কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি

“দাদু আপনার নেবু চা আর দুটো লেড়ে বিস্কুট – টোটাল হবে আঠারো টাকা। খুচরো দেবেন।”

লেকের ধারে মেলা ভিড়। তাই আমি একটু অন্যদিকে প্রাতঃ ভ্রমণ সেরে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলুম এমন সময় দোকানদারের ছুঁড়ে দেয়া কথাটা কানে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে বললেও আমাকে উদ্দ্যেশ করে নয়। দোকানীর কথা শুনে আমার পাশে একটু পেছন করে ঘুরে বসা দীর্ঘ কান্তি বৃদ্ধ জোব্বার পকেট থেকে কিছু টাকা ও পয়েসা বের করে গুনতে লাগলেন খুব স্লথ গতিতে। জোব্বা? এই মে মাসের গরমে জোব্বা? একটু অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে তো আমি একদম থ! শিট! এ যে রবি ঠাকুর! একদম জেরক্স কপি। সেই ঋষি সুলভ চাউনি, ঝক-ঝকে চোখ, পাতলা হয়ে আশা সাদা চুলদাড়ি গোঁফ। ভুল হবার কোন জো নেই!
“কি পাইনি, তার হিসাব মেলাতে মন মোর নহে রাজি …একটু হাথ বাড়িয়ে দামটা দোকানীকে দিয়ে দেবে, ভাই?”, বৃদ্ধ বললেন। আর সন্দেহ রইল না বিন্দুমাত্র – গাড়িতে ভয়েস অফ টেগোর সি ডি তে কতবার ওই খনাগলায় “তবু মনে রেখো” শুনেছি। ডাইভ দিয়ে পড়লুম পায়ে। ভট করে মুখ থেকে বেড়িয়ে গেল – “আমায় বাঁচাও রবি ঠাকুর, আমি নোংরা এক আস্তাকুর …।” সস্নেহে বুকে টেনে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গলফ গ্রীনের দিকে যেতে টুকরো কথা হল ওনার সাথে …।

আমি: এমনি আচমকা চলে এলেন যে?
রবিঃ অনেক কথা শুনতে পাই ওপরে বসে। আমার লেখার, গানের প্রসার – তারপর আমার গল্প নিয়ে ছবি। ছবিতে আমার গান। কপিরাইট উঠে যাবার পর আমার গানের বিবর্তন। অনেক কিছু শুনি। চক্ষু কর্ণের বিবাদ বেশিদিন রাখা সমীচীন না – তাই সরেজমিনে ভাবলুম দেখে যাই।

আমিঃ ভালো করেছেন! প্রথম প্রতিক্রিয়া?
রবিঃ ভাবলুম, বাঙ্গালীদের থেকে বাইরে লোকেরা আমাকে কেমন চিনেছে একটু বাজিয়ে দেখি। গেলুম উত্তর ভারতে। পরিচয় দিতেই কিছু লোক “আপনি সাইফ আলি খানের দাদাজি আছেন?” জিগ্যেস করলো। ইশ্বর জানেন কে এই আমার পড়ে পাওয়া নাতি। কিছু লোক জারা চিনল তারা গাক গাক করে “আপনি টেগোর আছেন? ভালবাসি, ভালবাসি … রসগোল্লা রসগোল্লা। একলা চল রে … চল রে” বলে ধেয়ে এল। বোঝো কাণ্ড! তাদের কাছে এই হল আমার পরিচয়। আর আমি এদের নিয়ে কবিতা লিখেছিলুম “পঞ্চনদের তীরে, বেণী পাকাইয়া শিরে”?

আমিঃ কিন্তু খানিক বিশ্বায়ান হয়েছে, এইটে কিন্তু মানতে হবে গুরুদেব
রবিঃ হ্যা, শুনলুম এক মহিলা নাকি অক্লান্ত ভাবে আমার গান হিন্দিতে গেয়ে চলেন? এই কি বিশ্বায়ান? কি নাকি এক ক্রিকেট ম্যাচের আগে মাঠে স্টেজ বেঁধে তারস্বাওরে আমার গান গাওয়া হয়েছে? এই কি বিশ্বায়ান? আমার লেখা শুনলুম ইন্টারনেটে দিয়েছে যাতে লোকে আর কষ্ট করে বাঁধানো বই এর ত্রিসীমানা না মাড়ায়। এক ছোকরা আই-প্যাড না কি বস্তুতে দেখাল। সে বানানের কি ছিরি। শোন ভাই, খান কয়েক ড্রাম বা ইলেকট্রিক গিটার বাজিয়ে “তোমায় নতুন করে পাব বলে” গাইলেই তো বিশ্বায়ান হয় না। বিশ্বের দর্পণে ধরতে হবে আমার লেখা, আলোচনা করতে হবে অন্তর্নিহিত বানীর। দেখতে হবে আজকের সমাজে আমার চিন্তাধারা খাপ খাচ্ছে কি না।

আমিঃ একটু ট্যান খেয়ে যাচ্ছি। তা এখন তো এই শহরে কান পাতলেই আপনার গান। ভালো লাগে?
রবিঃ তা লাগে! আগের মোড়ে শুনলুম “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সামান” বাজছে। একটু দাঁড়িয়ে পরেছি আর একটা ট্যাক্সি একদম দিয়েছিল আর কি ফের বাইশে শ্রাবণ করে। তবে কিনা এই গানগুলি আমি লিখেছিলুম একান্তে শোনার জন্যে – একাকীত্বের শূন্যতাকে পরিপূর্ণ করার জন্যে। তাই রাস্তার মোড়ে সেই গান বাজলে একটু বুকে বাজে – বাজে লাগে

আমিঃ এখনো কিন্তু আপনার গানের সি ডি, বই ভালো বিক্রি হয়। বাঙালি এখনো আপনাকে পেতে চায়
রবিঃ সে তো আমার শেষ যাত্রা থেকেই চাইছে। বাপরে – শকট জোড়াসাঁকো পেরিয়েছে কি পেরয়নি – লোকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে চুল, দাড়ি পটা পট ছিঁড়তে শুরু করে দিলে? নাকি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখবে! নোবেলটাও ঝেঁপে দিল। ভাগ্যিস নাইট খেতাব প্রত্যাখান করেছিলুম, নাহলে হয়েত কারো বৈঠকখানায় সেই মণিহার শোভা পেত এতদিন। আমাকে পেতে গেলে আমার জোব্বা থেকে কাপড় কেটে নিলেই তো হবে না – আমার মতবাদ কে গ্রহণ করতে হবে, সংকীর্ণতা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। “আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া” – এইটাকে সর্বান্তকরণে আঁকড়ে ধরতে হবে

আমিঃ কলকাতা শহরটাকে কি বলবেন?
রবিঃ বলার মত কিছু রেখেছ নাকি? বড়লোকের মল আর ছোটলোকের মুত্র – এই তো আছে এই শহরে। হ্যা, আর কিছু হত কুচ্ছিত আমার মূর্তি। সাধে কি আমি সুযোগ পেলেই পালাতাম শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন। আর বাছা, এই ব্রিজের রেলিঙগুলো সব সাদা নীল রঙ কেন?

আমিঃ আগ্যে গুরুদেব, ওইটি এখনকার মুখ্য মন্ত্রীর প্রিয় রঙ। উনি কিন্তু আপনার বিশেষ ভক্ত
রবিঃ সুনিছি ওনার ব্যাপারে – এই সেদিন সুনীল – মানে সুনীল গাঙ্গুলির সাথে কথা হচ্ছিলো। কোন সভায় জানি মধু কবির ছবির বদলে আমার ছবি লাগিয়ে দিয়েছিলেন! বোঝো কাণ্ড! তবে হ্যা, মানতেই হবে যে উনি আসার পর থেকে পার্টি আফিস গুলিতে আমার গানের চাহিদা বেড়ে গিয়েছে – বছরে তিরিশবার চিত্রাঙ্গদা আর শ্যামা শাপমোচনের অশ্রুমোচন এখন একটা গতানুগতিক ধারায় এসে গিয়েছে।

হাঁটেতে হাঁটতে থমকে দাঁড়িয়ে পরলেন রবীন্দ্রনাথ। মুখ তুলে চাইলেন পথের ধারে সার বাঁধা কৃষ্ণচূড়া গাছগুলির দিকে। রক্তরাগের আগুন ঝড়িয়ে গাছগুলি পথের ওপর লাল ফুলের গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। “এখনো শহরে এমন ফুল ফোটে? ফুরিয়ে বেলা, চুকিয়ে খেলা তপ্ত ধূলার পথে ঝরা ফুলের রথের চাকা এখনো শহর ছোঁয়? কি অনাবিল সৌন্দর্য”, বলে উঠলেন কবিগুরু। হাল্কা হাওওায় চুলগুলি উড়ছে। দুহাথ সামনে প্রসারিত করে গুনগুন করে গান ধরলেন কবিগুরু “রাঙিয়ে দিয়ে যাও, যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও”

“কি কেস দাদু? রাঙিয়ে দিয়ে যাও? পঞ্চায়েত ভোটের আগে সি পি এম নাকি?”, আচমকা দেখি গোটা দুয়েক পাড়ার মাস্তান টাইপের লোক এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। “এই পাড়া থেকে সব মাকুদের ঠেঙ্গিয়ে বের করেছি। এখন এখানে শুধু রোবিন্দ সঙ্গীত বাজবে – দিদি তাই বলেছেন। সেই সময়ে কে বস আপনি মাওবাদি দাড়ি চুমরে রাঙিয়ে দিয়ে যাও কপচাচ্ছ?”
“আরে দাদা, করেন কি! ইনি তো স্বয়ং রবিঠাকুর!”, আমি ঝটপট সামাল দিতে চেষ্টা করি
“বাওওাল করবেন না দাদা, বিলা হয়ে যাবে। আমরা সবাই বাইশে শ্রাবণ দেখেছি। আমরা জানি উনি লাস্ট সিনে নিজেকে গুলি করে মরেছেন। এখন আবার কেষ্ট ঠাকুর সেজে কে বে এই সং – শালা লাল রঙের সং গাইছেন?”, দু জনের ভিড় দেখলাম মুহূর্তে চার পাঁচে দাঁড়িয়ে গেল। বুঝলাম হাওওা গোলমেলে।
“চলুন তো দাদু পার্টি অফিসে – দেখি আপনার এই লাল টমেটো মার্কা গান কদ্দিন চলে! ওরে কচি, তোল দাদুকে সুমোতে আর নিয়ে চল অফিসে”।
হতভম্ব হয়ে দেখলুম দীর্ঘ কান্তি মানুষটিকে ঠেলে গাড়িতে তুলে নেয়া হল। ঋষি প্রতিম মুখে কোন ভাবান্তর নেই। আমার পানে চেয়ে স্মিত হাসলেন। গান গাইছেন “বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন, এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান”

Advertisements