গলির গল্প

সুরি লেন আর গোমস  লেন। মধ্য কোলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলের দুটো পাশাপাশি গলি। গোমস  লেনকে কেন জানি সবাই গোমেশ  লেন বলতো – একগাদা বাঙালি নামওালা রাস্তার মাঝে বেচারা ওই একটা ইংরেজ নামের রাস্তা – একটু উচ্চারণ বিভ্রাট তো হতেই পারে। এই সুরি লেন আর গোমস  লেন এর মধ্যে ছিল একটা সরু গলি – একপ্রান্তে সুরি লেনের কালি বাড়ি আর অন্য প্রান্তে গোমস  লেনের তেলেভাজার দোকান। ইংরেজি এল হরফের মত গলিটা এত সরু ছিল যে দুজন পাশ কাটিয়ে যেতে পারতো না।এমনকি একজন গেলেও তেরছা হয়ে যেতে হত – কাঁধে ঠেকত স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের ঠাণ্ডা। নিয়মই ছিল যে কাশতে কাশতে ঢুকতে হবে আর যদি হটাত মাঝপথে ওই এল এর কনুইএ দেখা যায় উলটো পথগামি দিগভ্রান্ত কাউকে তাহলে স্রেফ নার্ভের খেলা। যিনি দুর্বল চিত্ত তিনি পিছে হেঁটে যাবেন আর অন্যজন জেনেরাল মানেকশর মত গিয়ে পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বলবেন “আওয়াজ দিন, আওয়াজ দিন”।

গলিটা কখনো সূর্যের মুখ দেখেনি। এদিকে হয়েত আবার কত কি দেখেছে। সাতচল্লিশের দাঙ্গায় হয়েত কেউ এই গলি দিয়ে দৌড়ে প্রাণ বাঁচায় – হয়েত আবার কেউ হটাত অন্য প্রান্তে গিয়ে দেখে সড়কি বা কাটারি অপেক্ষা করে আছে।গলির প্রান্ত বদলালে হয়েত ধর্মও বদলে যায়! এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখত যে মেডেল পাওয়া ছেলেটা, যে মার অসুখ শুনে রাতের আঁধারে বর্ধমান থেকে লুকিয়ে এসেছিল মাকে একবার দেখতে -একাত্তরে এই গলিতেই হয়েত ভোরের আলো ফোটার আগে পুলিশের গুলি তার বুকটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছিল। ওই তো – ওই যে দেয়ালে সিমেন্টের কিছুটা চলটা উঠে আছে – ওইখানেই নিশ্চয় গুলিটা গিয়ে লেগেছিল।ইটগুলো মুখিয়ে রয়েছে কত গল্প শোনাবার জন্যে। বোবা হয়ে দেখেছে কত পথ চলতি উপাখ্যান।

ওই গলিটা পেড়িয়ে একটু দূরে সুরি লেনের কোনা ঘেঁষে সেনবাবুদের বাড়ি। জবাকুসুম তেলের সেনবাবু। যাদের তেলের বিজ্ঞাপনে স্বয়ং শরত পণ্ডিত – দাদাঠাকুর – পাঞ্চলাইন  লিখে দিয়েছিলেন। এক সুন্দরী যুবতী শ্যামা পুজায় রত – এই ছবির সঙ্গে এক ছত্র লেখা – “সাধনে জবাকুসুম, প্রসাধনে জবাকুসুম”।

Golir Golpoলাল রঙের তেলের সঙ্গে মিলিয়ে গোলাপি রঙের বাড়ী। কি বিশাল গেট। ছিল। এখন আর নেই। “তুষিত  প্রেয়সী চিত্ত যদি ইছছা চিতে, অনুরোধ  করি মোরা এই তৈল নিতে” গানে যে জিনিষ এক কালে বিকত সে কি আজকের দিনে চলে? চলে না। তাই সে তৈলর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ীর সামনের বাগানটাও লোপ পেয়েছে। লোপ পেয়েছে বলা ভুল – সুন্দর ছিমছাম গোলাপি বাড়ীটা ঢেকে দিয়ে একটা বেখাপ্পা ওনারশিপ ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে। দুটো ফুটফুটে বাচ্চা কে খেলতে দেখতুম ওই সামনের বাগানটায়। তাদের এক্কা দোক্কা খেলার চৌখুপিতে এখন কারো দশ ফুট বাই দশ ফুটের স্বপ্ন।

“ওরা দরজা বন্ধ করে না কেন, দিদু”? বাড়ীটার অদ্ভুত একটা নাম ছিল – ভূতের বাড়ী। পুরনো আমলের সাবেকি দালান বাড়ী। দরজাটা সব সময় খোলাই থাকত – বিশেষ করে দুর্গা পূজার সময়। দিদিমার হাত ধরে যেতাম ঠাকুর দেখতে। দিদিমার হাঁটুতে বাত ছিল – তাই বাড়ীর কাছের ঠাকুর গুলি দেখিয়ে আনতেন একদিন সন্ধেবেলা। ভূতের বাড়ীর খোলা দুয়ার দিয়ে ঢুকলে একটা বিরাট ঠাকুর দালান আর তারই মাঝবরাবর ডাকের সাজের প্রতিমা। ডাকের সাজ কথাটা দিদুর কাছেই শেখা। তবে ওই বাড়ীর দরজাটা কেন কখনো বন্ধ হয় না তার সদুত্তর আমার দিদিমা দিতে পারেন নি। পারবেনও না – বারো বছর হল মারা গিয়েছেন। ভূতের বাড়ী কবে মারা গিয়েছিল জানি না – বাড়ীটা আর নেই। সারপেনটাইন লেনের ভূতের বাড়ী এখন পঞ্চ ভুতে বিলীন।নতুন বাড়ীর ভিত শুরু হয়েছে – বাইরে একটা ছবি – নতুন বাড়ীটা কেমন হবে। কিনতে চাইলে ফোনও করা যায়া। নাহ, এই বাড়ীতে কি আর টানা টানা চোখের মা দুর্গা সবুজ রঙের অসুরকে বধ করবেন? একদিক থেকে ভাল হয়েছে – আমার ছেলে যদি আমাকে সেই প্রশ্নটাই করে বসতো যেইটা আমি দিদুকে করেছিলাম তাহলে বড়ই বেগতিক হত! ভালই হয়েছে বাড়ী ভেঙ্গে দিয়ে – না রইল বাঁশ, না বাজবে বাঁশরী।

মামাবাড়ির আশেপাশের এই গলিগুলোতে ছোটবেলার কত গল্প চাপ বেঁধে আছে। শীতের দুপুরে হাটতে হাটতে মনে হল এই বাড়িগুলো কত গল্প জানে। কিছু কিছু বাড়ী তো স্বয়ং গল্প। ওই তো, ওই বাড়ীটাই তো গগন চৌধুরীর স্টুডিও। ওই তো আধ-বন্ধ চিলেকোঠা ঘরের জানলা যেখানে মাঝ রাত্তিরে মারা যাওয়া লোকেরা নিজের ছবি আঁকাতে আসেন। গগন চৌধুরী কি জানলা দিয়ে দেখে ভূতের বাড়ীর ছবি এঁকেছিলেন? ওই দালানটাই না – যেখানে সোনার কেল্লার দুষ্টু লোকেরা ভুল মুকুলকে ফেলে রেখে গেছিল? আর ওই তো ওই বিশাল থামওয়ালা বাড়ীটা – সামনে পুরো আগাছার জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছে! ওর বৈঠকখানাতেই তো দাবার ঘুঁটি সাজিয়ে দুঁদে পুলিশ অফিসার – প্রাক্তন – প্রবীর রায় চৌধুরী বসে আছেন – আর খুঁজে চলেছেন নিজের হারিয়ে যাওয়া অতীতে ফিরে যাবার ভয়ঙ্কর সুন্দর কবিতাময় রাস্তা।

অতীতের সঙ্গে আজকের বড্ড সংঘাত – থমকে থাকা সময়কে কে যেন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে সামনের পথে ঠেলে দিয়েছে। সে যেতে চায়নি, জানেন, কিন্তু তবু তাকে যেতে হয়েছে কালের নিয়মে। ওই যে সর্বাধিকারীদের বাড়ীর সিং দরজার সিংহগুলো – পায়ের চাপে একটা বলকে ধরে রেখেছে। বাড়ীটা এখনো আছে – একটা ক্লিনিক না কি হয়েছে। সিংহগুলো একটু ভেঙ্গে গেলেও বেশ আছে এখনো। ছোটবেলায় এগুলোকে কি বিশাল মনে হত। এখন আর হয় না। বড় হয়ে গেছি কিনা! পাল্টে গিয়েছি কিনা!

শীতের দুপুরের রোদ হাল্কা লাল হয়ে আসছে – বেলা ঢলে এল। “পাল্টে গেলি তুই, আমিও পাল্টে গিয়েছি মাঝ পথে হাঁটতে হাঁটতে …”

Leave a comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: