ঠাকুমা

“দারুণ হয়েছিল ছবিটা – সব্বাই কেমন সটান তাকিয়ে ক্যামেরার দিকে। হাসছে সব্বাই। কিন্তু এই দারুণ ছবিটাকে ঝোলানর জন্যেই কি অপেক্ষা করছিলে ঠাকুমা? নইলে অমন মোক্ষম সময়ই বেরতে হল ঘর থেকে?”

সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে অল্প একটু ফুলের কেয়ারি। কেয়ারির গা ঘেঁষে একটু দুরেই রান্নাঘর। রান্নাঘরের দুই পাশে স্নান ঘর আর কয়লা, কাঠ রাখার ঘর। কেয়ারির উল্টো দিকে, মানে সদর দিয়ে ঢুকে ডান দিকে চার ধাপ সিঁড়ি ভাঙলেই একটা লম্বা দাওয়া। আজকের দিন হলে লোকে দিব্বি এইটিকে প্যাঁটিও বলে চালিয়ে দিত। চলটা ওঠা সিমেন্টের মেঝে – ইতস্তত কয়েকটা চেয়ার ছড়ান। তাদের একটার সাথে অন্যটার কোন মিল নেই। আর রয়েছে একটা জুতোর তাক – শু র‍্যাক। দাওয়ার লাগা তিনটে দরজা – মানে তিনটে ঘর। একদম বাঁ পাশেরটা শোবার ঘর আর মাঝখানেরটা বৈঠক খানা। শুনতেই অমন জলসাঘর মার্কা লাগে, আদতে কিন্তু স্রেফ তিনটে কাঠের সোফা পাতার মত জায়েগা – আর একটা শো কেস। দাওয়ার একদম ডান দিকের ঘরটা ঠাকুমার। উঁকি দিলে প্রথমেই দেখা যায় ঠাকুরের আসন। তাতে অনেক দেবতা দেবীরা একে পরস্পরের গা ঘেঁষে বিদ্যমান। সরস্ঘবতী ছবিটা সব থেকে বড়।ঘররের এক কোণে একটা উঁচু খাট। ঠাকুমা ওতে ঘুমন।

ক্যামেরাটা মামার। রাশিয়ান। সদ্য কেনা, এবং এক রীল সাদা কালো ফিল্ম ভরা হয়েছে। আর একটা ছবি তুললেই ছত্তিরিশ – মানে রীল শেষ আর স্টেশন রোডে এস বি স্টুডিওতে ডেভেলপ করতে দিয়ে যাওয়া যাবে। আলাদা করে দুই ভাই, তাদের দুই মার, দুই বাবার – বিভিন্ন কম্বিনেশনে ছবি তোলা হয়ে গিয়েছে। বাকি একটা গ্রুপ ফোটো। মামা নেমে গিয়েছেন দাওয়ার নীচে, আর চেয়ার মেঝে মিলিয়ে তৈরি বাকি পরিবার। সটান ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সবাই। ডানদিককে একটু ভেতরে এনে, সবাইকে তাদের সেরা হাসি বের করার কড়া হুকুম দিয়ে খছাত করে শাটার পড়ার সাথে সাথে সেই ঘটনাটা ঘটল যেইটার সবার ভয় ছিল। নিজের ঘর থেকে ঠাকুমা বেড়িয়ে এলেন। আশির কাছে বয়েস। সেমিজ আর সাদা থান পড়নে – চৌকাঠ ডিঙ্গনোর জন্যে কাপড়টা হাঁটুর কাছে তোলা। বেড়িয়েই ছবি তোলার দৃশ্য দেখে একটু অবাক ভাবে ক্যামেরার দিকে তাকানো। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। একটা হাথ হাঁটুর ওপর। বেঁকে যাওয়া শিরদাঁড়া খানিক সোজা কৌতূহল ভরে। একটা সম্মিলিত আওয়াজে ঠাকুমা বুঝলেন যে তিনি বেশ গর্হিত কোন কাজ করে ফেলেছেন।

একগাদা চার ইঞ্চি বাই ছয় ইঞ্চি প্রিন্ট করা ফটোগ্রাফের মধ্যে এই ছবিটা হাথে নিয়ে অমিত বলে উঠল “দারুণ হয়েছিল ছবিটা – সব্বাই কেমন সটান তাকিয়ে ক্যামেরার দিকে। হাসছে সব্বাই। কিন্তু এই দারুণ ছবিটাকে ঝোলানর জন্যেই কি অপেক্ষা করছিলে ঠাকুমা? নইলে অমন মোক্ষম সময়ই বেরতে হল ঘর থেকে?”

“বুঝি নাই ভাই। বুঝলে যাইতাম না”, ছোট্ট জবাব দিয়েছিলেন ঠাকুমা

—————————————————————————————————-

“আর কোন ছবি নেই? এই ছবিটা থেকে এনলারজ করে মুখ বের করতে গেলে দাদা প্রচুর পিক্সেল এসে যাবে। অন্য কোন ছবি আছে কিনা দেখুন না?” স্টুডিয়োর মালিক ফটোটা মন দিয়ে দেখে বললেন অমিত সেনকে। “বলছেন বিখ্যাত মানুষ অথচ এই একটাই ছবি?”

“বিখ্যাত তো বটেই। টাউনে বিদ্যুৎ আসেনি তখনও। হ্যারিকেন নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের পড়াতেন। সেই পয়সায় সংসার চালাতেন আর কিছু জমাতেন মেয়েদের জন্যে স্কুল খুলবেন বলে। আমার ঠাকুমা। ওনার জীবনের ওপর একটা প্রবন্ধ লিখছি। কিন্তু এই গ্রুপ ছবিটা ছাড়া তো আর কোন ছবি নেই”।