আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে

সৌম্য ব্যানার্জি এখন কি করছে জানি না তবে সেইদিন দুপুরে আমার সঙ্গে ব্যাটিং করছিল।

ইন্ট্রা কলেজ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সেমি ফাইনাল। আমাদের থার্ড য়িয়ার বনাম কচি কাঁচাদের ফার্স্ট য়িয়ার। পঁচিশ ওভারের খেলা হতো। উত্তেজনা থাকত বেশি, আয়োজন তার চেয়ে ঢের কম। শীতের নরম দুপুরের রোদে ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় জমত খেলার মাঠে। আম্পায়ার নিরপেক্ষ – যে দল খেলছে না তাদের থেকে দুজন। স্কোর রাখা নিয়েই হত মুশকিল। যুধ্ধুমান দুই দলই নিজেদের স্কোরার বসাতো – যাতে কারচুপি না হতে পারে। সেই প্রথম আমি স্কোরে জল মেশানো ব্যাপারটা জেনেছিলুম (পরে সেই পদ্ধতিতে বার্ষিক সেলস কোটায় জল মেশাতে চেষ্টা করেছি – উইথআউট এনি সাকসেস)

যাক, ম্যাচের কোথায় ফেরা যাক। পুটকেগুলো প্রথমে ব্যাট করে বেশ বেধরক ঠেঙিয়ে গুচ্ছের রান বাগিয়ে বসলো। সব থেকে বেশি প্যাদানি খেয়েছিল আমাদের লীড পেসার – সৌম্য ব্যানার্জি। ওর বোলিং তো মার খেয়েছিলই – তার থেকে বেশি মার খেয়েছিলো ওর প্রেস্টিজ। সবে কেমিস্ট্রির রেশমীর সাথে প্রেমটা অঙ্কুরিত হচ্ছে – বাস স্টপ থেকে বাড়ির দুয়ার অবধি এগোনোর সাহস সঞ্চয় হয়েছে। সেই রেশমী বাউন্ডারির বাইরে বসা আর তার সামনেই ফার্স্ট য়িয়ারের ছোড়া কিনা পর পর তিন বলে তিন চার চাবকে দিল? আর করবি তো কর বল করতে নেমে পটা পট আমাদের চার ব্যাটসম্যান নামিয়ে দিল সামান্য রানের বিনিময়? প্রেস্টিজ তখন রালি সিং এর ফালুদার মত কুচি কুচি।

আমি বরাবরই সর্ব ঘটে কাঠালির মত – স্লিপে ফিল্ডিং, হালকা স্পিন বল আর মিডিল অর্ডার নুন আনতে পান্তা টাইপ ব্যাট। আমার ওপর কিনা এসে বর্তালো এই রানের মহাসাগর পার। তবে কিনা আমিও তখন খানিক দেস্পো। থার্ড য়িয়ার হয়ে গিয়েছে, মেয়েরা স্রেফ এসে আঁক কষিয়ে ফুটে যায় – বেশ বুঝতে পারছিলাম ওই এক্সট্রা কারিকুলারএর ছিপেই খেলিয়ে তুলতে হবে কিছু একটা। এন্ড হওয়াই ওয়েস্ট সাচ এন অপ্পরচুনিটি? ক্রিকেটে দলের পিঠে দেয়াল – সামনে ফাইনালের হাতছানি আর রানের পাহাড়। এদিকে হাথে উইকেট বেশি নেই। পরে অবিশ্যি ওই একই থিমে আমির খান গ্রেসী সিংহ আর এক মেমসাহেবকে এক ছিপে গেঁথে তুলেছিল। তবে সেইদিন কলকাতার বুকে চলছিল মহারণ। আমি যত পাগলা মনটাকে বেঁধে মন দিয়ে খেলার চেষ্টা করি, সৌম্য ততই “ফাইট” “ফাইট” বলে প্রায় প্রতি বলের পরেই বক্সারের মতো হাথ ছোড়ে। বাঁকা চোখ রেশমীর দিকে। যাই হোক, কিছু কোদাল চালিয়ে, কিছু তানপুরা বাজিয়ে আমরা রান সংগ্রহে মন দিলাম।

এইবারে স্কোর রাখার ব্যাপারটা বলি। আমাদের হয়ে স্কোর রাখছিল শুভাশীষ। উঠতি গায়ক। কলেজ ফেস্টে মাইক খোলা পেয়ে গিটারিয়া দেবুকে বার খাইয়ে হয়েত তোমারি জন্য গেয়ে দারুন নাম করেছে। আর ওদের – মানে ফার্স্ট য়িয়ারের হয়ে স্কোর রাখছিলো অর্পিতা। শুভো আর অর্পিতা দুজনেই বাগবাজার অঞ্চলে থাকে – সুভোর পুরোদস্তুর নজর আছে অর্পিতার ওপর। স্কোর রাখা হত খাতায় আর একটা ওভার শেষ হতেই – বা দরকার পড়লে তার মধ্যেও – চিত্কার করে স্কোর বলা হত খেলোয়ারদের জন্যে। “আর বাকি দশ ওভার, দরকার সত্তর রান” – এই ধরনের। সুভাশিষের গানের গলা (গণসঙ্গীত নয়) – তাই অর্পিতার গলাটাই পাচ্ছিলাম বেশি। ব্যাট করতে করতে তো আর রান গোনা যায় না, কিন্তু যতই ঠেঙিয়ে রান তুলি না কেন, আস্কিং রেট্ যেন আর নামতে চায় না। আর সৌম্যও ফাইট এর ডেসীবেল বাড়িয়ে তুললো। কিন্তু সেই যাই হোক, শেষ রক্ষা হলো না। ঠিক মনে নেই, কিন্তু এই খানিক দশ বারো রানে আমাদের হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেল ফার্স্ট য়িয়ার।

কিছুদিন পরে ফাইনালের দিন জানতে পারলাম এই স্ক্যাম অফ দ্য সেঞ্চুরি র ব্যাপারে (নব্বই’এর দশক, তাই সেঞ্চুরি সম্বন্ধে একটা ভালো ধারণা হয়ে গিয়েছে। এই স্ক্যাম বোফর্স কেও হার মানায়) প্রথম সন্দেহ হলো অর্পিতাকে স্কোর রাখতে না দেখে। আমার বাড়ির গলিতেই থাকে ফার্স্ট য়িয়ারের সুগত – লাড্ডু নামেই বেশি পরিচিত। চেপে ধরলুম আর লাড্ডু হড় হড় করে উগরে দিল সেই কারচুপির গপ্প। সেইদিন দুপুরে আমাদের ব্যাটিং শুরু হতেই নাকি অর্পিতা সুভাশীষদার প্রতি প্রেম রসে চুপচুপে কিছু মান্না দের গান শুনতে চেয়ে আবদার করে। কেন শোনাবে না শুভো? ঘাড় একটু সোজা করে চোখ বন্ধ করে শুভো গান ধরলো “ঘর ও সংসার সবাই তো চায়” ও পরে “লতিতা ওকে আজ চলে যেতে বলনা” র মত কালজয়ী গান। প্রেমরসে ভারী হয়ে উঠলো পরিবেশ। এর মধ্যেই সৌম্য মারলো এক অনবদ্য কভার ড্রাইভ – হাক পাক করে দৌড়ালাম তিন রান। শুভ গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো “কত হলো?” “এক রান শুভদা, তুমি গানটা শেষ কর দেখি!”, বলল অর্পিতা। এই ভাবেই চলল স্কোর রাখা। সৌম্য’র ফাইট কে তলিয়ে চলছে “তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছ, দিত পারনি” – ঠিক যেন বানর আর তৈলাক্ত বাঁশ। শেষে যখন “যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে ধুয়ো লাশ আমার লাল পানি দিয়ে” তখন আমাদের অবস্থা সেই বটগাছতলায় দেবদাসের মত। খেল খতম।

গত কাল ইহলোক ত্যাগ করেছেন মান্না বাবু – ওনার গান আমাদের ডুবিয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগেই!

Previous Post
Leave a comment

5 Comments

  1. Rajsekhar

     /  October 25, 2013

    Boss golpo ta emni bhalo phendecho but 90 doshoke Manna dey er ganer oto romroma chilo na je ta diye premer jwal bona jabe ar keu dubbe. Borong Oi Kumar Sanu, Anu Malik bolle mene jewa jeto. Manna de ke ante gele 70-80 korte hobe, kajei Manna dey er golpo ta te kono role nei

    Reply
    • কি বলছ ভায়া? নব্বই এর দশকেও ক্লাসি প্রেম মান্নার ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটত। কুমার শানু তো ভাই বাজত আমাদের লেক টাউনের জয়া সিনেমার আশেপাশের প্রেমে!

      Reply
  2. Raj Sekhar

     /  October 26, 2013

    Are dada tomake bollam heading ta change koro. 90 er doshoke Manna kothay?

    Reply
  3. Rajsekhar

     /  October 26, 2013

    Dada tumi Manna bhokto tai bolcho…. Sei kishore kumar mara gelen ar Sanu elen 42 love story, tarpor sei banglay kne bnole thnakuma tomar…. Ekdom kan jhala pala case. Manna 90 doshoke jader mone prem borshon korechilen tader class ache bolte hobe🙂

    Reply
  4. দারুণ, অনবদ্য🙂 শেষটা খাশা হয়েছে🙂🙂 ।

    Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: