চশমান্বেষী

choshmaপুজোর উপন্যাস লেখা সমাপ্ত হইয়াছে – গত সপ্তাহে প্রকাশকের জিম্মায় ছাড়িয়া হাঁফ দিয়া বাচিয়াছি। আজকাল অকালবোধনের কতটা প্রাক্কালে কে পূজাবার্ষিকী প্রকাশ করিবে তার জমজমাট রেষারেষি শুরু হইয়াছে। বাঙালি পূজা মন্ডপে পূজার নুতন লেখার পর্যালোচনা করিতে পারিবার অঢেল সময় পায়। ব্যোমকেশের হাতে কোন বড় কাজ নাই। সরকার বাহাদুরের পুলিশ অত্যন্ত পারদর্শিতার সহিত দুশমন দমন করিতেছে – ব্যোমকেশ কে বিরক্ত করার কারণ তাহাদের ঘটে নাই। ব্যোমকেশকে কয়েক মাস পূর্বে ইষৎ তিক্ততার সহিত সাধারণ নাগরিকের পুলিশ ভক্তির কটাক্ষ করিতে শুনিয়াছি। তবে গত হপ্তায় বার দুয়েক ব্যোমকেশের ফোন আসে এবং ও দিনের বেলায় বেশ কিছুক্ষণ বাড়ির বাহিরে কাটায়। আমার অসমাপ্ত উপন্যাসের নায়ককে সংসারের জটিল ও কুটিল পথ হইতে সিধে রাস্তায় অবতরন করাইতে ব্যাস্ত থাকায় আমার ব্যোমকেশের সঙ্গ দেয়া হয়ে ওঠে নাই। এদিকে কলকাতা শহরে গত তিন দিন ধরিয়া অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হইয়াছে – পথ ঘাট কর্দমাক্ত। তাই বিশেষ দরকার ছাড়া গৃহের বাহিরে যাইবার তাগিদও অনুভব করি নাই। সত্যবতীও খিচুরী, ডিম ভাজা, বেগুনি ইত্যাদি লোভনীয় খাদ্য সামগ্রী পর্যাপ্ত পরিমানে রান্ধিয়া আমাদের গৃহে থাকিবার কারণের পাল্লা ভারী করিয়া তুলিয়াছে। তদসত্তেও ব্যোমকেশ বার দুয়েক ছাতা বগলে করিয়া বাহিরে গিয়াছে। প্রথম দিন সত্যবতী জানিতে চাহিয়াছিল কি এমন কর্ম ব্যোমকেশের যাহা না সম্পন্ন করিলে মহাভারত অশুদ্ধ হইবে তবে সঠিক কোন জবাব না পাইয়া হাল ছাড়িয়া দেয়। দ্বিতীয় দিন ব্যোমকেশ বাহির হইবার উপক্রম করিতেই শুনিলাম রান্নাঘর থেকে সত্যবতী গুন গুন করে গান ধরিল – গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে, মধুর মধুর বংশী বাজে। বুঝিলাম সংসারে নামক রণভূমিতে যুদ্ধ জিতিবার জন্যে সরাসরি আক্রমণই এক মাত্র অস্ত্র নহে।

যুগপৎ স্বামীর অভাব ও তার প্রতি বিরুপতার কারণে সত্যবতী উপুরজুপরি চায়ের সরবরাহ ও চিঁড়ে ভাজা, পোস্তর বড়া ইত্যাদির মাত্রা বাড়াইয়া তুলিল। দুপুর গড়িয়ে যেতেও যখন ব্যোমকেশের পাত্তা পাইলাম না, তখন আমরা দুইজন মধ্যাহ্ন ভোজন সারিয়া পান মুখে দিয়া গল্প করিতে বসিলাম। কয়েক বৎসর যাবত ব্যোমকেশের গল্প লইয়া ছবি বানাইবার হিড়িক পরিয়াছে। আমরা এই সব ছবির চিত্ররূপ লইয়া চায়ের পেয়ালায় পর্যাপ্ত তুফান তুলিয়াছি। ছবিতে ব্যোমকেশের শানানো, ছিপ ছিপে চেহারার পাশে আমার ঈষৎ স্থুল ও জড়ভরত চরিত্রায়নের পরিহাস করিতে ব্যোমকেশ ছাড়ে নাই। শেষে একটা ছবিতে সত্যবতীর আবির্ভাবে গৃহে শান্তি পরিস্থাপিত হয় – বিবাহিত নায়কের স্ত্রীচরিত্র বর্জিত চিত্ররূপ নাটকীয়, সংসারীয় ও নানা বিস্তর কারণে একেবারেই কাম্য নহে। যাই হোক, ব্যোমকেশের আর একটি কীর্তি অবলম্বনে একটি নূতন ছবি মুক্তি পাইবার দোরগোড়ায়। পাড়ায় পাড়ায় দেয়ালে হ্যান্ডবিল সাঁটানো হইয়াছে – দৈনিক কালকেতুর পাতায়ও ছবির কিছু স্থিরচিত্র ছাপানো হইয়াছে। সেই সূত্র ধরিয়াই আমি ও সত্যবতী আলোচনা করিতেছিলাম যে  ব্যোমকেশের কোন কীর্তি লইয়া এক নাটকীয় ছবি করা যাইতে পারে, এবং তাহার নায়ক নায়িকা চরিত্রে কাহাদের অভিনয় করা সমীচীন হইবে  বাহিরে বৃষ্টি থামিলেও বিদ্যুৎ ও বাজ পরিবার বহর দেখিয়া অনুমান করা যায় দুর্যোগ এখনো সরিয়া যায় নাই। ঠিক এমন সময় হুড়মুড় করিয়া দরজা ভাঙ্গিয়া ফেলার উপক্রম করিয়া ব্যোমকেশের প্রবেশ! চটি কর্দমাক্ত, কাপড়ে কাদার ছিটে – কিন্তু মুখে একগাল হাসি। “ওহে কপোত কপোতী, তোমাদের প্রেমালাপে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্যে ক্ষমা চাইছি!”, বলিয়া মিটি মিটি হাসিয়া দাঁড়াইল – তার ভাবসাব একদমই ক্ষমাপ্রার্থীর নহে। “জামা জুতো ছেড়ে আসছি অজিত, তারপর দারুন গপ্পো শোনাব। ওগো প্রিয়ে, এক কাপ চা হবে কি খানিক আদার কুচি দিয়ে?”, ব্যোমকেশকে মুখে মুখে ছড়া কাটতে বহুদিন শুনি নাই। সত্যবতী মুখ টিপিয়া উঠিয়া রান্নাঘরের দিকে গেল। খানিক পর শুনিলাম গান ভাসিয়া আসিতেছে – বধু এমন বদলে তুমি কোথা । বিরহী যক্ষ কখনো মেঘ, কখনো সঙ্গীতকে প্রেমের হাতিয়ার করে।

আরামকেদায় বসিয়া, আমার টিন হইতে সিগারেট ধরাইয়া একরাশ ধোঁয়া ছাড়িয়া ব্যোমকেশ শুরু করিল। “অপরাধের মহামারি, মক্কেলের মহামারি এই সবের মধ্যে যখন একটা সামান্য কেস আসে, সেইটাই খড় কুটোর মতো আঁকড়ে ধরতে হয়, বুঝলে অজিত। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে দুর্জয় ঘোষের বাড়িতে যখন চুরি হল, উনি আমাকে ডাকলেন স্রেফ এই কারণে যে পুলিশ তার অতি পুরনো ও বিশ্বস্ত চাকর নলেনকে ধরে নিয়ে গিয়ে হাজতে ভরে রেখেছে”।

“কি চুরি গেল?”

“বাড়ির দলিল। দুর্জয় ঘোষের শ্যামবাজারে একটা বাজারের আংশিক মালিকানা আছে। বিস্তর আয় হয় সেখান থেকে। সেই মালিকানার দলিল। থাকতো যে সিন্দুকে সেইটা থেকে নলেন নাকি পূর্বে কয়েকবার তার বাবুর জন্যে কাগজ বের করে দিয়েছে – তাই তার পক্ষে সিন্দুকের বাকি জিনিষের হদিশ জানা সহজ ছিল। বরাট দারোগার তাই মত”।

“দুর্জয় ঘোষ তো বিষয় সম্পত্তির রাঘব বোয়াল – তার সিন্দুক থেকে দলিল চুরি করলে আংশিক মালিকানার কেন? অংশীদারদের সঙ্গে মেলা হ্যাপা করতে হবে না?”

চা আসিয়াছিল ও তাহাতে আদার সুগন্ধ পাইয়া বুঝিয়াছিলাম বাহিরে মেঘ ঘনীভূত হইলেও ঘরের আকাশে রোদের ঝিলিক খেলিয়াছে। চায়ের পেয়ালা টানিয়া লইয়া তাহাতে লম্বা চুমুক দিয়া ব্যোমকেশ কহিল “শুধু কি তাই নাকি? ওই দলিল নিয়ে নলেন করবেটা কি? বরাটের ধারণা ও বাকি অংশীদারদের ওই দলিল মোটা টাকায় বিক্রি করার ধান্দা ফাঁদছিল। কিন্তু সেই যুক্তিতেও বিস্তর গলদ। যতই শহুরে হোক না কেন, আদতে গ্রাম্য নলেনের পক্ষে চুরির পর এই জটিল কাণ্ড ঘটানো প্রায় অবাস্তব”।

“নলেনের ওপর সন্দেহ পড়ল কি করে গা?”, সত্যবতী স্টোভ নিভাইয়া দিয়া বৈঠকখানায় ফের আসিয়া বসিয়াছিল।

“চশমা”

“চশমা?”, আমি ও সত্যবতী যুগপৎ প্রশ্ন করিলাম

“হ্যাঁ, চশমা। অকৃতদার দুর্জয় বাবু বাড়িতে একলাই থাকেন। চুরির সেই রাত্তিরে উনি বাজ পড়ার আওয়াজে জেগে যান ও রাস্তার ল্যাম্প পোস্টের আলোয় চোরের চেহারা খানিক দেখতে পান। সবটা ভালো না দেখলেও এইটে পরিষ্কার দেখেন যে চোরের চোখে চশমা আছে। একে তো বাড়িতে আর কেউ নেই আর নলেন চশমা পরে। ব্যাস, মারে হরি রাখে কে – সোজা বরাটের শ্রীগৃহে “।

“আহারে, বেচারা হয়েত সত্যি চুরি করেনি। তা তুমি এই সবের মধ্যে কি করলে গা?”

ব্যোমকেশ ত্রিপয়ের উপর পা তুলিয়া দিয়া কহিল “আমি সত্যান্বেষী – সত্য খুঁজে বের করা আমার কাজ। তাই করলুম”।

“সেই সত্য কি কর্নওয়ালিস স্ট্রিটেই ঘোরা ফেরা করছিল নাকি?”, প্রশ্ন করিলাম

“কর্নওয়ালিস নয় অজিত, সে অনেক দূর। সত্যের নিবাস লোয়ার সার্কুলার রোডে!”

“হেঁয়ালি না করে বলবে একটু খুলে”

“দুর্জয় ঘোষের পুরনো বন্ধু নীলাঞ্জন দত্ত – থাকেন লোয়ার সার্কুলার রোডে। পেশায় চিত্রপরিচালক – বেশ কিছু জনপ্রিয় ছবি তৈরি করেছেন যার কিছু তোমরা পয়সা খরচা করে হলে দেখতেও গিয়েছ। ইদানিং তার দুর্দিন শুরু হয়েছে – গোয়েন্দা গল্পের ছবি করবেন কিন্তু প্রযোজক হাথ উল্টো করতে নারাজ। নীলাঞ্জন দুর্জয়কেও অনুরোধ করেছিল ছবি তৈরির পয়সা দিতে, কিন্তু দুর্জয় রাজি হয় নি। মন্দার সময় চলছে তার ব্যবসায় – এই কারণে। পরে নীলাঞ্জন জানতে পারে যে এই দুর্জয় কিছুদিন আগে গোপনে এক পরিচালককে আর্থিক সাহায্য করে সেই একই গোয়েন্দা ছবি তৈরি করতে। ক্রোধে এই নীলাঞ্জনই সেই রাত্তিরে দুর্জয়ের সিন্দুক থেকে দলিল চুরি করে”।

“বাবা, তা তুমি ধরলে কি করে?”

“চোরের মন বোঁচকার দিকে, অজিত। আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল চশমাটা রেড হেরিং – ওইটা যুক্তিকে বিপথে চালাবার জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে। সেইদিন বিকেলে দেখি নীলাঞ্জন দত্ত হাজির দুর্জয়ের বাড়িতে। যিনি চশমা পরেন না অথচ চশমাকে কুকীর্তির জন্যে ব্যবহার করবেন সে কিন্তু কিছুদিন চশমা চোখে ঝালিয়ে নেবে নিজেকে সড়গড় করতে। অনভ্যাসের চশমা – তায় পুরু কাঁচ। নীলাঞ্জন দত্ত কে লক্ষ্য করে দেখলাম উনি মাঝে মাঝেই চোখ ছোট বড় করছেন – যেন চোখে কোন সমস্যা আছে। জিগ্যেস করাতে এড়িয়ে গেলেন। তারপর কাছ থেকে দেখি নাকের দুই পাশে, চোখের নিচে অল্প ছড়ে যাবার দাগ। পরিষ্কার বুঝলাম যে ইনি কোন কারণে ইদানিং হটাতই চশমা ব্যবহার শুরু করেন ও অনভ্যাসের দরুন ভারি চশমায় চামড়ায় কাটাকুটি”।

“বাঃ, এই তো সব মিলে যাছে। নীলাঞ্জন চশমার জন্যে চুরির সময় ঠিক দলিল না নিয়ে একটা আংশিক মালিকানার দলিল চুরি করলেন আর ফাঁসাবার জন্যে বেছে নিলেন বেচারা নলেনকে”

ব্যোমকেশের সিগারেট পুড়িয়া ইঞ্ছিখানিক মাপের ছাইয়ের ডাণ্ডায় পর্যবসিত হইয়াছিল। সামনে ঝুঁকিয়া আমার টিন হইতে আরেকটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিয়া ব্যোমকেশ কহিল, “সাবাস, অজিত। তুমি ছেঁদো প্রেমের উপন্যাস ছেড়ে গোয়েন্দা গল্প লেখ দেখি – পাঠকরা অনেক বেশি খাবে! যাইহোক, আজকে নীলাঞ্জন যখন আমার আর দুর্জয়ের সঙ্গে দুর্জয়ের বাড়িতে তখন বরাট নিলাঞ্জনের লোয়ার সার্কুলার রোডের বাড়ি তল্লাশ করে সেই দলিল ও চশমা উধহার করেছে। নীলাঞ্জন এখন বরাটের জিম্মায় – ব্যাটা সব কবুল করেছে”।

“বাবা, চশমার চমৎকার – কি বল?”

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিয়া পকেট হইতে একটা মোটা ফ্রেমের চশমা বাহির করিয়া ত্রিপয়ের উপর রাখিল।

“এইটে কি? পারিশ্রমিক?”, এক প্রিয় ছবির শেষ দৃশ্যে শোনা এক সংলাপ কে ব্যোমকেশের দিকে ছুঁড়িয়া দিয়া প্রশ্ন করিলাম। সত্যবতী খানেক হতভম্ব খাইয়া বসিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ টেবিলের ওপর পড়ে থাকা  দৈনিক কালকেতুটি টানিয়া লইয়া সেই পাতাটি মেলিয়া ধরিল যাহাতে তাহার কীর্তির মুক্তি-আসন্ন ছবির নায়ক নায়িকাদের কিছু স্থিরচিত্র ছাপা হইয়াছে। মূল ছবিটিতে নায়কের খানিক উদাস চাহুনি – ডিটেকটিভ হিসাবে অনুপযুক্ত হইলেও দৃষ্টির প্রখরতা মনের ভাবকে খানিক বুদ্ধিদীপ্ত করিতে সক্ষম হইয়াছে। নায়কের প্রাজ্ঞ ভাব ফুটাইয়া তুলিতে পরিচালক তাহার নাকের ওপর একটি মোটা ফ্রেমের চশমা আঁটিয়া দিয়াছেন। ব্যোমকেশ মুখায়বে খানিক তিক্ততা, খানিক ব্যাঙ্গ মিশাইয়া চশমার ডাঁটি দিয়া সেই ছবিটির দিকে ধরিয়া কহিল, “আমাকে কখনো চশমা পড়তে দেখেছ?”

মানিতে বাধ্য হইলাম যে নেহাত ছদ্মবেশ ধারণ করা ব্যাতিত ব্যোমকেশকে কখনো চশমা ব্যবহার করিতে দেখি নাই। তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষুরধার – বরং রাত জাগিয়া লেখালেখি করিতে করিতে আমার মাঝে মাঝে চোখ ব্যথা করিয়া থাকে।

“তাহলে?”, এইবার ব্যোমকেশকে বেশ উত্তেজিত দেখিলাম। সদ্য জ্বালানো সিগারেট টি চায়ের কাপে ডুবাইয়া সে কহিতে লাগিল। সত্যবতী দেখিলাম আঁচলের আড়ালে মুখ লুকাইয়া হাসির দমক চাপার চেষ্টা চালাইতেছে।

“কেন বল দেখি, চশমার সঙ্গে বুদ্ধির এই বেয়াড়া যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা? এই চশমাটাই এই ছবির নষ্টের মূল। দুর্জয় ঘোষের পয়শায় তৈরি এই ছবি আর এই সেই উদ্ভট চশমা। বাংলা চিত্র পরিচালকরা যে হারে আমাকে চশমা পরাতে শুরু করেছেন অজিত, তাতে আমাকে – বা আমার গল্পের ছবির নাম – সত্যান্বেষী না রেখে চশমান্বেষী রাখতে পারত”।

সত্যবতী আর পারিল না, উছস্বারে হাসিয়া উঠিল। আমি স্থাণুবৎ বসিয়া রহিলাম। দেখিলাম ব্যোমকেশ তাহার আক্রোশ ফলাইয়া চশমাটির ডাঁটি ভাঙ্গিয়া বস্তুটিকে অকেজো করিয়া তুলিল। “বাঁশ না থাকলে দেখি কানুর বাঁশি বাজে কি করে”।

“পারিশ্রমিকের এমন অপচয় করতে আছে? বাঁটুল সর্দারকে দিয়ে দিলে চোর বাজারে বিক্রি করে নাহক কিছু টাকা তো উদ্ধার করা যেত?”, আমার বৈষয়িক মন আমাকে তাহার চেনা পথে টানিয়া লইয়া গেল।

“পারিশ্রমিক ওইটে নয় – এইটে”, বলিয়া ব্যোমকেশ জামার পকেট হইতে দুইটি মোটা ছাপা কাগজের ফালি বাহির করিল। কোন খানদানি অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পত্র বোধকরি।

“এইগুলি কি গা”, সত্যবতী প্রশ্ন করিল

“দুর্জয় ঘোষের ছবি দেখার অগ্রিম নিমন্ত্রণ। আগামি শুক্রবার রিলিজ করছে ছবিটা আর বিস্যুদবার বিকেলে কিছু গন্যমান্য লোকদের চিত্রবাণী হলে অগ্রিম দেখানো হবে ছবিটা। চোর ধরে দেবার এই পারিশ্রমিক দিলেন দুর্জয় ঘোষ”।

“কিন্তু দুটো কেন – ঠাকুরপো যাবে না আমাদের সাথে?”

আরামকেদারায় মাথা পেছন হেলাইয়া, কণ্ঠে ভারি বর্ষার একরাশ ক্লেদ লইয়া ব্যোমকেশ কহিল “ঠাকুরপোই যাবে। আমি না। আমি সেইদিন আমার গল্পের ছবি দেখতে যাব যেদিন আমার সত্যি সত্যি চশমার প্রয়োজন হবে!”

বুঝিলাম সত্যান্বেষীর অন্ন্যেষণ এর ধ্রুবতারা হইল সত্য, সেই সত্যের কোন নাটকীয় রুপ সত্যান্বেষীর মোহ আকৃষ্ট করে না।

Previous Post
Leave a comment

2 Comments

  1. আজকাল তুমি যেমন তির্যক — নিতান্ত অবঙ্গীয় — ব্যঙ্গ ব্যবহার করছ, অজিত, এবার থেকে তোমায় অন্য নামে ডাকব ঠিক করেছি। হয় অজিতেশ (অবশ্য, তোমার কন্ঠস্বর ততোটা ভারি নয়), নয় তো সুব্রত (সুব্রতার পুং হিসেবে) — নিজেই বেছে নাও। চিড়িয়াখানা থেকে ঘরে ফেরার পথে হাওড়া ব্রীজ়ের তলা দিয়ে কতোটা জল গড়িয়ে গেছে, তার খোঁজ রাখো? এখনো চোখে দত্ত ফার্মেসির অর্সেনিকবহুল অঞ্জন, ঋতুপর্ণের চশমা হাতের কাছে থাকতেও? কলম ছেড়ে এবার টাইপিঙের আঙুল দুটোর ব্যায়াম করো, সেই সঙ্গে প্রুফ রিডিঙের অভ্যাস — বাংলা টাইপিঙের বখেড়া বিস্তর!
    ইতি, তোমার ব্যোম (কারণ আমার একদা ঘনকৃষ্ণ কেশদাম এখন মরিচপ্রধান নুন-মরিচের মত, এবং কিঞ্চিৎ বিরল।)

    Reply
    • মহাশয়, আপনার মন্তব্য পাইয়া বাধিত হইলাম। যে যুগে ব্যোমকেশের কাহিনী শুনাইয়া সামান্য খ্যাতি লাভ করিয়াছিলাম সেই যুগে পাঠকের সহিত কম সময়ে এত নিবিড় সম্পর্ক গড়িয়া তোলা ভাবিতেও পারিতাম না। যুগের অগ্রগতির মহারথের সমুখে মস্তক আপনা আপনিই নত হইয়া আসে। বঙ্গে যাইলে যে কপাল সঙ্গ ছাড়ে না তাহা গুণীজনে কহিয়াছেন। বহুদিন পর বঙ্গে আসিয়া দেখিলাম সেখানে ব্যঙ্গ করিবার উপাদান আনাচে কানাচে, নীল সাদা উড়ালপুলের নীচে – সবত্র বিরাজমান। তারই কিছু লইয়া গল্প ফান্দিলাম।
      ব্যোমকেশ কিছুদিন হইলো একটি ম্যাকবুক নামক যন্ত্র কিনিয়াছে। আমাদের আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে এখন এই নতুন খোকাটিকে লইয়া অতি ব্যস্ততায় দিন কাটিতেছে। তবে তাহাতে রোমান হরফে বাংলা লেখার ঝক্কি শৈলরহস্যে আমার গোয়েন্দাগিরির অপেক্ষা কিছুমাত্রায় কম নহে। আশা করিতেছি খোকা (ম্যাকবুক নহে) বড় হইয়া কোনো কোম্পানি স্থাপন করিলে (শুনিলাম তাহাকে আজকের ভাষ্যে “স্টার্টআপ” বলিতে হয়) কথা কহিয়া বাংলা লেখার সুব্যবস্থা করিবে। আশায় শুধু চাষা বাঁচে তাহা নহে – লেখকরাও বাঁচে। ভালো থাকিবেন। চুলের আক্ষেপ করিবেন না – চুপি চুপি জানাইয়া রাখি যে ব্যোমকেশের সহিত অকস্মাৎ পথে দেখা হইলে তার ব্যাকব্রাশের আসল কারণটা জিজ্ঞাসা করিবেন।
      নমস্কারান্তে, সু…থুড়ি আপনাদের অজিত।

      Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: