্যেস করলে কখনও কাশ্যপ কখনও আলিম্যান যাহয় একটা বলে চালিয়ে দিতাম। ব্যাঙ্গালরে এসে দেখলুম যে মানুষের পরিচয় কাস্ট ব্যাপারটাতেই শেষ নয় – লতাগুল্মাদি সাব কাস্টেও গিয়েও শিকড় গেড়েছে। বাঙালি বলে আমার গর্ব হয়েছিলো এইসব দেখে – আমরা আমাদের গোঁড়ামিকে সামলে রাখতে পেরেছি সেই ভেবে।

IMG_20161010_180855সব শহরের একটা প্রাণকেন্দ্র থাকে। বড় শহরের অনেকগুলি করে থাকে – নাগরিকরা তাদের পছন্দের প্রাণকেন্দ্রগুলি খুঁজে নেন আর তার সাথে গড়ে তোলেন হৃদয়ের সম্পর্ক। কলকাতাতে আমার প্রাণকেন্দ্র ছিল কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলটা আর মুম্বইতে ফোর্ট । ব্যাঙ্গালরের প্রাণকেন্দ্র খুঁজতে গিয়ে দেখলুম সেইটা স্রেফ একটা মেরে কেটে এক কিলোমিটার রাস্তা। চার্চ স্ট্রিট। “ইট ইজ আ ন্যারও য়ালি উইথ আ গ্রেভইয়ার্ড অ্যাট ওয়ান এন্ড অ্যান্ড আ রিভার অ্যাট দ্য আদার” – নিউ ইয়র্কের লোকেরা তাদের লোয়ার ম্যানহ্যাটানের কিংবদন্তী ওয়াল স্ট্রীটকে এই ভাবে বর্ণনা করেন। বেচারা চার্চ স্ট্রিট কিন্তু নিজেকে চেনাতে জোগাড় করতে পেরেছে মাত্র একপ্রান্তের একটা দিকপাল ল্যান্ডমার্ক। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬৫ সালে দুগ্ধজাত মিষ্টির ওপর নিষেধ আজ্ঞা জারি হওয়াতে শ্রী কৃষ্ণ চন্দ্র দাস তার পুত্রদের নির্দেশ দেন দোকানের সম্প্রসারণ কলকাতা শহরের বাইরে করতে। অকৃতদার শ্রী বারিন চন্দ্র দাস – আমাদের বারিনদা – ব্যাঙ্গালর শহরের সবচেয়ে বড় মিষ্টির দোকানটি ফাঁদলেন চার্চ স্ট্রীটের একদম পশ্চিম প্রান্তে। এখনো এই কে সি দাশের দোকানের সামনে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে লাইন পড়ে ছোলার ডাল আর রাধাবল্লভি প্রাতরাশের। দোকানের মধ্যেই ছোট্ট আর্ট গ্যালারি থেকে শুরু করে বারিনদা ধরে রেখেছেন আর একটা জিনিষ – ওই তল্লাটে একমাত্র তার দোকানই দুপুরে এক ঘণ্টা বন্ধ থাকে!  বারিনদা মুখচোরা মানুষ না হলে দিব্যি শ্লোগান দিতে পারতেন – “ব্যাঙ্গালরকে মিষ্টি দই খাওয়াল কে, কে সি দাস আবার কে!” তবে কে সি দাশ নয় – “দ্য ফার্স্ট সিটিজেন অফ চার্চ স্ট্রিট” তকমাটা তোলা আছে অন্য একজনের জন্যে। টি এন শানবাগ। প্রিমিয়ার বুক স্টোরের মালিক। রোমানটিসিস্মে চুপচুপে এই বইয়ের দোকানটি ছিল আমার ব্যাঙ্গালরের অন্যতম আকর্ষণ। আয়তনে দোকানটি এক চিলতে – মাটিতে সার দেয়া বইয়ের তাক আর তাতে ঠাসা বই। তাকগুলো ওপরের দিকে উঠে গিয়ে কোথাও একটা শেষ হয়েছে – আর শেইখান থেকে শুরু হয়েছে বইএর ডাই। মেঝেতে যেখানে তাক নেই সেখানে মাটি থেকেই শুরু হয়েছে বইয়ের স্তূপ – শেষ হয়েছে বাধ্য হয়েছে ছাদের চোখ রাঙ্গানিতে। এরই মাঝে এক কোনায় মিঃ শানবাগের এলোমেলো ডেস্ক। সৌভাগ্যবান ছিলেন সেই পাঠিকা যিনি যে বইটি খুঁজছেন যদি নিজেই বের করে নিতে পেরে থাকেন – আমি প্রায় কাউকেই চিনি না যারা প্রিমিয়ারে নিজে বই খুঁজে পেয়েছেন! বইয়ের নামটি গিয়ে বলতে হত মিঃ শানবাগকে। ওই দমবন্ধ করে আসা বইএর ট্রপিক্যাল জঙ্গলে বইটি কোথায় আছে এক লহমায় বলে দেবেন তিনি – আর একজন মই বেয়ে দশফুট ওপরে উঠে টেনে নামিয়ে আনবেন সেই বই। কুতুব মিনারকে না টলিয়ে তার মাঝখান থেকে একটা ইট বের করে আনার মত। তারপর মিঃ শানবাগ মুক্তোর মত হাতের লেখায় বইয়ের নাম লিখে ক্যাশ-মেমো বানিয়ে দেবেন। ছুটির দিনে আমার কত ঘণ্টা যে প্রিমিয়ারে কেটেছে তার ইয়ত্তা নেই। তারপর ব্যাঙ্গালরে শুরু হোল রিয়েল এস্টেট বুম। মিঃ শানবাগের বাড়িঅয়ালা নতুন যে ভাড়া হাঁকলেন সেইটে দেয়ার মত সামর্থ্য প্রিমিয়ারের ছিল না। পেশীর সাথে হৃদয়ের পাঞ্জা খেলার পরিণতি তো আগে থেকেই জানা থাকে। একদিন প্রিমিয়ারে গিয়ে দেখি ঝাঁপ বন্ধ – বাইরে কিছু ছেলে মেয়ের জটলা। পিঠে ক্যানভাসের রুকস্যাক ধরা একটি মেয়ে খানিক যেন রাগত ভাবেই আমাকে বললেন “দিস অওাস ব্যাঙ্গালরস ইন্সটিটিউশন। এন ইন্সটিটিউশন হ্যাস কাম টু এন এন্ড”।

IMG_20161009_174943আমার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়, কল্যাননগর অঞ্চলে থাকতেন আর এক ইন্সটিটিউশন – সঙ্গীতশিল্পি মান্না দে। জীবনের শেষ জলসাও করেছেন এই শহরে। আমার পরম সৌভাগ্য সেদিন চৌডিয়া মেমরিয়াল হলে দর্শকাশনে আমি হাজির ছিলাম। উননব্বই বছরের তরুন তুর্কী মান্না দে – মেরেকেটে তিরিশ বছর বয়েশি গাইয়িকার সাথে গাইছেন “আ যা সানাম মধুর চাঁদনি মে হম…”। ব্যাঙ্গালরের একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল (হয়েত এখনো আছে) – রাত এগারটার পর কোনো প্রকাশ্য অনুষ্ঠান করা যেত না। পৌনে এগারোটা বাজতেই দেখি হলের দরজায় এক পুলিশ অফিসার হাজির। আয়োজকের একজন মান্না দের কানে কানে কিছু একটা বলতে প্রবীণ শিল্পী হয়েত কোথায় আছেন ভুলে গিয়ে বলে উঠলেন “মগের মুল্লুক নাকি?”। তারপর সামলে নিয়ে দরজার সেই পুলিশকে উদ্যেশ্য করে বললেন “ইউ কাম অ্যান্ড সিট – এঞ্জয় দ্য সংস”। রাত সাড়ে এগারটায় যখন জলসা ভাঙ্গল দেখি সেই পুলিশ অফিসারও সামনের সারিতে বসা! আমি মান্না দের প্রথম জলসা শুনি পনের বছর বয়েসে, বার্নপুরের বঙ্গ সংস্কৃতি অনুষ্ঠানে। কয়েক দশক পর চিরবসন্তের শহর আমাকে মিলিয়ে দিল এক কিংবদন্তি চিরবসন্ত শিল্পীর সাথে। জোরদার হয়ে উঠলো আমার শহরের সাথে আমার বন্ধনডোর।

অথচ দেখুন, এই শহরটাই কেমন নিরাশ করলো মান্না দের তিরধানের সময়। কন্নড় মেগাস্টার রাজকুমার বা বিষ্ণুবর্ধনের মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো শহরটা। হয়েত তাদের মত এই দেশের, এই প্রজন্মের কাছে পরিচিত বা জনপ্রিয় ছিলেন না মান্না দে কিন্তু আবার তিনি তো স্রেফ বাঙালি কিংবদন্তী ছিলেন না। ওনার প্রতিভা আর কাজের ব্যাপ্তি তো ছিল দেশ জোড়া। কিন্তু সেই কালজয়ী শিল্পীর মৃত্যুতে আমার শহর জড় করলো গুটি কয়েক মানুষকে – শেষকৃত্য সারা হোল দায়সারা ভাবে প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। শিল্পীর মূর্তি স্থাপন করা হবে শুনেছিলাম কল্যাননগরে – তাও কোন হেল দোল দেখি না। চিরবসন্তের শহরে চিরবসন্ত সঙ্গীতশিল্পী চলে গেলেন চুপি চুপি একা একা। আমাদের জন্য।

IMG_20150611_184356ব্যাঙ্গালরে এসে প্রথম দিকে বিকেলবেলা বা ছুটির দিনে রাস্তায় হেঁটে বেড়াতাম – পথঘাট চিনতাম, দোকান চিনতাম, মানুষ চিনতাম। শহরের মধ্যস্থলে মহাত্মা গান্ধী রোডের দুই ধারে দিব্যি হাঁটা যেত। দক্ষিণ দিকে সারি সারি দোকান আঁকড়ে চওড়া ফুটপাথ আর উত্তরদিকে রাস্তা থেকে দশ ফুট ওপরে বুলেভার্ড যার গায়ে নেমে এসেছে ফিল্ড মার্শাল কারিয়াপ্পা গ্রাউন্ডের দেয়াল বেয়ে নানা রঙের বউগেনভিলিয়ার ঝর্ণা। আজ থেকে দশ বছর আগেও হটাত বাংলা কথা শুনলে দাঁড়িয়ে পড়তাম হাঁটা থামিয়ে। অবান্তর প্রশ্ন হত – “আপনি বাঙালি”? বেঙ্গলি এ্যাসোসিয়েশনের দুর্গা প্রতিমা তখনো ক্লাবের হলঘরটা ছেড়ে বারোয়ারী মাঠে উঠে যায়নি। হটাত করে বেড়ে ওঠেনি আমার শহরটা। কিন্তু বেড়ে উঠলো কিছুদিন পড়েই খুবই আচম্বিতে – আর বেড়ে উঠলো খানিক এলোমেলো ভাবেই। সেই বাড়ার সময় সাধারণ নিয়মেই ছড়িয়ে যাওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির মধ্যে একটা দূরত্ব গজিয়ে উঠলো। বেচারা হৃদয়টা পড়ে রইল শূন্য স্থানে – প্রায় ক্লাবের হলঘরে দশমীর সকালের দুর্গাপ্রতিমার একাকীত্বে। আমার শহরটাকে এখন মাঝে মাঝেই খুব হৃদয়হীন মনে হয়। এখনকার ধূলিধূসর, স্বল্প পরিসর অথচ কর্মব্যস্ততায় জমজমাট শহরটাকে দেখলে আমার অচেনা ঠেকে কখনো কখনো। কিন্তু অচেনা না লাগার অনেক কারণই তো হাজির হয়েছে এই শহরে। বাঙ্গালির সংখ্যা মন ধাঁধান হারে বেড়েছে। দুর্গা পূজার সময় যানজট দেখলে কলকাতা শহর মনে পড়ে যাওয়া নিশ্চিত। আর হ্যাল মার্কেটে রবিবার মাছ কিনতে গেলে এখন ভোর ভোর বেড়িয়ে পড়াই শ্রেয়। কোঙ্কনি মাছ বিক্রেতা ফিরোজের অকাল মৃত্যু হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারীরা অবলীলায় সিয়ার, সুরমাই, পম্ফ্রেটের পাশাপাশি একবারও হোঁচট না খেয়ে দিব্যি চিতল, পার্শে, ট্যাংরা বিক্রি করে চলেছে। ইলিশ চাইলে পাল্টা প্রশ্ন শিখেছে – “ডিম অওালা দে দ্যু?”। মাছ কিনে বিক্রেতাকে “বেঙ্গলি কাট” বললেই যথেষ্ট এখন। কিন্তু এইটাও তো পালটানো? ব্যাঙ্গালর শহরটা পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত – পাল্টে যাচ্ছি আমরাও। ছোট ছোট ভালো লাগার জিনিষগুলি বিরল হয়ে পরছে। কালের নিয়মে তাদের জায়গা নিচ্ছে নতুন জিনিষ, নতুন মানুষ – তারা নতুন হাতে গড়ে তুলছে তাদের শহর।

IMG_20150411_185942তবু আমার চেনা পুরনো ব্যাঙ্গালর খুঁজে পাই মাল্লেশ্বারামে, পাই ফ্রেজার টাউনে, পাই রিচার্ডস পার্কের পাশে যে বাংলোটা কফিশপ হয়ে গিয়েছে সেইটায়। কখনও কাব্বন পার্কে হাঁটতে হাঁটতে হটাতই পথে দেখা হয় ফেলে আসা শহরটার সাথে। বলে ওঠে “কি খবর বল – কতদিন দেখা হয়নি”। রিচমণ্ড রোডে গাড়ি নিয়ে গেলে এখনো জানলার কাঁচটা নামিয়ে রাখি। কখনও এক ঝলক উড়ে আসা উকালিপ্টাস গাছের পাতা পোড়ানোর গন্ধের ধোঁওয়ার মাঝে দেখতে পাই ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া নিজেকে। চিনতে চিনতে চলছে তার শহরকে। আর গাড়ির ভেতরে মিউসিক সিস্টেমে বেজে ওঠে পিছুটান “…কারা যে ডাকিল পিছে, বসন্ত এসে গেছে”।

Advertisements
Previous Post
Next Post
Leave a comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: