বালেশ্বর

নামের সঙ্গে কাজের এমন অদ্ভুত মিল খুব কম দেখা যায়।

একটু পিছিয়ে যাই আমার শৈশবে। শিল্পনগর বার্নপুরে কেটেছিল জীবনের প্রথম পনেরোটি বছর। ছোট্ট, ছবির মত সাজানো উপনগর। এইরকম উপনগরীতে যেমনটি হয় ঠিক তেমনই সব দোকানপাট আঁকড়ে ছিল রেল ষ্টেশনকে। ষ্টেশন রোডের দোকানের মধ্যে চুল কাটাবার সেলুনও ছিল কিন্তু সেখানে আমাদের অবাধ গতিবিধি ছিল না। সেখানে যেতেন আমাদের বাবা কাকারা – বড়রা। আমাদের মধ্যে কচিদ-কদাচিৎ কারুর ভাগ্য হয়েতো শিকেয় ছিঁড়ত – তারা যেত সেই সেলুনে চুল কাটাতে। ফিরে এসে তারা গপ্পো বলত স্প্রে করে ঘাড়ে জল ছেটাবার আর গদি দেয়া নরম চেয়ারএর। আমাদের সে সুযোগ বিশেষ হত না। তাই আমাদের জন্যে ছিল ঘরে এসে চুল কেটে দেয়ার নাপিত। একজন নাপিতই ছিল পুরো অঞ্চলটায়। নাম বালেশ্বর। নামের সঙ্গে কাজের অদ্ভুত মিল।

বালেশ্বরকে কোন দিন ধুতি- শার্ট ছাড়া কিছু পড়তে দেখিনি। আর সেইটে থাকতো ধবধবে সাদা। শীতকালে একটা জহর কোট। পায়ে কালো পাম্প শু আর কাঁচা পাকা চুল পাট করে ব্যাকব্রাশ আঁচড়ানো (আমরা মাঝে মাঝে আমাদের খুদে মনে আলোচনা করতাম – “বালশ্বরের চুল কে কেটে দেয়?”)।. বালেশ্বরের হাথে থাকতো একটা ছোটো আলুমিনিয়ামের বাক্স তার মধ্যে থাকতো চিরুনি, কাঁচী, ক্লিপ ইত্যাদি। অক্লান্ত বালেশ্বর হেঁটে যেত উপনগরীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত (তখন আমাদের উপনগরীতে সাইকেল রিক্সা ছাড়া আর কোন যানবাহন ছিল না)।, কোনো বাড়ি থেকে ডাকলে সেই বাড়িতে ঢুকে চুল ছেঁটে দিত বালেশ্বর – বেশির ভাগই খুদে খদ্দের মিলত, কখনো বাবা কাকারাও ছাঁটিয়ে নিতেন বালেশ্বরের কাছে। একটা ছোট টুল বাগানে পেতে, খবরের কাগজের ওপর, বালশ্বর কাজ শুরু করত। শুরুর ঠিক আগে মা এসে চিরাচরিত নির্দেশ দিয়ে যেতেন – “ছোট করে কাটবে বালেশ্বর!” বালেশ্বর শুধু একটা কথায় উত্তর দিত – সত্যি বলতে কি, আমি বালেশ্বরকে কখনো আর কোন বাড়তি কথা বলতে শুনিনি – একটু গম্ভীর গলায়, সামান্য মুচকি হেসে বালেশ্বর বলত – “বেশ”।,ব্যাস, ওই একটাই কথা। বেশ। আমরা একটু বড় হলে, সাহস করে মা’র হুমকি অগ্রাহ্য করে যদি বলতাম “বালেশ্বর, ওপরটা একদম কদম ছাঁট করে দিও না!” তারও জবাব আসতো – “বেশ”।,চুল ছাঁটা হয়ে গেলে,পয়সা নিয়ে নিজের সরঞ্জাম আলুমিনিউমের বাক্সে গুছিয়ে আবার চলা শুরু করত বালেশ্বর।

কালের নিয়মে হয়েত বালেশ্বর মারা গিয়েছেন। সেই সঙ্গে প্রায় মারা গিয়েছে পাড়ার নাপিতরা। তাদের আর দেখা যায়না। মধ্য কলকাতার রোয়াকে বসে একগাল ফেনা নিয়ে কেউ বিশ্বনাথের স্কোয়ার কাটের আলোচনা আর করেন না। সবার বড্ড তাড়া। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে এখন সপরিবারে চুল কাটতে যাওয়াই রেওয়াজ। আজকাল শুনি আগে থেকে ফোন করে গেলে ভালো হয় – অপেক্ষা করতে হয় না। সেই গড্ডালিকা প্রবাহে আমিও গা ভাসিয়েছি। তবু সেলুনের চেয়ারে বসে কেন জানি মনে হয় – এই যদি বলি “বালেশ্বর, ওপরের চুল একদম পাতলা হয়ে গিয়েছে, বেশি ছেঁটো না” হয়েত একটা গম্ভীর গলায় পেছন থেকে শুনতে পাব – “বেশ”।