কালের ক্যালেন্ডার

পয়লা জানুয়ারির অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত। দুম করে বছরটা উল্টে গেলে তার হিসেবটা তো রাখতে হবে – না কি? আর সেইটে করার জন্যে যদি ক্যালেন্ডারই না রইলো তবে থাকলো কি? আমার ছেলেকে ক্যালেন্ডার দেখাতে জাদুঘরে নিয়ে যেতে হবে, সে আমি জানি। কিন্তু আমাদের, যাদের জীবনের সঙ্গে ক্যালেন্ডার ওত প্রত ভাবে জড়িত তাদের সঙ্গে নিয়ে চলুন স্মৃতির বকুল বিছানো পথে একটু ব্রিস্ক ওয়াক করে আসি।

ক্যালেন্ডারের কিন্তু একটা কাস্ট সিস্টেম আছে। সেই শ্রেণীবিভাগের উপরের সারিতে তেরো পাতার ক্যালেন্ডার – তাদের পাতায়ে পাতায় ছবি। সেই ছবি ইভলুশনএর গোড়ার দিকে বেখাপ্পা গোছের হত – তাদের কোনো সামঞ্জস্য থাকতো না। ডালিয়া ফুল দিয়ে শুরু হয়ে সমুদ্রতট ঘুরে ফুটফুটে বাচ্চার ফচকে হাসিতে ডিসেম্বর গড়িয়ে যেত। পরের দিকে শুরু হলো থীম। একটি বিষয় ধরতে হবে আর তার উপর ছবি। ইদানিং বিজয় মাল্য নামে এক বালখিল্য এই ব্যাপারটা ভালো রপ্ত করেছে – তবে ওনার থীমে বৈচিত্র কম – পোষাক-আসাকও কম কিন্তু সেইটেই থীম! কৌলিন্যর নিম্নগামী পথে ক্যালেন্ডারের পৃষ্টা সংখ্যা কমতে থাকে। যারা সেলস বা বেচুবাবুর চাকরি করেন তারা “কোটা ” নামক ভয়ানক সিরিয়াল কিলার সম্বন্ধে অবহিত আছেন জরুর। প্রতি তিন মাস অন্তর এই আততায়ী হানা দেন রাতের ঘুম ও দিনের টুইটারবাজির চৌদ্দটা বাজাতে।ক্যালেন্ডার-কৌলিন্যর পরের লেভেলে যিনি প্রতি পাতায় তিন মাস গুঁজে দিয়েছিলেন তিনি নির্ঘাত সেলসের লোক – কোয়াটারলি কোটায় কাটা পড়া প্রাণ। যাই হোক, এই ভাবে পাতার সংখ্যা কমতে কমতে বেসিক নো -ফ্রিল মডেল – মানে একপাতায় বছরে এসে দাড়ায়। ক্যালেন্ডারের ব্রাহ্মন শ্রেনীর চাহিদা খুব – অন্তত এক কালে খুব বেশি ছিল। পল্টুর মায়ের মামাতো ভাই – মানে মামাতো মামা – তার নভেম্বর থেকেই খোজ পড়ে যেত। “দেখো ভায়া, এই বার কিন্তু আই টি সির ক্যালেন্ডারটা চাই। আর বছর পড়লেই দিও কিন্তু – আগের বছর পুরো জানুয়ারী মাস আগের বছরের মে মাসের পাতাটা লাগিয়ে চালিয়েছিলাম। পাঁচ বাই দুইয়ের বসাক ট্যাক-ট্যাক করে কত কথা শুনিয়ে গেলো।”

বারো পাতার বসার ঘর, চার পাতার শোবার ঘর আর এক পাতা ঠাকুর ঘরের দরজার পেছনে। ছোট করে এই ছিল ক্যালেন্ডারের বাহিক প্রদর্শন সুত্র। খুব সন্তর্পনে ক্যালেন্ডারের শিরদাড়ার মাঝ বরাবর একটা ফুটো করে তার ভিতর দিয়ে সুতো গলিয়ে পেরেকে লটকে দিতে হত। সদ্য ইউক্লিডের সঙ্গে পরিচয়্প্রাপ্ত অনেক পড়ুয়ার ওপর বর্তাত এই বাইসেক্ট দা শিরদাড়া কাজটি। একটু এদিক ওদিক হলেই কিন্তু ক্যালেন্ডার বাম বা দক্ষিণ পন্থী হয়ে পরবে এবং পুরো সাল আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আপনার নিপুনতার কমজোরী। এই দোদুল্যমান দৃষ্টিনন্দন – প্রায় “ফর্ম অফ আর্ট” – বস্তুটির আসে পাশে কিন্তু ক্রমেই দুটো ওপেন ব্রাকেট ক্লোস ব্রাকেট আবির্ভূত হতো। মার্চ পেরোতে না পেরোতে ফুল স্পিডে পাখা চালাতে হতো আর সেই হওয়া নাড়া দিত ক্যালেন্ডারে – সে দিন দুজনে দুলেছিনু ওয়ালে, পেরেকের বাঁধা ঝুলোনায়। সেই দুলুনিতে শিরদাড়ার দুই প্রান্ত তাদের আপন মনের মাধুরী মিশায়ে রচনা করত দুটি বঙ্কিম রেখা – প্রবল হওয়ায় তারা বেঁকে যেত একে অপরের দিকে কিন্তু মাঝখানে নদী ওই বয়ে চলে যায় – বনের পাখি খাঁচার পাখির মিলন আর হতো না। ঘরের ডিকর পুরো বদলে ফেলতেন দাসবাবু কিন্তু দেয়ালে ক্যালেন্ডারের স্থান পরিবর্তন করতে বুক কাপত – থাক ওখানেই, অন্য কথাও দিলে তো আবার সেই দাগ হবে। এই ক্যালেন্ডারের স্বাভাবিক ভাবেই পাতা উল্টে দিতে হত সময় উল্টে গেলে।ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও আদপে বিলকুল নয়। বুচকি কে বললেন “মা, টুল টা নিয়ে দেতো এপ্রিল করে – বারো তারিখের বন্ধটা শুক্কুর না সোম দেখে নি” – চলবে না। ভীষণ রিস্ক। কারেক্ট আপ্রোচ হলো একটা লাঠি নিয়ে ক্যালেন্ডারে প্রথমে জোরে টোকা দেয়া। দিলেই দেখবেন পেছন থেকে পেট মোটা দুটো টিকটিকি দুরদুর করে পালাবে। দোষ কি – পোকা খেতে এসে দেখা, তারপর প্রেম য়্যান্ড পরিণয় ও ক্যালেন্ডারের পিছনে সুখী গৃহকোণ। এইটে যদি না করেন তাহলে বুচকির টুল থেকে পতন ও আপনার কিছু বেমক্কা হয়রানি কিন্তু অপেক্ষা করে আছে।

সুধীগণ এই পড়েই বুঝতে পেরেছেন যে সাবেকি ক্যালেন্ডারের মহা ঝক্কি। তাই মানুষের মন, বাড়ির মাপ, পরিবারের পুষ্যি এই সবের মতই ক্যালেন্ডার হ্রস থেকে হ্রশতর হতে লাগলো। হেড আপিসের শান্ত বড়বাবু যে বস্তুটি নিজের টেবিলের ওপর রাখতেন, সেই টেবিল ক্যালেন্ডার বাড়ির চৌকাঠ পেড়িয়ে সোজা বৈঠকখানায় হাজির হলো। মাপে ছোট তাই দেখতে গেলে নাকের সামনে লাগাতে হয়। কিন্তু কি করা – মিসেস সেন প্রচুর টাকা খসিয়ে এশিয়ান পেন্টস এর স্পেশাল এফেক্ট করেছেন দেয়ালে – কমলা দেয়ালে হাল্কা হলুদ হরতন সূর্যাস্তের ইলুশন ছড়িয়ে ফুটে বেরোচ্ছে – সেই ভ্যানিটি ওয়ালে তো আপনি টি এম সি কনক্রিট বারের ক্যালেন্ডার ঝোলাতে পারেন না। অগত্যা মুজিক সিস্টেমের বাম স্পিকারের ওপরেই লাগানো হলো ডেস্ক ক্যালেন্ডার।

সেই কবে গানের জলসায় ধুতি পাঞ্জাবি পড়ে মাইকের দিকে ত্যারচা হয়ে উত্তমকুমার গান গেয়েছিলেন – “জীবন খাতার প্রতি পাতায়, যতই লেখ হিসাব নিকাশ।” কি সত্যটি না কয়েছিলেন – কিছুই রবে না। রইলোও না। ক্যালেন্ডার এখন গিয়ে ঢুকেছে স্মার্টফোনে। বুড়ো আঙ্গুল চালিয়ে খুলে নাও দিনপঞ্জি – তর্জমার তর্জনে বয়ে চলো ভূতে, ভবিষতে আর দেখে নাও বাংলা বন্ধটা সুক্কুরে পড়েছে না সোমে। সব কিছু ছোট হয়ে আসছে – আর সব কিছু চলে আসছে তোমার আঙ্গুলের ডগায়। তবু মাঝে মাঝে মার ঠাকুর ঘরে গিয়ে কমলা বস্ত্রালয়ের ডাগর ডাগর চোখের লক্ষী ঠাকুরের ক্যালেন্ডারটা দেখতে বেশ লাগে – তাই না। কেমন যেন অভয় দেয়ার হাথটি দেখিয়ে বলছেন “সব ঠিক হয়ে যাবে – ভাবছিস কেন?”

ওই দেখো – দেয়ালের টিকটিকিটাও বলে উঠলো – “ঠিক ঠিক ঠিক”

Leave a comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: