জোচ্চোর

“যদি নামে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ”| কথাটা মনে হতেই অরিন্দমের হাসি পেয়ে গেল | কোথায় রাজা? সে সব তো গত বছর চুকে বুকে গিয়েছে – এখন তো রানীর সাম্রাজ্য | ঠিক আছে – মাঘের শেষের এই বৃষ্টি যদি রানীর রাজ্যেও কিছু কেরামতি দেখায় তাহলে ক্ষতি কি? শীতকালের সন্ধে – পাঁচটা বাজতে না বাজতেই অন্ধকার আর তার ওপর আজকে দুপুর থেকেই শাওন গগনের ঘোর ঘনঘটা | অরিন্দম বারাসাত কলেজ থেকে ক্লাস শেষ করে বেরোতে গিয়েই আন্দাজ করেছিল আজ কপালে ভোগান্তি আছে – শীতকালে তো আর কেউ ছাতা নিয়ে বেরোয় না, অরিন্দম ও সঙ্গে ছাতা আনেনি | কলেজ থেকে বেরিয়ে অল্প বাঁ দিকে গেলে চাঁপাডালির মোড় আর ডান দিকে বেশ কিছুটা গেলে ডাক বাংলো | কলেজের ঠিক বাইরে এসে অরিন্দমকে একটা সিন্ধান্ত নিতে হলো | চাঁপাডালিতে বাসে ভিড়টা হয় বেশি – গত হপ্তায় গোড়ালি মচকানোটা এখনো ভালো সাড়েনি – ওই ভিড় ঠেলে বাসে ওঠা মুশকিল হবে | হয়েত হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে হবে আর বৃষ্টি এলে কোনো প্রটেকশন ছাড়াই কাক ভেজা | অন্যথা একটু পা চালিয়ে ডাক বাংলো পৌঁছে যাওয়া যায় | ডাকবাংলো চাঁপাডালির আগের স্টপ – বাসটা খালি আসে – অন্তত ভেতরে ঢোকা যাবে | সমস্যা হবে যদি এই এক স্টপের রাস্তার মধ্যে বৃষ্টিটা নেমে পড়ে – এ দিকটা তেমন ডেভেলপ করেনি এখনো যে কোনো দোকানের পাকা ছাউনি বা ফুটপাথে মাথা বাঁচানো যাবে | যা থাকে বরাতে – এই ভেবে অরিন্দম সোজা ডাক বাংলোর দিকে হাঁটা দিল | পায়ের অসুবিধে খেয়াল রেখে, সাবধানে হেঁটে জখম গোড়ালী নিয়ে অরিন্দম ঠিক দুটো স্টপের মাঝামাঝি পৌঁছেছে আর আচমকা আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি | সঙ্গে বাজ পড়া | জায়েগাটা নিরিবিলি না হলেও খুব লোকজন নেই সেই সময় | অরিন্দম একটু চাপা অসহায় বোধ করতে লাগলো | কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা মাথার ওপর রেখে বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে যাওয়া রাস্তার সামনে চেয়ে একটু দূরে একটা চায়ের দোকানের ছাউনি দেখা গেল | নিজের অদৃষ্টকে অস্ফুটে একটা তেতো কথা শুনিয়ে অরিন্দম তে-ঠেঙ্গা দৌড়ের মত ছুট দিল সেই ছাউনি লক্ষ করে |

অরিন্দম হুগলি মহসীন কলেজের অধ্যাপক – ইতিহাস এর | ইতিহাসেরই  ছাত্র ছিল অরিন্দম | অরিন্দম এর স্থির ধারণা ইতিহাস বিষয়টা ছাত্রদের পড়ানো হয় যাতে তারা বড় হয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হতে পারে – কারণ এখনো অবধি সে ইতিহাসের যোগ্য কোনো চাকরির সন্ধান পায়নি | সে মামুলি ছাত্র ছিল তাই বি এ পাশ করার পর যে কটি পরীক্ষা দিয়েছিল কোনটাতেই উতরোয় নি – অগত্যা মাস্টার্স , ইউনিয়ন এর দাদাদের হাতেপায়ে ধরে, মৃত পিতৃদেবের কিছু পয়সা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাদাদের  ঘুষ দিয়ে এই জুনিয়র প্রফেসর এর চাকরি | কলেজের ইউনিয়ন এ চেনাশোনা আছে বলে মাঝেমাঝেই অন্য কলেজের স্পেশাল ক্লাস, বা কোনো প্রফেসরএর অবর্তমানে ক্লাস নেয়া – এই সব সুযোগগুলি জুটে যায় | তাতে দৌড়ঝাপটা একটু পড়ে বটে, কিন্তু টাকাটা পাওয়া যায় | আর সেই সূত্রে কিছু কোচিং ক্লাসের সঙ্গে চেনা জানা হয়ে গেলে তো কথাই নেই – কাঁচা টাকা আসে কিছু পকেটে | বারাসাত সেদিক থেকে বেশ স্বর্ণখনি – বারাসাত গভার্নমেন্ট কলেজ আছে, আর তার কয়েক স্টপ আগে ওই কলেজের এক প্রাক্তন অধ্যাপক – নন্দকিশোর সামন্ত – একটা কোচিং সেন্টার খুলেছেন | সেইখানেই আজ সকালে অরিন্দম টানা চার ঘন্টা আই এ এস পরীক্ষার্থীদের পড়িয়ে, বারাসাত কলেজএ দুটো ক্লাস নিয়ছে | মাসের শেষ সপ্তাহ – তাই কোচিং সেন্টার এর হিসেব মিলিয়ে বেশ কিছু টাকা অরিন্দমের মানি ব্যাগে | কলেজের মাইনে চেকে দেবে – একাউন্টস ডিপার্টমেন্টএর সরকারবাবুকে তোয়াজ না করলে নিজে থেকে পাওয়া যাবে – সে আশা বৃথা |  সারাদিন বক বক করে গলাটা বেশ ধরে আসছিল অরিন্দমের আর সেই সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজতে হলো এই চায়ের দোকানের ছাউনিটাতে আসতে গিয়ে | ভালোই  হলো, এই সময়ে চা টা মন্দ লাগবে না | ছাউনির সামনে একটা জটলা মতন – কেউ সাইকেল রেখে দাড়িয়ে আছে আবার কেউ পথচারী | অরিন্দম ছাউনির সামনের ভিড়টা পেড়িয়ে ভেতরে এসে অল্প বয়েসী মালিক ছেলেটিকে বলল – “বেশ ভালো করে আদা দিয়ে বানাও তো একটা স্পেশাল চা – আর চিনি দিও না” | চা বা কফি – কোনটাতেই চিনি নেয়না অরিন্দম – বরাবর – ফ্লেভার নষ্ট হয়ে  যায় | দু তিনটে স্টোভ জ্বলছে – তাতে দুধ, চা জ্বাল দেয়া হচ্ছে – এলাচের গন্ধে বেশ লাগছে বাতাসটা| পকেট থেকে রুমাল বের করে অরিন্দম মাথাটা বেশ ভালো করে মুছে নিল – চুলটা বড় হয়েছে – এই রবিবার কাটাতেই হবে| ভালো করে মাথা মুছে অরিন্দম দেয়ালে লাগানো মা কালীর ছবির কাঁচে মাথার চুলটা আঙ্গুল দিয়ে ঠিক করে নিছে এমন সময়ে মনে হলো যেন ওর পেছনে এক জন ভদ্রলোক বেশ মন দিয়ে আরিন্দমকে জরীপ করছেন | দ্রুত ঘুরতেই ভদ্রলোক তড়িঘড়ি চোখ সড়িয়ে নিলেন আর চট করে ফের দোকানের দিকে পিঠ করে দাড়ালেন | মাঝবয়েসী, কাঁচা পাকা চুল পাতলা হয়ে গিয়ে মাথার ঠিক মাঝখানে একটু টাক, গায়ের রং এক কালে বেশ ফর্সা ছিল এখন রোদ্দুরে পুড়ে তাম্রবর্ণ, পাঁচ নয় এর মত উচ্চতা, পরনে কালো প্যান্ট, নীল হাফ শার্ট আর একটা বেশ পুরনো ধুসর রঙের জ্যাকেট |

দোকানের ছেলেটা “বাবু, চা” বলে গেলাসটা এগিয়ে দেয়া আর হঠাত হওয়ার দিকবদলের জন্যে তেড়ে বৃষ্টির ছাট সোজা দোকানের দিকে – দুটো ঘটনা একসঙ্গেই ঘটল | সঠিক বলতে তিনটে ঘটনা ঘটল | ধুসর জ্যাকেট বৃষ্টির তোরে দোকানের ভেতরে চার পাঁচ ফুট পিছিয়ে এলেন সামনের লোকের ধাক্কা খেয়ে | পেছোতে গিয়ে ওনার প্রায় অরিন্দমের সঙ্গে কলিশনের যোগাড়  এবং অরিন্দমের সেইটা আন্দাজ করে হাতের গেলাসটাকে চটজলদি সড়িয়ে নিল ধূসর জ্যাকেটের রাস্তা থেকে| নিজেকে টালমাটাল অবস্থা থেকে সামলে নিতে নিতে ধুসর জ্যাকেট অরিন্দমের কনুইটা ধরে একটু স্থিতি হলেন | “থ্যান্ক ইউ, স্যার | লাগেনি তো?”, হাথ টা অরিন্দমের কনুই থেকে কব্জির দিয়ে নামিয়ে এনে খুব অপ্রস্তুত ভাবে ধুসর জ্যাকেট কথাটা বললেন | চোখ কিন্তু সোজা অরিন্দমের চোখে | অরিন্দম হালকা হেসে, ঘাড় নেড়ে না বলল আর তার সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন – “বিধান নগর কলেজ না? ইকোনমিক্স ?” কব্জিতে তখনও ভদ্রলোকের হাথ – “না, আপনার ভুল হয়েছে | আমি হুগলী মহসিনে হিস্ট্রি” – একটু রুক্ষ ভাবেই বলল অরিন্দম | চায়ের দোকানের ভেতরটা বেশ অন্ধকার – একটা মাত্র আলো জ্বলছে – সেই বাল্বটার ওপর দীর্ঘ দিনের তেল-কালি- তাই আলোর চেয়ে আবছায়াটাই বেশি জাকালো | ধুসর জ্যাকেট হাথটা সড়িয়ে এক পা পিছিয়ে গিয়ে ঘাড়টা একটু কাত করে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন অরিন্দমের দিকে | আচ্ছা জ্বালা হলো তো – গেলাসের চায়ে একটা চুমুক দিয়ে অরিন্দম ভাবলো এর থেকে চাঁপাডালির মোড় ভালো ছিল ! “নাম অরিন্দম সেনগুপ্ত, কলেজ এ পড়াকালীন থাকতে মানিকতলা তে – ঠিক কিনা?” অরিন্দম একটা বেমক্কা বিষম খেল | মুখের চা অন্ননালী শ্বাসনালী গন্ডগোল করে ফেলে সে এক যাচ্ছেতাই কান্ড| ধুসর জ্যাকেট এর ঠোটে একটা মৃদু ছেলেমানুষী   হাসি – সেই হাসিটা চোখের কোল অবধি পৌঁছে চোখ দুটো কে একটু ছোট করে দিয়েছে | লোকটির চোখের মণি দুটি কটা | “কিন্তু আপনি এই সব…”, কাশির দমকটা কমতে কোনক্রমে প্রশ্ন করলো অরিন্দম | ধুসর জ্যাকেট উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলেন – “কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট এর প্রফেসর দের মনে আছে? বলাই চৌধুরী, স্বপন মুখার্জী…এদের মনে আছে?” বিলক্ষণ মনে আছে অরিন্দমএর | নিজে আর্টসের ছাত্র হলেও কেমিস্ট্রি ফিজিচ্ক্স ডিপার্টমেন্ট এ বেশ যাওয়া আসা ছিল অরিন্দমের | অরিন্দমের খুব কাছের বন্ধু, সন্দীপ গাঙ্গুলি, কেমিস্ট্রির ছাত্র ছিল ওই কলেজের – এখন একটা ফার্মা কম্পানিতে কাজ করে | ধুসর জ্যাকেট যে নামগুলি বললেন সেগুলি খুবই পরিচিত নাম সব | অরিন্দম কিছু বলে ওঠার আগে ভদ্রলোক মিটিমিটি হেসে জিগ্যেস করলেন – “আর অমলকান্তি বিশ্বাস , এ বি  – এ বি কে মনে নেই?”

ট্রুথ ইস স্ট্রেন্জার দ্যান ফিকশন – কথা শোনা ছিল তো বটেই কিন্তু কোনদিন উপলব্ধি হয়নি | সেই উপলব্ধিটা তা যে জানুয়ারী মাসের ঠান্ডা, বাদলার দিনে বারাসাতের একটা দাপনার আধ-পাকা চায়ের দোকানের জন্য অপেক্ষা করে আছে সেইটা কে জানত? বাইরে সজোরে একটা বাজ পড়ার মুহুর্তে দোকানের আলোটা কেঁপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অরিন্দম ধাপ্পাটা ধরতে পারল | কিছুদিন আগে এক আড্ডার আসরে ওই সন্দীপই খবরটা দিয়েছিল | কাজের সূত্রে সন্দীপ হাওড়া যায় – ট্রেনএ যাতায়াতের মত খবর সংগ্রহ করার মত সুযোগ আর কিছুতে নেই – সেই ট্রেনএই শোনা এই গ্যাংটার ব্যাপারে | নিপাট ভালো মানুষ সেজে এরা ঘোরেন শহর ও শহরতলির বিভিন্ন প্রান্তে | এদের মোডাস অপারেন্ডি হলো কোনো নিরিবিলি জায়গায়ে আচমকা কোনো ব্যাক্তিকে পরিচিত বলে ঘোষণা করা এবং তারপর  ট্রায়াল এন্ড এর্রর পধ্হতিতে তার কিছুটা পরিচয় জানা | তারপর খেজুরে আলাপ – সন্ধের দিকে হলেই ভালো, জালিয়াতি ব্যাপারটা দিনের আলোয়ে খুব একটা খোলে না – আর আলাপ করে নিজেকে প্রাক্তন অধ্যাপক বলে পরিচয় দেয়া | তারপর কথার পিঠে কথা এবং শেষে পকেটমার এর হাতে সর্বসান্ত হবার করুণ কাহিনী | অতঃপর কিছু টাকা ধার চাওয়া, ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, একটি ভুয়ো মোবাইল নম্বর এবং – সন্দীপএর ভাষায় – মেলট ইনটু থিন এয়ার নেভার টু বি সিন এগেন | যারা এই জালিয়াতিতে বেশি পটু তারা টার্গেট ঠিক করেন ভেবেচিন্তে আর তাদের একটু খোজখবর নিয়ে রাখেন | সেইদিন বেশ চকিত হয়েছিল অরিন্দম যে অধ্যাপক শ্রেণী নিয়েও এই সব জোচ্চুরি শুরু হয়েছে | কিন্তু ভাগ্গিশ সন্দীপ সেই ঘটনা টা বলেছিল তাই আজ এই কেমিস্ট্রির অধ্যাপকটিকে চিনে নিতে অসুবিধে হলো না অরিন্দমের | ছিপে যখন মাছ ফেসেইছে, তখন একটু খেলিয়ে পাড়ে তোলা যাক না কেন – ভাবলো অরিন্দম |

“বলেন কি, এ বি কে মনে থাকবে না? গলফ গ্রিন থেকে আসতেন পড়াতে – ফিজিকাল কেমিস্ট্রি পড়াতেন হনার্স এ”, অরিন্দম সটান ধুসর জ্যাকেটের দিকে চেয়ে বলল | ধুসর জ্যাকেট এর ঠোটের কোলে এখনো সেই হালকা হাসি | “এখন দেখলে চিনতে পারবে? ধরো অল্প আলোয়ে, বারাসাতএর কোনো চায়ের দোকানে বাদলার সন্ধে বেলায়?” হাসি টা একটু প্রশস্ত করে ধুসর জ্যাকেট প্রশ্ন করলেন | এর পর অরিন্দম যেটা করলো সেইটা হয়েত শেষ করেছিল থার্ড ইয়ারএ সত্যজিত রায়ের “অতিথি” নাটকের একটি চরিত্রে | “স্যার, আপনি! এত আমি ভাবতেই পারছি না স্যার” বলে সোজা ধুসর জ্যাকেটের পা উদ্দেশ্য করে ডান হাত বাড়িয়ে কোমর থেকে ঝুকে এগিয়ে যাওয়া | ধুসর জ্যাকেট তত্পরতার সঙ্গে আরিন্দমকে ধরে ফেলে, লজ্জিত কন্ঠে প্রণামে বাধা  দিয়ে বললেন “একটু ধারে গিয়ে দাড়ানো যাক” | বৃষ্টিটা একটু ধরে যাওয়াতে ভিড়্টাও খালি হয়েছিল | অরিন্দম আর লোকটি – এখন আর ভদ্র বলা চলে না – একটু পেছনে একটা বেঞ্চিতে দিকে এগোলো | “একটা চা বলবে নাকি ভাই – শুকনো গলায় কি আর আড্ডা জমবে? এত দিনের জমানো কথা !” অরিন্দম একটু সময় নিয়ে লোকটির দিকে চেয়ে বলল “নিশ্চই বলব স্যার – তার আগে বলুন আপনার পকেটমারটা হলো ঠিক কোথায়?”

লোকটি অরিন্দমের সামনাসামনি একটা বেঞ্চিতে বসতে যাচ্ছিল | বসার আগে পকেট  থেকে একটা রুমাল বের করে বসার জায়েগাটা ঝেড়ে নেওয়ার জন্যে একটু ঝুকে পরেছিল লোকটি | অরিন্দমের কথাটা যেন ওর শিরদাঁয়ে একটা ইলেকট্রিক শক দিল – মাথাটা অরিন্দমের দিকে ঘুরিয়ে সটান খাড়া হয়ে উঠলো ধূসর জ্যাকেট | তারপর বসার জায়েগাটা সাফ না করেই ধপ করে বসে পড়ল | অরিন্দম কিন্তু আজকে একদম টপ ফর্মে – হাঁক দিয়ে দোকানের ছেলেটাকে দুটো বড় আদা-এলাচ দিয়ে চা আর বিস্কুট দিতে বলল | ওর সামনে যে ঘটনাটা ঘটছে সেটা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ! “ঘাবড়াবেন না স্যার, এই জোচ্চুরিটা আমার কমন পড়ে গেছে”, নিজের আস্থার বহিপ্রকাশ দেখে অরিন্দম নিজেই বেশ পুলকিত বোধ করলো, “তবে চিন্তা নেই, পুলিশ ডাকব না | ওদের নির্ঘাত হাথ করা আছে আপনার | স্রেফ আপনার প্রফেশন নিয়ে একটু আড্ডা দেব স্যার | স্যার বলেই বলবতো, নাকি – অন্য কোনো পরিচিতি আছে এ বি ছাড়া?”

“অচিন্ত্য | বাবলা বলে ডাকে সবাই”, ধূসর জ্যাকেটের গলাটা একটু খাদে নেমে একটা ঘরঘরে স্বর বেরোচ্ছে এখন |

“বৃষ্টিটা আবার এলো, তাই বেরোনোর কোনো তাড়া নেই | ধীরে-সুস্থে বলুন তো দেখি এই লাইনের গপ্পো | কি ভাবে এলেন, ব্যাপারটা চলে কিভাবে আর মোস্ট ইম্পর্টান্ট – আমাকে টার্গেট করলেন কি ভাবে? বেশ অনেক কিছুই তো জানেন দেখছি আমার ব্যাপারে|”
লোকটির মাথা নিচু – দোকানের ম্লান আলোতে মাথার মাঝখানের টাক টা বেশি পরিস্ফুট | কত বয়েস হবে লোকটার? পঞ্চাশ? শরীরটা কিন্তু বেশ পোক্ত | হাসি পেয়ে গেল অরিন্দমের – এ বি র চেহারাটাও বেশ চৌকস ছিল – মহিলামহলে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন অমলকান্তি | সেদিক থেকে লোকটি বেশ ভালো ভাওতা ধরেছে ! হাথ দুটো টেবিলের ওপর জড়ো করে, বেশ একটু মনে জোর এনে লোকটি ফের অরিন্দমের দিকে তাকালো | সেই হাসি ব্যাপারটা একদম উধাও |
“মৌলানা কলেজে কেমিস্ট্রিতে ল্যাব আস্সিস্তান্ট এর কাজ করতাম স্যার | চাকরিটা দুনম্বরী করে পাওয়া – নিজে গ্র্যজুএশন পাস করিনি – বাবা মারা গেলেন তাই পরীক্ষা দেওয়া হলো না | তখন কলেজে যে ইউনিয়ন ছিল সেই পার্টিকে ধরে চাকরিটা পাওয়া স্যার | জানেন তো, কি কাজ করতে হয় | কেমিকাল কেনা, স্টক রাখা, ইনস্ট্রুমেন্ট ঠিক রাখা, ল্যাব ঘুছিয়ে রাখা, প্রফেসরদের ফাইফরমাস খেটে দেওয়া – এই সব | মাইনে যা পেতাম তাতে চলত না স্যার – খুব অনটনের সংসার ছিল|”
দোকানের ছেলেটা চা বিস্কুট দিয়ে গেছিল | লোকটা চায়ের গেলাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে যেন অনেকটা ধাতস্ত হলো | অন্তত গলার আওয়াজের জোরটা ফিরে পেল ধূসর জ্যাকেট | অরিন্দম কিছু বলল না – আজকে বাবলার গল্প  শোনার দিন | তার কেবল সূত্রধরের ভূমিকা – নিজে কথা বলে ছন্দপতন ঘটাবে না |
“তারপর বুঝলেন স্যার, চাকরিটা গেল|”
“কিভাবে? ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে তো চট করে সরকারী কলেজের চাকরি যায় না |”
“আরে ধুর মশাই – সেই ইউনিয়ন তো মধ্যকালীন পরিবর্তনের তোরে গেল পালটি খেয়ে | নতুন দাদারা এলেন – তাদের নতুন ভাইরা এলো | যাগ্গে, হচ্ছিল কি কেমিস্ট্রি ল্যাব থেকে সিলভার নাইট্রেট  সরাছিলাম বেশ কিছুদিন ধরে | জিনিসটার বাইরে দাম আছে – রুপোর দাম বাড়লেই জিনিসটার দাম বাড়ে | বাইরে বিক্রি করে বেশ উপরি হচ্ছিল | একদিন হাতেনাতে ধরা পরে গেলাম স্যার | সঙ্গে সঙ্গে চাকরি থেকে বরখাস্ত |”
“আর সেই সঙ্গে এই অন্ধকার জগতে প্রবেশ?”, একটা বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে খুব সাবধানে গেলাস থেকে মুখে পুরে প্রশ্ন করলো অরিন্দম
“না স্যার| ঠিক এই অন্ধকার নয় – অন্য অন্ধকার | কিছুদিন শিয়ালদা লাইনে পকেটমারের কাজ করেছিলাম|”
“পকেটমার? ওই বিদ্যেটা কি করে রপ্ত হলো?”, বেশ অবাক হয়েই প্রশ্ন করলো অরিন্দম
“ঠিক পকেটমার নয় স্যার – ওই পকেট মেরে মালটা হাথ বদল করার একটা ব্যাপার থাকে| খুব জলদি করতে হয় আর হাথে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেটে পরার একটা ছক করে নিতে হয় | ওই কাজটা করতাম আমাদের বস্তির এক পকেটমারের সঙ্গে | পার্টনারশিপ মডেল |” লোকটি অরিন্দমের দেখাদেখি বিস্কুটটা চায়ে ডুবিয়ে তুলতে গেল আর বিস্কুট ভেঙ্গে ফের চায়ের গেলাসে ! “দেখলেন স্যার, হাথের এই অবস্থা – এই নিয়ে পকেটমারি হয়?”, নিজের রসিকতায় নিজেই  মাথা হেলিয়ে হাসলেন লোকটা – অচিন্ত্য |”ইনকাম ভালই ছিল | মানিব্যাগের টাকাটা পাওয়া যেত আর ক্রেডিট কার্ড গুলো বেশ চড়া দামে বিক্রি হতো স্যার | ড্রাইভিং লাইসেন্সে থাকলে সেইগুলি বিহারীরা কিনে নিত বেশ চড়া দামে | সব মিলিয়ে বেশ ভালো স্কিম |”
“বন্ধ হলো কেন?”, অরিন্দম সূত্রধরের ভূমিকায় আজ অসাধারণ
“বাপি – মানে আমার মেন পার্টনার – একদিন ধরা পরে গেল | ট্রেনে ধরা পড়লে অতটা গোলমাল হয় না – কোনরকমে দরজা দিয়ে লাফিয়ে পড়তে পারলেই হলো – কিন্তু ধরা পড়ল শিয়ালদা স্টেশনে | রেল পুলিশ প্রথমে বেধরক মারলো তারপর আলিপুর জেল | এখনো ওখানেই আছে | পুরো বাপি বাড়ি যা কেস হয়ে গেছে!” ফের মাথা হেলিয়ে ধূসর জ্যাকেট হাসলো |
“তারপর এই লাইন ?”
“অনেক সেফ দাদা”, স্যার থেকে দাদাতে নেমে এলো অচিন্ত্য | “প্রফেসরদের ওপর শ্রদ্ধার ব্যাপারটা এখনো আছে – ধরা পরার চান্স নেই বললেই চলে | তবে ইনকাম টা অত বেশি না | আমি এমনিতে একটা এই অঞ্চলে ইঁট বালি সিমেন্টের সাপ্লাইএর ব্যবসা করি – এইটা সাইড বিজনেস বলতে পারেন”
“আমার এত খবর যোগার করলেন কথা থেকে?”
“আরে দাদা খুব সোজা | কোনটা শুনে ইমপ্রেস হলেন বলুন তো ? নাম আর কোথায় থাকেন – এই তো? কলেজটা তো প্রথমে মেলেনি | ঐটা জেনেছি কোচিং ক্লাসের কাশিয়ের নিতাইদার থেকে | ডাকবাংলো মোড়ে ওনার বাড়ি তৈরী হচ্ছে – বালি সিমেন্ট তো আমি সাপ্লাই করছি! আর আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা যা তাতে এখন যেখানে থাকেন, কলেজে পড়াকালীন সেখানে থাকতেন সেইটা হওয়াই স্বাভাবিক | মানিকতলা থেকে সাউথ সিটি হয়ে যাওয়ার চান্সটা কম!”
“কত নিতেন? ” প্রশ্নটা একটু আচমকা হতে অচিন্ত্য একটু ঘাবড়ে গেল | “আজকে এই যে ফাঁদ পেতেছিলেন – কত নিতেন আমার থেকে?”
” ও হো হো – তাই বলুন | পাঁচশো | আপনি যদি পুরোনো প্রফেসর কে ইমপ্রেস করতে হাজার দিতেন তবে অবশ্য না বলতুম না | তবে সাধারণত পাঁচশো দেয় লোকে – প্রফেসর মানুষ – ট্যাক্সি ভাড়াটা তো দিতে হবে না কি!”

হটাত বেশ একটা ঠান্ডা হওয়ার ঝটকা এসে পড়ল দোকানটার ভেতরে| অচিন্ত্য জ্যাকেট টা একটু জড়িয়ে বসলো – ঠান্ডা এড়াতে | অরিন্দম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল বৃষ্টি এখন প্রায় থেমে গেছে বললেই চলে | তাই দোকানের সামনের ভিড়্টাও পাতলা হয়েছে আর হওয়া আসছে কিছুতে বাধা না পেয়ে|
“একটা কথা বলব স্যার? আপনাকে হেঁটে আসতে দেখলুম | পাটা তো জখম মনে হচ্ছে | এই ফাঁকে বেড়িয়ে পড়ুন | ধীরে আস্তে ডাক বাংলো তে গিয়ে একটা চার্টার বাস ধরে নিন – খালি পাবেন| দেরী করলে ভিড় বাড়বে আর চার্টার বাস পাবেন না – দুশো আটতিরিশএ ঝুলে যাওয়া আপনার পোষাবে না|”, লোকটির স্বরে বেশ একটা আন্তরিকতা বেড়িয়ে এলো | কথাটা ধূসর জ্যাকেট মন্দ বলেনি – ফুটপাথ বিহীন এই রাস্তার কাদা-জল ঠেঙিয়ে ডাকবাংলো যেতেই কিছুটা সময় চলে যাবে| অন্ধকারও করে আসছে শীতের বিকেলের | অরিন্দম উঠে দাড়াতে অচিন্ত্যও উঠে দাড়ালো | পকেটে হাথ দিয়ে মানিব্যাগ বের করতে যাবে আর ধূসর জ্যাকেট সন্ত্রস্ত ভাবে বলল “ঐটে করবেন না স্যার| আপনি আমার মান রেখেছেন| লোকাল বলে হয়েত থানা পুলিশ করেননি কিন্তু চেঁচামেচি করে প্রেস্টিজের তো ফালুদা করে দিতে পারতেন| আপনি সজ্জন লোক – জেন্টেলম্যান – তাই ওই চা বিস্কুটের পয়সাটা দিয়ে লজ্জা দেবেন না স্যার |” অচিন্ত্য বেঞ্চিটা থেকে বেড়িয়ে অরিন্দমের মুখোমুখি দাড়িয়ে| আবছা আলোতে তার মুখের একদিনের না কামানো কাঁচা-পাকা দাড়ি দেখা যাচ্ছে | চোখের নিচের কালিটা অরিন্দমের আগে চোখে পড়েনি| ডান হাথটা এগিয়ে দিয়ে ধূসর জ্যাকেট বলল “দেখি স্যার, প্রত্যেক দিন তো আর সত্যিকারের ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়ে না – হাথটা দিন দাদা |” অরিন্দম হাথটা এগিয়ে দিতে অচিন্ত্য দৃঢ় ভাবে সেইটা ঝাকিয়ে বা হাথটা অরিন্দমের ডান কাঁধে  রেখে একটা আধা  আলিঙ্গন ব্যাপার করলেন | লোকটা জোচ্চর হতে পারে কিন্তু হৃদয়বান জোচ্চর – মনে মনে ভাবলো অরিন্দম|

দোকান থেকে বেড়িয়ে রাস্তার ধারের জল কাদা সামলে অরিন্দম এগোলো ডাকবাংলোর দিকে | শীতকালে গোধুলি বলে কোনো ব্যাপার হয় না – দিন থেকে সোজা সন্ধে – তবে একটা অদ্ভূত আবছায়া ঘিরে রয়েছে এই সময় বারাসাতের যশোর রোডের ধারে | একটা ল্যাম্প পোস্ট এর নিচে গিয়ে অরিন্দম পেছনে তাকালো একবার| অচিন্ত্য দোকানের ঠিক সামনে ওর দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে আছে – জ্যাকেটটা গলা অবধি বন্ধ করা, তাই একটু যেন লম্বা বেশি লাগছে | হাথ নাড়ল অরিন্দম | অচিন্ত্য হাথ নেড়েই হটাত সেই হাথ দিয়ে সামনের দিকে দেখালো অরিন্দমকে – বেশ কয়েকবার | তাড়াতাড়ি সামনে চেয়ে অরিন্দম দেখল একটা চার্টার বাস আসছে | চট করে কাঁচা রাস্তা ছেড়ে একটু যশোর রোডের ওপর উঠে হাথ দেখাতে বাসটা অরিন্দমের সামনে দাড়িয়ে পড়ল | এই রুটের সব বাস মানিকতলা হয়ে যায় – তাই জিগ্গেস করতে হলো না | অরিন্দম উঠে দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে দরজার যে ছোট জানলাটা থাকে সেইটে দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রইলো | চায়ের দোকানটা পেরোনোর সময়ে অচিন্ত্য ওরফে বাবলা কে একটা মুচকি হাসি ও হাথ নেড়ে বিদায় জানিয়ে অরিন্দম সামনের দিকে একটা জানলা দখল করে বসলো | বৃষ্টি থেমে গেছে – ভেজা ঠান্ডা হওয়াটা মন্দ লাগছে না| অরিন্দমের কেন জানি রবীন্দ্রনাথের শ্যামা নাটকের “ওই চোর ওই চোর” আর তারপর বজ্রসেনের “নহি চোর নহি চোর” মনে পরে গেল | নিজের মনে গুনগুন করে “এই পেটিকা আমার বুকের পাঁজর সে যে ” বলে অরিন্দম ওর ঝোলা ব্যাগটাকে কোলের ওপর রেখে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চলল| চোর যদি চুরি না করে, তাকে কি তবে চোর বলা যায়? “যার মনে চুরি, সেই তো আসল চোর ফেলুবাবু” – কথাটা মনে পড়ে গেল অরিন্দমের – কতবার যে দেখেছে ছবিটা| কি জানি সেই লজিকে অচিন্ত্যকে চোর বলা চলে কিনা – তবে সন্দীপকে কালকে জমিয়ে বলতে হবে এই ঘটনাটা|

ঠান্ডা বাতাসে অরিন্দমের একটু ঢুলুনি এসে গিয়েছিল | চলন্ত কিছুতে উঠলেই অরিন্দমের একটু ঢুলুনি আসে | বাসে ভিড় ছিল না মোটেই – পাশেও কেউ এসে বসেনি| উল্টোডাঙ্গা এসে গিয়েছে আর বাসের কর্তা উঠে পড়েছেন ভাড়া সংগ্রহে | “মানিকতলা অবধি কত?”, জিগ্গেস করলো অরিন্দম | “কুড়ি টাকা দেবেন”, দাড়িওলা বাস কর্তা জানালেন| অল্প একটু উঠে দাড়িয়ে পেছনের পকেটে হাথ দিয়ে মানিব্যাগ বের করতে গিয়েই অরিন্দম বুঝতে পারল সে জিনিসটি হওয়া | কোচিং ক্লাস থেকে পাওয়া কড়করে ছয় হাজার টাকা ছিল ওতে | বাসটা হটাত ব্রেক কষলো খুব জোরে আর অরিন্দম ধাক্কা খেয়ে ফের সিটে বসে পড়ল| বাস কর্তা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তার দিকে | পকেটমার ধূসর জ্যাকেটের প্রেস্টিজের ফালুদা না হয় অরিন্দম করেনি – কিন্তু সেইটে যে এখানে তার প্রেস্টিজ নিয়ে হবে না সেটা কে বলতে পারে| বেশ প্রশস্ত হেসে বাস কর্তা অরিন্দমকে বললেন, “আপনি সামন্তবাবুর কোচিংএ ক্লাস নেন না? আমাদের ভাইপো পড়ে তো ওখানে |”, বাস কর্তার চোখে পুরোমাত্রায় সম্ভ্রম | “থাক স্যার, আপনাকে টাকা দিতে হবে না | প্রফেসর মানুষ আপনি|”

Leave a comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: