রামনামী

Ramnami guru Mehtr Ram

Ramnami guru Mehtr Ram

এদের সমাজের নাম রামনামী। অস্পৃশ্য। বাস ছত্তিশগড়। এরা নিজেদের দেশে পরিত্যক্তই বলা যায়। এদের গ্রামের সন্ধান চাইলে কেউ দেখিয়ে দেয় না – চট করে কথার প্রসঙ্গ ঘুড়িয়ে ফেলে। কিম্বা স্রেফ না শোনার ভান করে। স্বাধীনতার আগে কিন্তু এরা পুরোপুরি গান্ধী ভক্ত ছিল। খুব আশা ছিলো এদের যে নতুন ভারতে নতুন ভাবে বাঁচবে – অস্পৃশ্যের তকমা আর তাদের থাকবে না। স্বাধীনতা এলো কিন্তু এদের দিন বদলালো না। বছর দশের ঘুরতেই রামনামীরা বুঝলো যে তারা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই থাকবে। বিদ্রোহ করলো রামনামীরা। ধর্ম বিদ্রোহ। হরিজন তারা – ভগবানের সন্তান, তাই ভগবান রামকেই বেছে নিল নিজেদের পরিচয় হিসেবে। রামের সন্তান বলে নিজেদের ঘোষণা করলো। তাদের রাম কিন্তু অযোধ্যার রাম নয় – তারা রামকে নিজেদের মতো করে তৈরী করে নিল| তৈরী করে নিলো নিজেদের রামায়ণ। এমনকি তাদের ধর্মগ্রন্থ রামচরিতমানসের প্রতিটি দোহার বিকল্প ব্যাখ্যা তৈরী করলো তারা। এই কি শেষ? নিজ সৃষ্ট ঈশ্বরের কাছে এই কি চরম আত্মসমর্পণ? না। ভগবান প্রদত্ত দেহটিকেও রামনামীরা অঞ্জলী দিল তাদের ভগবানের কাছে। সর্বাঙ্গে উল্কি করে আত্মস্থ করলো রামচরিতমানসের এক একটি দোহা। সূচ্যগ্র দেহপটও ছাড়া গেল না এই সমর্পণের মহালীলায়। পরের প্রজন্ম অবিশ্যি উল্কির ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়েছে। তাই এখন রামনামী সমাজে স্রেফ চারজন বেঁচে আছেন যাদের শরীর জুড়ে রামচরিত মানসের উল্কি!

রামনামীদের গল্প শুনছিলাম আমার আলোকচিত্রী বন্ধু জয়দীপ মিত্রের কাছে। চত্তিশগড়ের  মাটি ফাটা গরমে ঘুরে বাবু কয়েকদিন কাটিয়ে এলেন রামনামীদের গ্রামে। রামনামীদের নাম হয় – পদবী হয় না। নিজেদের মতো পদবী বেছে নেয় তারা। কেউ শর্মা, কেউ প্যাটেল কেউ মেহতা। একজন নাকি ব্যানার্জীও আছে! সকাল হলেই রামনামী সমাজে শুরু হয় গান আর নাচ। এক অদ্ভূত সুরে এরা রামচরিতমানস আবৃত্তি করে, রাম নাম লেখা একটা বিশাল চাদর গায়ে জড়িয়ে দুলে দুলে নাচে। মাথায় ময়ূরপুচ্ছের মুকুট!

আজকে সকালে সপরিবারে গিয়ে প্রজাধর্ম পালন করে এলাম – বোতাম টিপে ভোট দিয়ে। বোতাম টেপার সময় মনে পড়ে গেল – ছত্তিশ গড়ের জঙ্গলে রামনামীদের গ্রামে নিশ্চয় এখন সভা বসেছে – ময়ূরের পালক মাথায় পরে নেচে চলেছেন মেহতার রাম। নিজের মনে, নিজের সনে। তার সর্বাঙ্গে বিরাজ করছেন ঈশ্বর – গণতন্ত্রের ঈশ্বরে প্রয়োজন তাদের অনেক দিন হলো মিটে গিয়েছে।

পূঃ: ওপরে মেহতার রামের ছবিটি জয়্দীপের তোলা

Previous Post
Leave a comment

2 Comments

  1. খুব সুন্দর লেখা, সুব্রত, মনকে ছুঁয়ে গেল।
    সম্ভবত ১৯৮১ সালে এক ভ্রমণেই রামনামীদের এবং বস্তারের গোন্ডদের দেখি। রামনামীদের সম্বন্ধে প্রামাণ্য তথ্য খুঁজে পাইনি তখন। পরে একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখে কিছুটা জানতে পারি। গোন্ড গোষ্ঠির ঘোটুল নামের কৈশোরিক আবাস – যেখানে লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাইকে থাকতে হয় সামাজিক শিক্ষার খাতিরে আর ভবিষ্যতের সঙ্গী/সঙ্গিনী খুঁজে নেবার জন্য – দেখে মুগ্ধ এবং চমৎকৃত হয়েছিলাম, মনে পড়ে।

    Reply
  2. অনেক ধন্যবাদ স্যার – পড়ার জন্য, মন্তব্যর জন্য। গন্ডদের জানার স্পৃহা বাড়িয়ে দিলেন আপনি!

    Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: