শাপমোচন

শেষ বয়েসে বেশ কিছু বছর আমার দিদিমা আমাদের সঙ্গে থাকতেন। তখনও অহর্নিশি টেলিভিশনের যুগ শুরু হয়েনি। স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বিকেল ছটায় কৃষি দর্শন না দেখে আমার দিদিমা সন্ধে দিয়ে আমাকে একটা অনুরোধ করতেন। শাপমোচন শোনাতে।

Shapmochonরবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য “শাপমোচন”: আর সেইটে শোনা হত গ্রামোফোন রেকর্ডে। ছোট্টবেলা থেকে আমাদের বাড়িতে প্রচুর গ্রামোফোন রেকর্ড দেখে এসেছি। কিছু রেকর্ড খুব পুরনো – কিছুর সামান্য ঐতিহাসিক মূল্য আছে হয়েতো (যেমন আমাদের পড়শী টিকুর মাসি পূর্বা দাম – যাকে আমরা শিশুসুলভ বালখিল্যে “গুড় বাদাম” বলতাম – এর সই করা একটা রেকর্ড) “রেকর্ড” নামক রচনা লিখতে দিলে হয়েত পড়ুয়ারা শুরু করবে – রেকর্ড তিন প্রকার – এই বলে। ঠিকই। তেত্তিরিশ, পয়তাল্লিশ আর আটাত্তর – এই হলো রেকর্ডের কাস্ট সিস্টেম। এইগুলি রোটেশন পার মিনিট – এক মিনিট সময়ে চাকতিগুলি এতগুলি চক্কর কাটত। আর একটা ছোট্ট পিন রেকর্ডের গায়ে ঘষটে বের করত আওয়াজ। আটাত্তরে দু পিঠে দুটি গান – অথবা তখনকার দিনের খুব চলতি – একটা গানের দুটি অংশ। এই অংশ ভাগ করে গান ব্যাপারটা আমার দিব্যি লাগতো। বেশ মাথা খরচা করে তৈরী হত এই গানগুলি। রেকর্ডের পিঠ পরিবর্তন মানে গানের ভাবের বা গল্পেরও একটা দিক পরিবর্তন। একপিঠে তার প্রিয়তমার সঙ্গে সাতটি বছর আগের প্রথম দেখার স্মৃতি মেলে ধরলেন জগন্ময় মিত্র। আর অন্য পিঠে সময়কে এগিয়ে নিয়ে গেলেন সাতটি বছর, ফিরে গেলেন সেই মালতী তলে “যেখানে দাড়ায়ে প্রথম, বলেছিলে ভালবাসি”। সেই মালতী তলায় আজও ফুল ফোটে, বাঁশী বাজে – কিন্তু সেই প্রিয়তমা আর নেই। হয়েত মৃত্যু তাকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছে তার প্রিয়র কাছ থেকে। দুঃখ যেমন সুখের অন্য পিঠ বই কিছু না তেমনি একটা রেকর্ডে ধরা থাকত জীবন গল্পের দুটো পিঠ। ঠিক একই ভাবে সলিল চৌধুরী রেকর্ডের এক পিঠে রচনা করলেন ঘুঘু ডাকা ছায়ায় ঢাকা গ্রামের শান্ত ছবি আর অন্য পিঠে শোনালেন দূর্ভিক্ষের ডাকিনী যোগিনীদের উদ্দাম মরণ নৃত্যের কথা।

এইরকম ভাবে ভাঙ্গা হত রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যগুলোকে। সঙ্গীত পরিচালক বেশ কায়দা করে কাজটি করতেন – ভিনাইল রেকর্ডের খাঁজ আর ঘোরবার গতি, এই দুই ভেরিয়াবেল নিয়ে তৈরী হতো গান আর কথায় সমৃদ্ধ মোটামুটি এক ঘন্টার অনুষ্ঠান। শাপমোচন রেকর্ডটি বেশ চোস্ত ভাবে তৈরী – অযথা শিল্পীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েনি। অরুনশ্বরের গান গাইছেন হেমন্ত মুখার্জী আবার উনিই অরুনশ্বরের সংলাপ বলছেন। দরাজ ভরাট গলায় সূত্রধরের ভূমিকায় নজরুল পুত্র কাজী সব্যসাচী। গল্পের প্রথম ভাগে – বা রেকর্ডের প্রথম পিঠে অরুনেশ্বর ও মধুশ্রী স্বর্গ থেকে বিতরিত হলেন, মর্ত্যে এলেন ও বিবাহ বন্ধনে বাঁধা পড়লেন। বধূর পতিগৃহে যাত্রা দিয়ে আনন্দের প্রথম পিঠ শেষ হয়। ভালবাসার উল্টো পিঠে সংঘাত – কাব্যেও তাই ও রেকর্ডেও তাই। সন্তোষ সেনগুপ্তের সঙ্গীত পরিচালনায় জীবন্ত হয়ে উঠলো জীবন কাব্য।IMG_20130817_141428

গাড়ি চালাতে চালাতে তো আর ভিনাইল রেকর্ড শোনা যায় না – আর আজকাল আবার রিমেকের দৌরাত্য। তাই সহজলভ্য সি ডি তে কিনলুম নতুন শাপমোচন। দৈর্ঘ্যে পুরোনোটার থেকে বড় – পুরনোটাতে যেমন সময়কে মাথায় রেখে অরুনেশ্বর “আনমনা আনমনা” গানটি পুরোটি গাননি – কিন্তু নতুনটিতে যেন শ্রোতার অঢেল অবসর। আর যেহেতু সি ডির পিঠ হয়না তাই গীতিনাট্যটাও কেমন জানি সিধে রাস্তায় চলে – নাটকীয় মোড় গুলি নেই বললেই চলে।

অনলাইনে খুঁজে পুরোনো শাপমোচন পেলাম – সি ডি তে। বার্ন করে নিতেই কয়েক জি বি তে নেমে এলো কৈশোরের সঙ্গীতময় সন্ধের স্মৃতি। কিন্তু কিছু জিনিস তো ফিরবে না। যেমন দিদু ধীর পায়ে এসে বলবে না “ভাই, রেকর্ডের পিঠটা বদলাইয়া দিবা?”

Leave a comment

1 Comment

  1. Very well written, Subrata!

    Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: