শেষ সম্বল

জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান। ন’ টি সংখ্যা আবার আবৃতির মতন করে আউড়াল হীরু। আবার একবার। দুটো আঙ্গুলের মধ্যে ধরা একটা আধ-ময়লা দশ টাকার নোট। সংখ্যাগুলি নোটের গায়ে লেখা ক্রমিক। মানুষের জীবনে অর্থ ফুরিয়ে আসে শুনেছিল হীরু – কিন্তু অর্থ ফুরোলে অনুভূতিটা যে কিরকম হবে বুঝতে পারত না। আজকে পারছে। আজকে সব অর্থেই হীরুর অর্থ শেষ – জীবনের এবং জীবন ধারণের উপায়ের। হীরুর দু আঙ্গুলের মধ্যে ধরা তার শেষ অবলম্বন – কুলুঙ্গিতে রাখা ধূলো পড়া ,রঙ জ্বলে যাওয়া গনেশ ঠাকুর চাপা দেয়া দুই ভাঁজ করা এই দশ টাকার নোটটা। সযত্নে বুক পকেটে নোটটাকে রেখে দিয়ে নিজের জামাটা ঠিক করে নিল হীরু। গনেশের পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলো। জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান – আর একবার অস্ফুটে অউড়ে নিল হীরু নিজের শেষ সম্বলের পরিচয়।

——————————————–

রসায়নে অনার্স ছিল হীরালাল মণ্ডল’এর। শহরের নয় – মফস্বলের কলেজ। পড়াশোনার চেয়ে ইউনিওনবাজী, গুন্ডাগিরি হত বেশি। পার্ট ওয়ান কোন রকমে পাস করলেও পার্ট টু আর উৎরোতে পারেনি হীরু। বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না, নিজের মনের না। তাই দ্বিতীয়বার আর পার্ট টু দেয়ার চাড় করেনি। কলকাতাতে এসে সোনারপুরে একটা কেমিক্যাল কম্পানিতে সামান্য মাইনের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট এর চাকরি পেয়ে গেল। বছর ঘুরেছে কি ঘোরেনি – গোলমাল শুরু হোল কারখানায়। প্রথমে মালিক বনাম ইউনিওন, পরে ইউনিওন বনাম ইউনিওন। কয়েক মাস পরেই কারখানার গেটে তালা। হীরু আর তার সহকর্মীরা অনেকদিন কারখানার গেটে অনশন করেছিলো – কিসসু হয়নি। পরে কুরিয়ার কম্পানি, দোকানের সেলসম্যান এমনকি হাউসিং সোসাইটির দ্বারওান – সব কিছু চেষ্টা করে শেষ মেশ হীরু বাসের কনডাকটার হয় – তিরিশের সি রুটে। সেই বাস এখন আর বেড়য় না। তেলের দাম বাড়া আর তার তাল না মিলিয়ে ভাড়া না বাড়া – মালিকের বাস চালানো পোষায় না। বাসটা পড়ে আছে গড়িয়ার কাছে একটা গ্যারেজের পেছনের মাঠে। কনডাকটারই করার সময়েই জুয়া খেলা আর নেশা করা শুরু করে হীরালাল। এই দুইয়ের প্রভাবে শরীর আর অর্থ দুটোই পাল্লা দিয়ে ক্ষইতে থাকে। তারই শেষ পরিণতি আজকের এই কুলুঙ্গির গনেশের নীচে রাখা জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান। জীবনের অর্থ কমতে কমতে দশ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

—————————————–

বাইপাসটা যেখানে এসে কামালগাজীতে মিশেছে, সেইখানে একটা দাপনার ঘুপচি বাড়িতে থাকে হীরু। খোলা নর্দমা পেড়িয়ে রাস্তায় পরে হাঁটতে লাগল হীরালাল। দুপুর বেলার অটোগুলো পাশ দিয়ে জিজ্ঞাসু ভাবে চলে যাচ্ছে – প্রশ্নই ওঠে না ধরার। হাঁটতে হাঁটতে হীরু ঢালাই ব্রিজের মেট্রো স্টেশনে পৌঁছাল। দম দম গামী ট্রেন আসতে কুড়ি মিনিট সময় আছে এখনো।

“কোথায় যাবেন?” রুক্ষ ভাবে জিগ্যেস করলো কাউন্টারের ওইদিকের লোকটা

“যে কোন”

“যে কোন মানে? কোন স্টেশন যাবে?” মুহূর্তে সম্বোধন আপনি থেকে তুমি সম্বধনে নেমে এল

“ওই তো – দিন না – গড়িয়া”

“দশ বের করছেন কি? দেখছেন না এইটা এগজ্যাক্কট চেঞ্জ কাউন্টার? পাশের লাইনে যান”

আঙ্গুলের ফাঁকে ধরা জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান – মুচকি হাসল হীরালাল। জীবনের শেষ সম্বলের সঙ্গে আরও মিনিট দুয়েক কাটানো যাবে – তা মন্দ কি?

“একটা টাকা হবে?” পাশের কাউন্টারের লোকটি প্রশ্ন ছুড়ে দিল হীরুর দিকে না তাকিয়েই

“না দাদা, এই আছে – আর নেই”

কাউন্টারের লোকটি থাবা মেরে তুলে নিল হীরুর রাখা দশ টাকার নোট টা। এই ছিল এই নেই – হীরালাল মণ্ডলের শেষ সম্বল চলে গেল একটা টিনের কৌটোর ভেতর। মাত্র কয়েক হাত দূরে কিন্তু চলে গেল চিরতরে। কালো চাকতি টিকিট আর দুটো দু টাকার চাকতি সড়াৎ করে ছুড়ে দিল কাউন্টারের দাদা। টাকার চাকতির নম্বর থাকে না – আলাদা করে তাদের সঙ্গে আত্মতিয়তা হয় না। সিঁড়ি ধরতে গিয়ে হীরু দেখল কল্যাপ্সিবিল গেটের ওইদিকে কোলে একটি শিশুকে ধরে এক মহিলা ভিক্ষে করছে। হাত বাড়িয়ে টাকা দুটো তাকে দিয়ে দিল হীরু। ব্যাস – একদম বাঁধন মুক্ত সে

————————————————-

ওই দূরের বাঁকে ট্রেন আসছে দেখা যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে লোক প্রায় নেই বললেই চলে। গতকাল বিজয়া দশমী গেছে – ছুটির মেজাজ কাটেনি এখনো। হীরু স্লথ পায়ে প্ল্যাটফর্মের একদম ধারটায় গিয়ে দাঁড়ালো। ঢাকের আওয়াজ আসছে। কাছের কোন পাড়ার ঠাকুর বিসর্জন যাচ্ছে। “আসছে বছর – আবার হবে”। ট্রেনটা একদম প্ল্যাটফর্মের কাছে এসে পড়েছে।

Leave a comment

2 Comments

  1. Well written, but why the undiluted pathos of poverty?

    Reply
  2. Sir, poverty by itself may not drive a person to be suicidal but in most cases is a very strong catalyst. Tried to explore that angle a bit

    Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: