ঘুষ

কম্পিউটার এর মনিটরটা বন্ধ করে চেয়ারটা ঠেলে দাঁড়াতেই রঞ্জনের মনে হল সব্বাই তার দিকে দেখছে। রঞ্জন বড়াল আজ সাত বছর হয়ে গেল আবগারি বিভাগে চাকরি করছেন। আবগারি মানে এক্সসাইস অ্যান্ড কাস্টমস। নির্ঝঞ্ঝাটের চাকরি – সকাল নটায় সীটে এসে বসা, ফাইল দেখা, দুপুরে অফিসের বেয়ারা উমেশকে দিয়ে পাশের গলির চাইনিজ দোকানের চাউ মিন, দিনে অন্তত তিন কাপ চা আর পাঁচটা বাজলেই কাজ গুটিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা – এই হোল রঞ্জনের দিন-নামচা। বাড়িতে রঞ্জনের বউ আর বছর পাঁচেকের ছেলে। ছোট্ট ছিম ছাম সংসার। কিন্তু আজকেই সব কিছু গড়বর।

আজকে রঞ্জন জীবনে প্রথম ঘুষ নিয়েছে।

ব্যাপারটা সামান্যই। কলকাতা শহরে আর মদের দোকানের পারমিট দেয়া হয় না। তবে পুরনো পারমিট যাদের আছে তারা অনেক সময় পারমিট বেচে দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে মদের দোকান চালানোটা একটু দৃষ্টিকটু লাগে হয়েত! কিন্তু কোর্ট কাছারি করে সেই পুরনো পারমিটে একখানা নতুন সীলমোহর লাগাতে পারমিট ক্রেতাকে আসতে হয় এই আবগারি বিভাগে। গত একমাস ধরে পাইকপাড়ার এক মদের দোকানী ঘুরে চলেছেন এই সীলমোহরের জন্যে। ওনার কেনা পারমিটটি বহু পুরনো – সেই ফাইল খুজে, ঘেঁটে বের করতেই অনেক সময় গেছে। আজকে রঞ্জন অন্তত জানতে পেরেছে যে পুরনো ফাইলটা আছে – হারিয়ে, পুড়ে যায়নি। আর দিন তিনেকের মধেই বাকি কাজ হয়ে যাবে। এইটে যেই না রঞ্জন দোকানের নতুন মালিককে বলেছে অমনি লোকটা একটা ব্রাউন পেপারে মোড়া এক ইঞ্চি মোটা একটা প্যাকেট রঞ্জনের সামনে রেখে বললেন “এইটা রাখুন স্যার। প্লিজ, না বলবেন না। আপনি যে আমার কত উপকার করলেন স্যার”। নিচু, গদগদ স্বরে এইতুকু বলেই লোকটি হাথ জোড় করে নমস্কার করে হাওয়া। ঘটনাটার জের কাটতে সময় লাগল রঞ্জনের। কিংকর্তব্যবিমুরহ হয়ে বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল প্যাকেটটার দিকে। সবুজ রবারব্যান্ড দিয়ে দুই প্যাঁচে আটকান। গোটাগোটা অক্ষরে লেখা “ফোর  মিস্টার এল কে আদক” – যদিও যিনি রেখে গিয়েছেন তার নাম আদক নয়। খামের নীচে বাঁ দিকে একটা ঠিকানা – পাইকপাড়ার। নির্ঘাত ওই লোকটার অন্য কোনও ব্যবসার। ঘণ্টা খানেক জবুথবু হয়ে বসে থাকার পর এক কাপ আদা চা খেয়েই রঞ্জন ঠিক করে নিল – যা থাকে বরাতে, নিয়ে নেবে সে টাকাটা। সরকারি মাইনে আর কততুকুই তার – আর জিনিষপত্রের দাম তো সরকারি-বেসরকারি দেখে বাড়ে না! না হয় কুন্তলার জন্যে একটা দামি শাড়িই কিনে নেবে টাকাটা দিয়ে – আগামী ছাব্বিশে বৈশাখ রঞ্জনের বিবাহ বার্ষিকী।

“চললেন নাকি রাঘব বড়াল? আজকে খানিক আগেই বেরচ্ছেন যে? কোনও স্পেশাল প্ল্যান আছে নাকি?” ইন্সপেকশনের রায়বর্মণ মাথা তুলে জিগ্যেস করলো। ঠোঁটের কোণে হাল্কা কেন? রায়বর্মণের টেবিল খুব দূরে নয় – তবে কি ও শুনতে পেয়েছে কথাগুলো?

“নাহ, শরীরটা খুব জুতের লাগছে না”।

“দেখো হে, সিজিন চেঞ্জের সময় – সাবধানে থেকো। পথে যেতে যদি কোনও খদ্দেরের দোকান পাও তবে ঢুকে এক ঢোঁক মেরে দিলেই দেখবে অনেক ভালো লাগছে। হে হে হে”।

রঞ্জন মদ খায় না। তবে এইটা ঠিক যে দুপুর থেকেই – মানে খাম পাওয়ার পর থেকেই মাথাটা ঢিপ ঢিপ করছে। শরীর খারাপটা স্রেফ অজুহাত নয়।

পাঁচতলার আফিস থেকে রঞ্জন সিঁড়ি ভেঙ্গেই নামে। দিব্বি লাগে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নামতে – মাঝের ফাঁকটা দিয়ে দেখা যায় কারা উঠছে নামছে। আজকেও রঞ্জন লিফট না ধরে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করলো। চারতলায় পৌঁছাতেই গলা বাড়িয়ে দেখতে পেল দু জন উর্দি ধারী পুলিশ সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে আসছে ওপরে। চরাং করে মাথায় শক খেলে গেল রঞ্জনের। রেইড! মুহূর্তের মধ্যে সব্বাইকে আফিসে আটকে রেখে পকেট, ব্যাগ, দেরাজ খানাতল্লাশি চালাবে এরা। আর রঞ্জনের হাথে ছোট্ট ফলিও ব্যাগে রয়েছে এল কে আদক মার্কা এক ইঞ্চি পুরু টাকার খাম। মানে ধরা পড়া ও শ্রীঘর। নিজের ছেলের কাছে মুখ দেখাবে কি করে রঞ্জন? চটজলদি ঘুরে গিয়ে রঞ্জন লিফটের বোতামটা টিপে দিল। পুলিশ আছে এক আর দোতলার মধ্যে – তার ভেতরে রঞ্জনকে সটকে পড়তে হবে অন্য পথে। ঘড়ঘড় শব্দে পেল্লায় গ্রিলের দরজা ওয়ালা লিফট হাজির হোল। দৌড়ে ঢুকে পরে হাঁপাতে লাগল রঞ্জন বড়াল। চৈত্রের গরম খুব তেমন না – তবুও বেশ বুঝতে পারল শিরদাঁড়া বেয়ে ঘামের ফোঁটা গেঞ্জি ছাপিয়ে শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে।

রাস্তায় বেড়িয়ে অনেক ভালো লাগতে শুরু হোল রঞ্জনের। বিকেলের হাওয়াটা মন আর শরীর, দুইই চাঙ্গা করে তুলল। রঞ্জন মেট্রো ধরবে – আপিস থেকে মহাত্মা গান্ধী রোড স্টেশন অবধি অন্য দিন অটো ধরে রঞ্জন – আজকে ভাবল হাঁটা যাক, মনটা স্থিতি হবে খানিক। কোনার পানের দোকান থেকে একটা গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে মানুষ আর ফুটপাথে বসা ব্যাপারির পসরা বাঁচিয়ে হাঁটা দিল রঞ্জন। কত টাকা হবে, খামটাতে? কত টাকার নোটে ঘুষ দেয় লোকে? হাজার না পাঁচশো? একশর তো আকজের দিনে কোনও দামই নেই। বেশ মজা পেল রঞ্জন মনে মনে হিসেবটা কষতে। ধরা যাক হাজারের নোট আছে। কটা হাজারের নোট রাখলে এক ইঞ্চি খানেক উঁচু হবে? একশ? মানে একশ ইনটু হাজার টাকা এখন রঞ্জনের ফলিও ব্যাগে ওই অঙ্কের টাকা? খুব ইচ্ছে করছে রাস্তায় কোথাও বসে টাকাটা গুনে নিতে। নিরাপদ হবে কি? কাউকে কখনও তো রঞ্জন দেখেনি রাস্তায় বসে টাকা গুনতে। কোনও রেস্টুরেন্টে বসা যায় বটে, কিন্তু রঞ্জনের একা একা রেস্টুরেন্টে যাবার অভ্যাস নেই। মনে মনে হিসেব কষাটাই বেশ – রঞ্জন আজকে পথ হাঁটার একটা অদৃশ্য সঙ্গী খুঁজে পেয়েছে!

ট্রেন আসতে মিনিট পাঁচেকের দেরি। রঞ্জন আজকে ফলিও ব্যাগটাকে ভালো করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে – অন্যান্য দিনের মত বগলের নীচে চেপে রাখেনি। আঁকড়ে রাখার কারণ আছে। মেট্রোতে ঢুকে রঞ্জন একটা বিশেষ থামের পাশে দাঁড়ায় – বরাবর। জায়গাটা ট্রেনএর মাঝামাঝি পড়ে, যেই কামরা গুলোতে বিশেষ ভিড় হয়েনা। আজকে সেই থামের নীচে দাঁড়ানোর একটু পরেই রঞ্জন খেয়াল করলো একজন লোক – মাঝারি হাইট, কদম ছাঁট চুল, একটু নোংরা গোল গলা টি শার্ট আর কালো প্যান্ট – তাকে আড়চোখে নিরীক্ষণ করে চলেছে। লোকটাকে যেন কোথায় দেখেছে রঞ্জন। বিদ্যুতের মত মনে পড়ে গেল – পানের দকানে সিগারেট কেনার সময়। লোকটা দাঁড়িয়ে হিন্দিতে পানওয়ালার সাথে কথা বলছিল। এই ধরনের লোকেরা রঞ্জন শুনেছে বিহার ইউ পি থেকে আসে আর ছিনতাইবাজ হয়। শিকারি বেড়ালের ঘ্রাণ শক্তি এদের – হয়েত বুঝতে পেরেছে রঞ্জনের কাছে মাল আছে।

ট্রেন এ উঠে বসতে পেয়ে গেল রঞ্জন। কদম ছাঁটও রঞ্জনের কামরায় উঠলো – দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে হ্যান্ডলে হাথ রেখে। চোখে চোখে রাখতে হবে একে, ভাবল রঞ্জন। “আগামী স্টেশন সেন্ট্রাল, প্ল্যাটফর্ম ডানদিকে … আগলা স্টেশন সেন্ট্রাল …” বেজে উঠলো প্রতিদিনের শোনা ঘষিকার কণ্ঠস্বরের চেনা শব্ধগুলো। রঞ্জন যাবে কবি সুভাষ – মানে গড়িয়া বাজার, কলকাতা শহরের দক্ষিণ শহরতলিতে – প্রায় প্রান্তিক স্টেশন। সেন্ট্রাল স্টেশনে রঞ্জনের কামরায় এক দঙ্গল কমবয়েশি ছেলে উঠলো। এদের কারুর মাথায় গান্ধী টুপি, তাতে কালো দিয়ে লেখা “ইন্ডিয়া আগাইনস্ত করাপশন”। রঞ্জন জানে এদের ব্যাপারে – সারা দেশ জুড়ে চলছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আর দেশের কমবয়েশি ছেলে মেয়েরা ভিড়ে পড়েছে সমাজের সুদ্ধিকরণে। এরা সভা করে, মিছিল করে, দুর্নীতিকে খোলসা করে লোকের সামনে ধরে সমাজের পরিবর্তন করতে চায়। সাধারন লোকও ভীষণ সমর্থন করে এদের। কয়েকটি ছেলে এসে দাঁড়ালো রঞ্জনের সামনে।

“কি বলছিলি বল। ইনকাম ট্যাক্সের আফিসের ব্যাপারে? ট্রেন আসায় শোনা হোল না”, একজন ছেলে অন্য একজনকে বলল

“ও, দারুন মজার ব্যাপার। ইনস্পেক্টরগুলো কি করে জানিস? দেরাজের অর্ধেক করাত দিয়ে কেটে ফেলে ফাঁকা জায়গার নীচে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট বসিয়ে রাখে। তুই ধর ঘুষ দিলি – লোকটা চট করে টাকাটা দেরাজে ঢুকিয়ে ঠেলে দেবে। টাকাটা আর দেরাজে থাকবে না, গিয়ে জমবে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটএ!”

“হা হা হা … দারুন কেস। এইটা জানতুম না। তারপর কি করলি?”

“আমার বাবার ফাইল ছিল। প্রতি সপ্তাহে ঘুরিয়ে চলেছে আমাকে। পরিষ্কার বুঝতে পারছি ঘুষ চাইছে – দিলেই ছেড়ে দেবে ফাইলটা। একদিন দুপুরে গেলাম, খামে টাকা ভরে। কথায় কথায় বাড়িয়ে দিলাম টেবিলে আর লোকটাও একদম ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে দেরাজে। তারপর এইটা ওইটা বকতে লাগল – এই নেই সেই নেই কিন্তু তবুও সে নিজের তাগিদে ফাইল পাস করিয়ে দেবে – এই সব। এর মধ্যে আমি হটাত বললুম ‘স্যার, মুখের চুইং গামটা দাঁতে আটকে যাছে। আমার রুট কানাল করা দাঁত – কষ্ট হচ্ছে। একটু ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট টা দেবেন, ফেলে দেবো?’ যেই বলা, লোকটার মুখ চোখ পুরো লাল। প্যানিক! ধারনা করতে পারবি না কি হাল হোল!”

“দিস পিপেল শুড বি টট আ লেসেন। পাবলিক ফ্লগিং হওয়া উচিত এই সব লোকদের”, অন্য ছেলেটা বেশ গম্ভীর হয়ে বলে উঠলো। “দিস ইজ নো লাফিং ম্যাটার”

নতুন ট্রেনের বাতানকুল কামরা হলেও রঞ্জন ফের পিঠে ঘামের আবির্ভাব বুঝতে পারল। এতদিন রঞ্জন বুঝতে পারত না কেন তার পায়ের কাছে রাখা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটটা মাঝে মাঝেই বেপাত্তা হয়ে যায়। আর নতুন এনে দিতে বললেই উমেশ মুচকি হাসি হাসে কেন। ইনকাম ট্যাক্সের রীতি যে আবগারি বিভাগেও চলবে এইটে আর তেমন কি ব্যাপার।

গাড়ি টালিগঞ্জ ছাড়িয়ে এখন পাতাল থেকে বেড়িয়েছে। অন্ধকার হয়ে গেছে, রাস্তার আলো, ট্রেন লাইনের পাশের বাড়িগুলোর আলো – সব জ্বলে উঠেছে। কোলের ওপর রাখা, হাথ দিয়ে চেপে ধরে থাকা ফলিও ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে হটাত রঞ্জনের খেয়াল হোল – আচ্ছা, পাইকপাড়ার মদের দোকানী এই টাকাগুলো পেলো কোথা থেকে? নিশ্চয়ই ক্রেতাদের টাকা। রঞ্জন মদ খায় না, কিন্তু মদে ভেসে যাওয়া অনেক সংসারের কথা জানে। যাদের এই টাকা তারা কি মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে বউদের মারে? কুন্তলার মুখাটা মনে পড়ে গেল রঞ্জনের। কি ধরনের দোকান এই পাইক পাড়ার লোকটার? ভদ্রলোক বেশি যায় না দিনমজুরি পাওয়া লোকেরা? বাড়িতে বউরা হয়েত অপেক্ষা করে থাকে টাকা আনলে বাজার হবে বলে আর এদিকে বাবু মদে চূড় হয়ে ঢোকেন বাড়ি। প্রশ্ন করলেই কিল চড় লাথি জোটে বউয়ের কপালে। মনটা বিষিয়ে উঠলো রঞ্জনের। পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল একশ ইনটু হাজারের হিসেবটা। অত ভেবে লাভ নেই। এই যে সীটে বসে আছে রঞ্জন সেই সীটে আগে যে বসেছে সে হয়েত খুনি বা গাড়ি চোর – তার খবর তো আর রঞ্জন রাখে না। তবে এই টাকা কার এই নিয়ে ভাবা কেন?

গড়িয়াতে নেমে অটোর লাইনে দাঁড়ালো না রঞ্জন। একটু পেছনে হেঁটে গেলে অনেক সময় খালি অটো তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়। বলতে বলতেই একটা অটো এসে পড়ল – ড্রাইভার মাথা বার করে নরেন্দ্রপুর নরেন্দ্রপুর বলে ডাকছে। পেছনের সীটে গা এলিয়ে একটাই লোক বসে। দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়ল রঞ্জন। অটোটা দাঁড়িয়ে পড়ল বাকি সওয়ারি তুলবে বলে। কিছুক্ষণ সময় লাগবে ভর্তি হতে – পরের ট্রেন এলে লোক হবে। হটাত রঞ্জনের পাশে বসা লোকটি চিৎকার করে অটোর ড্রাইভারকে গালমন্দ করতে শুরু করে দিল। ছাপার অযোগ্য কুৎসিত ভাষা – আর ভক ভক করে দেশী মদের গন্ধ! আদি গঙ্গার আবর্জনার পচা গন্ধ আর এই মদের দুর্গন্ধ দুই মিলে রঞ্জনের যেন অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার জোগাড়। এর মধ্যে ড্রাইভার তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে চলে এসেছে – একটা হাতাহাতির আরম্ভ হবার অপেক্ষা। কোনও লোক আর এই অটোর দিয়ে আসছে না। রঞ্জনের মাথা ঘুরতে শুরু করলো – এ কি হচ্ছে আজকে? সেই দুপুরবেলা এল কে আদক মার্কা খাম পাওয়া থেকে শুরু হয়েছে। আর পারছে না রঞ্জন – একটা ভারি পাথর যেন কেউ তার মাথায় বসিয়ে দিয়েছে। ঠিক করে ফেলল রঞ্জন – নেমে পরবে। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পা জড়িয়ে গেল ওর – হুমড়ি খেয়ে রাস্তায় পড়ে যাচ্ছিল আর একটু হলেই – একজনকে ধরে নিজের ভারসাম্য ধরে ফেলল রঞ্জন। আর নয় – শান্তি চায় এখন সে। আদি গঙ্গার খালের ওপর ব্রিজটার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ফছাত করে ফলিও ব্যাগটার জিপ খুলে খামটা বের করে ফেলল। একটু ঝুঁকে খালের জলে বিসর্জন দিল রঞ্জন তার বিকেলের একশ ইনটু হাজারের হিসেব – আর ভেবে রাখা ইতিউতি কিছু পরিকল্পনা। ঝুপ করে পড়ে গেল খামটা জলের মধ্যে। অন্ধকারে কয়েকটা বুড়বুড়ি দেখতে পেলো যেন রঞ্জন। খানিক জলতরঙ্গের পর খালের জল আবার শান্ত – যেমন ছিল তেমন।

“ইষ্টিকুটুম দেখছ না যে বড়?”, মহামায়াতলার দু কামরার ফ্ল্যাটে ঢুকে জুতো খুলতে খুলতে কুন্তলাকে জিগ্যেস করলো রঞ্জন। টি ভি তে একটা ইংরেজি চ্যানেলের খবর হচ্ছে।

“ঘুরোতে ঘুরোতে দেখলাম গো – কারা যেন গোপন ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে এক আমলাকে ঘুষ নিতে ধরেছে! সেই দেখাচ্ছে। কেতা কেতা নোট গো – আমার খুব লোভ হচ্ছিলো সে তুমি যাই বল না কেন। আমাদের যে কেন কেউ ঘুষ দেয় না!”

“হুহ, ঘুষ দেয়াও যেন অত সহজ আর নেয়াও যেন জলভাত। ছাড় ওই সব। চায়ের জল বসাও দেখি – আমি চট করে গা ধুয়ে আসছি। আজকে কি হোল তার গপ্প শোনাবো”।

Leave a comment

5 Comments

  1. এই অবধি হিসেব মিলছে কিন্তু তার পর? সংস্কৃতে ‘এহ বাহ্য, অতঃ কিম?’

    Reply
    • তার আর পর নেই স্যার। এটা একটা হরিপদ কেরানীর জীবনের কয়েক ঘন্টার ছবি – একটু আলাদা একটা দিনের। ঘুষের ঘটনাটা কমফোর্ট জোন থেকে বের করে দিয়েছিল। ফের কমফোর্ট জোনে ঢুকে পড়তেই দাড়ি টেনে দিলাম।

      Reply
      • এর আর পর থাকলে গল্পটা বোধহয় জমতনা। ছোটগল্প কোথায় শেষ করতে হবে সেটা বোঝাও একটা আর্ট। ভাল লাগল পড়ে।

      • অনেক ধন্যবাদ!

  2. বাঃ, বেশ ফুরফুরে একটা বাতাস বয়ে গেল মনে, ঠিক আপনার ব্লগের নামটির মতন।🙂

    Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: