সাধনা

[দেবলোক। খুব ভারী পোশাক, উজ্জল নীল রঙের দাড়ি আর একদম বেমানান  শিরস্ত্রাণ পরে দেবেশ্বর ব্রহ্মা একটা গোলমেলে চোঙ্গা মার্কা যন্ত্রে চোখ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে]

হেই ইউ নারদ – কাম হিয়ার। লুক থ্রু দ্য ফুটোস্কোপ। কি করছে ওই লোকটা?
বাওয়া – সটান খাড়া, উর্ধবাহু আর ডান পা ভাঁজ করে বাঁ জানুর ওপর রাখা। তিন দিনের না কামানো দাঁড়ি গোঁফ! ঠিক বুঝতে পারছি না প্রভু। হাইলি সাসপিশাস।
চিত্রগুপ্ত কোথায়? ওই বলতে পারবে
নেই স্যার। বিগ ডেটা প্রোজেক্ট নিয়ে ব্যাস্ত – ডিস্ট্রিবিউটেড হ্যাডুপ ডেটাবেসে ম্যাপরিডিউস এপ্লাই করে জন্ম মৃত্যু প্রেডিক্ট করার চেষ্টা করছে। আপনি নিজে কিছু বোঝার চেষ্টা করেছেন প্রভু?
করিচি। বামুন বেশে গিয়ে প্রথমে ভিক্ষে আর তাপ্পর বগলে কাতুকুতু দিয়েছি। কিসসু হয়নি। ফিরে এসে ঊর্বশী আর রম্ভাকে পাঠালাম। মুন্নি থেকে জিলিপি থেকে চামেলী – কোনো নাচেই কাজ দিলো না। ইচ্ছামৃত্যু-তিত্যুর জন্যে সাধনা করছে না তো রে?
কেস কেলো – দাঁড়ান নিজে গিয়ে দেখে আসি

[কয়েক মুহূর্ত পরে নারদের পুনঃ প্রবেশ]

পরেছি প্রভু, পেরেছি! সাধনার হেতু নির্ধারণ করতে পেরেছি
পেরেছিস? বাঃ – বাছার জন্যে খুব মায়া হচ্ছে রে। কি চায়? বল – দেরী করিস নি – দিয়ে দি!
পারবেন না প্রভু
হওয়াট! আমি হলাম ব্রহ্মা আর সামান্য এক মর্তের সাধকের ইচ্ছা পূরণ করতে পারব না? ইয়ার্কি হচ্ছে? কি এমন চায় সে? ব্রহ্মাস্ত্র হলে আমার স্টকেই আছে, পাশুপত হলে শিবুদাকে হওয়াটসয়াপ করলেই এসে দিয়ে যাবে।
ওই সব নয় স্যার। ওই সবের অনেক ওপরে। ও জিনিষ আমাদের কাছে নেই – কোনোদিন আসবেও না।
কি সে জিনিষ নারদ?
আইফোন সিক্স প্লাস, প্রভু

শেষ সম্বল

জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান। ন’ টি সংখ্যা আবার আবৃতির মতন করে আউড়াল হীরু। আবার একবার। দুটো আঙ্গুলের মধ্যে ধরা একটা আধ-ময়লা দশ টাকার নোট। সংখ্যাগুলি নোটের গায়ে লেখা ক্রমিক। মানুষের জীবনে অর্থ ফুরিয়ে আসে শুনেছিল হীরু – কিন্তু অর্থ ফুরোলে অনুভূতিটা যে কিরকম হবে বুঝতে পারত না। আজকে পারছে। আজকে সব অর্থেই হীরুর অর্থ শেষ – জীবনের এবং জীবন ধারণের উপায়ের। হীরুর দু আঙ্গুলের মধ্যে ধরা তার শেষ অবলম্বন – কুলুঙ্গিতে রাখা ধূলো পড়া ,রঙ জ্বলে যাওয়া গনেশ ঠাকুর চাপা দেয়া দুই ভাঁজ করা এই দশ টাকার নোটটা। সযত্নে বুক পকেটে নোটটাকে রেখে দিয়ে নিজের জামাটা ঠিক করে নিল হীরু। গনেশের পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলো। জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান – আর একবার অস্ফুটে অউড়ে নিল হীরু নিজের শেষ সম্বলের পরিচয়।

——————————————–

রসায়নে অনার্স ছিল হীরালাল মণ্ডল’এর। শহরের নয় – মফস্বলের কলেজ। পড়াশোনার চেয়ে ইউনিওনবাজী, গুন্ডাগিরি হত বেশি। পার্ট ওয়ান কোন রকমে পাস করলেও পার্ট টু আর উৎরোতে পারেনি হীরু। বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না, নিজের মনের না। তাই দ্বিতীয়বার আর পার্ট টু দেয়ার চাড় করেনি। কলকাতাতে এসে সোনারপুরে একটা কেমিক্যাল কম্পানিতে সামান্য মাইনের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট এর চাকরি পেয়ে গেল। বছর ঘুরেছে কি ঘোরেনি – গোলমাল শুরু হোল কারখানায়। প্রথমে মালিক বনাম ইউনিওন, পরে ইউনিওন বনাম ইউনিওন। কয়েক মাস পরেই কারখানার গেটে তালা। হীরু আর তার সহকর্মীরা অনেকদিন কারখানার গেটে অনশন করেছিলো – কিসসু হয়নি। পরে কুরিয়ার কম্পানি, দোকানের সেলসম্যান এমনকি হাউসিং সোসাইটির দ্বারওান – সব কিছু চেষ্টা করে শেষ মেশ হীরু বাসের কনডাকটার হয় – তিরিশের সি রুটে। সেই বাস এখন আর বেড়য় না। তেলের দাম বাড়া আর তার তাল না মিলিয়ে ভাড়া না বাড়া – মালিকের বাস চালানো পোষায় না। বাসটা পড়ে আছে গড়িয়ার কাছে একটা গ্যারেজের পেছনের মাঠে। কনডাকটারই করার সময়েই জুয়া খেলা আর নেশা করা শুরু করে হীরালাল। এই দুইয়ের প্রভাবে শরীর আর অর্থ দুটোই পাল্লা দিয়ে ক্ষইতে থাকে। তারই শেষ পরিণতি আজকের এই কুলুঙ্গির গনেশের নীচে রাখা জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান। জীবনের অর্থ কমতে কমতে দশ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

—————————————–

বাইপাসটা যেখানে এসে কামালগাজীতে মিশেছে, সেইখানে একটা দাপনার ঘুপচি বাড়িতে থাকে হীরু। খোলা নর্দমা পেড়িয়ে রাস্তায় পরে হাঁটতে লাগল হীরালাল। দুপুর বেলার অটোগুলো পাশ দিয়ে জিজ্ঞাসু ভাবে চলে যাচ্ছে – প্রশ্নই ওঠে না ধরার। হাঁটতে হাঁটতে হীরু ঢালাই ব্রিজের মেট্রো স্টেশনে পৌঁছাল। দম দম গামী ট্রেন আসতে কুড়ি মিনিট সময় আছে এখনো।

“কোথায় যাবেন?” রুক্ষ ভাবে জিগ্যেস করলো কাউন্টারের ওইদিকের লোকটা

“যে কোন”

“যে কোন মানে? কোন স্টেশন যাবে?” মুহূর্তে সম্বোধন আপনি থেকে তুমি সম্বধনে নেমে এল

“ওই তো – দিন না – গড়িয়া”

“দশ বের করছেন কি? দেখছেন না এইটা এগজ্যাক্কট চেঞ্জ কাউন্টার? পাশের লাইনে যান”

আঙ্গুলের ফাঁকে ধরা জে সেভেন সিক্স টু থ্রি সেভেন সেভেন আর ওয়ান – মুচকি হাসল হীরালাল। জীবনের শেষ সম্বলের সঙ্গে আরও মিনিট দুয়েক কাটানো যাবে – তা মন্দ কি?

“একটা টাকা হবে?” পাশের কাউন্টারের লোকটি প্রশ্ন ছুড়ে দিল হীরুর দিকে না তাকিয়েই

“না দাদা, এই আছে – আর নেই”

কাউন্টারের লোকটি থাবা মেরে তুলে নিল হীরুর রাখা দশ টাকার নোট টা। এই ছিল এই নেই – হীরালাল মণ্ডলের শেষ সম্বল চলে গেল একটা টিনের কৌটোর ভেতর। মাত্র কয়েক হাত দূরে কিন্তু চলে গেল চিরতরে। কালো চাকতি টিকিট আর দুটো দু টাকার চাকতি সড়াৎ করে ছুড়ে দিল কাউন্টারের দাদা। টাকার চাকতির নম্বর থাকে না – আলাদা করে তাদের সঙ্গে আত্মতিয়তা হয় না। সিঁড়ি ধরতে গিয়ে হীরু দেখল কল্যাপ্সিবিল গেটের ওইদিকে কোলে একটি শিশুকে ধরে এক মহিলা ভিক্ষে করছে। হাত বাড়িয়ে টাকা দুটো তাকে দিয়ে দিল হীরু। ব্যাস – একদম বাঁধন মুক্ত সে

————————————————-

ওই দূরের বাঁকে ট্রেন আসছে দেখা যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে লোক প্রায় নেই বললেই চলে। গতকাল বিজয়া দশমী গেছে – ছুটির মেজাজ কাটেনি এখনো। হীরু স্লথ পায়ে প্ল্যাটফর্মের একদম ধারটায় গিয়ে দাঁড়ালো। ঢাকের আওয়াজ আসছে। কাছের কোন পাড়ার ঠাকুর বিসর্জন যাচ্ছে। “আসছে বছর – আবার হবে”। ট্রেনটা একদম প্ল্যাটফর্মের কাছে এসে পড়েছে।